চম্পা আর বকুল। যমজ বোন। তিন ভাইয়ের পর তাদের একই সঙ্গে আগমন। একই রকম তাদের চেহারা, গায়ের রঙ, স্বভাবে চেতনায়, অসুখে – বিসুখে তারা সমানে সমান। তবে ভাগ্যের লিখনটি ছিল ভিন্ন।
গ্রামের স্কুলে পড়া শেষ করে চলে যায় শহরের হস্টেলে। কে যে চম্পা, কে যে বকুল আলাদা করে চেনা মুস্কিল। লেখাপড়ায়, খেলা ধুলায় দুজনেই ভাল। দুজনেই ফার্স্ট ডিভিশনে ম্যাট্রিক পাশ করে কলেজে চলে যায়। সেখানেও আই.এ., বি.এ. পাশ করে দুজনেই দ্বিতীয় বিভাগে। পিতামাতার চিন্তা তাদেরকে পাত্রস্থ করবার। যমজ হলেও বকুল ছোট। কারণ সে চম্পার কিছুক্ষণ পরে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল। বকুলের স্বাস্থ্য চম্পার চাইতে ভাল। সেজন্য কিনা, বকুলের বিয়ে স্থির হয় আগে। পাত্র বিলেতে ব্যারিস্টারি পড়তে যাবে। সেজন্য তার পরিবারের লোকেরা ছেলেকে বিয়ে দিয়ে ছাড়তে চায়। সুন্দরী ডিগ্রীধারী বকুলের বিয়ে হয়ে গেল তড়িঘড়ি। কিছুকালের মধ্যে বকুলকে সঙ্গে নিয়ে জামাতা চলে গেল সেই দূর দেশে বিলেতে। ভালই কাটতে লাগলো তাদের জীবন।
এদিকে চম্পার বিয়ের ফুল কুঁড়িবদ্ধই থাকে। ফুটতে চায় না যেন। অনেক চেষ্টা তদবীর করে কলেজের লেকচারার রাশেদের সাথে তার বিয়ে হয়। দুজনেই চাকুরীজীবী। চম্পা স্কুলে আর রাশেদ কলেজে। আলাদা বাসা ভাড়া নিয়ে তারা সংসার যাত্রা শুরু করে। তাদের সংসারে দুই পুত্র, দুই কন্যা জন্মগ্রহণ করে।
কালের চক্র ঘোরে। তারা বড় হয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিতও হয়। তারপর বিদেশে পাড়ি জমায় উন্নত জীবনের প্রত্যাশায়। ছোট ছেলেটি দেশে থেকে যায়। চম্পা আর রাশেদ চাকুরী শেষে কনিষ্ঠ পুত্রের সঙ্গে ধানমন্ডিতে নিজের বাড়িত বসবাস করে।
বিলেতে বকুলের স্বামী ব্যারিস্টারি পাশ করে ভাল চাকুরী গ্রহণ করে। সলিসিটরের চাকুরী। একটি মাত্র কন্যা তাদের বেশ ভাল্ভাবেই মানুষ হচ্ছে। মেয়ের যখন আঠারো বছর বয়স একদিন তার সুস্থ বাবা অকস্মাৎ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন। তাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। বিদেশ বিভূঁয়ে একা। তার চেয়ে দেশে আত্মীয়দের সঙ্গে থাকা ভাল।
বকুলের দুই ভাই বহু পূর্বেই সুইডেনের অধিবাসী। এক ভাই ঢাকার বাড়িতে থাকে মাকে এবং তার নিজের পরিবারের দুই পুত্র আর এক কন্যাকে নিয়ে। বকুল আসাতে তাদের ড্রইংরুম, থাকার ঘরে পরিণত হয়। বকুলের মেয়ে এলিজা কলেজে ভর্তি হয়। কিন্তু খাপ খাওয়ানো তার জন্য বড় কষ্টকর হয়ে পড়ে। তবে ভাগ্য ভাল যে সেই সময় ইংলিশ মিডিয়ামে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেওয়ার রীতি প্রচলিত হয়েছিল। কিন্তু সে প্রাণ খুলে কারো সাথে মিশতে পারে না। ভর্তি হলো বি.এ. ক্লাশে। কিন্তু বাসায় বসার জায়গা নেই। সুতরাং পড়াশুনা শিকেয় তুলে রেখে তাকে বিয়ে দিতে বাধ্য হলেন তার পরিবার। সেখানেও তার অপরিচিত পরিবেশে বনিবনা বা মানিয়ে চলার ব্যাপারটি সামনে এসে দাঁড়ালো। তবুও তার চেষ্টার অন্ত নেই। স্বামী তার ভাল চাকুরী করে। কিন্তু কি করবে স্ত্রীর জন্য বুঝতে পারে না। দিন যায়। একদিন একটি পুত্র সন্তান জন্মদান কালে তার ভীত প্রাণপাখি খাঁচা ছেড়ে উড়ে যায়। নবজাতক অনাথ হয়, সঙ্গে অনাথ হয় এক অসহায় নারী –নাম তার বকুল। বকুল বাচ্চাটিকে লালন পালন করতে থাকে। অচিরেই তা সংঘাতে পরিণত হয়। বকুল বাধ্য হয়ে তাদের বাচ্চাটি ফেরৎ দিয়ে আসে। তারপর আর কোনদিন তার সন্ধান করেনি।
নিরুপায় বকুল বাসায় একজন অনাকাংখিত ব্যক্তি। সে চম্পার সহায়তায় একটি বেসরকারী স্কুলে চাকুরী গ্রহণ করে। শুরু হয় নতুন জীবন। বাসার কাজ আর স্কুলের কাজ সব তাকে সামলাতে হয়। বাসার সদস্য সংখ্যা বাড়তে থাকে। জায়গার সংকুলান হচ্ছে না। বকুল তার মাকে নিয়ে বারান্দার কোণে আশ্রয় পাতে। সাত সকালে সে প্রতিদিন শয্যা ত্যাগ করে। বাসার সকলের সব কাজ করে কোন প্রকারে নিজে একটু কিছু মুখে গুজে স্কুলে যায়। এদিকে ভাই ভাবী নেহায়েত দরকার না হলে একটি কথাও বলে না। এমনি সময়ে তার বৃদ্ধা মা ইহলোকে ত্যাগ করেন। বকুলের অসহায়ত্ব বৃদ্ধি পায়। সে তো এ বাড়ীর মেয়ে ছিল। এখন কারো কেউ নয়। কেউ তার সঙ্গে কথা বলে না। এভাবে সময়ের সিঁড়ি বেয়ে চাকুরী শেষ হলো একদিন। স্কুলের ছাত্রীরা ফুলের মালা দিল, ভালবাসা দিল, জায়নামাজ, তসবীহ্ , বুখারী শরীফ, মস্তক আবৃত করার জন্য একটি হিজাব দিল। মেয়েরা, কলিগরা কাঁদলো বিচ্ছেদের বেদনায়। বকুল কাঁদে তার অবলম্বন হারাবার বেদনায়। ভগ্ন হৃদয়ে বকুল বাড়ি এলো। বারান্দায় তার হাতের দ্রব্যাদি বিছানায় রেখে চোখের জল মুছতে লাগলো। তারই মাঝে শুনতে পাচ্ছে সে, সময়কার চা –নাস্তা সময়ে তৈরী হয়নি। তাই বিরক্তি প্রকাশ করছে সকলেই। উঠে দাঁড়ালো বকুল। দেয়ালে আটকানো আয়নায় চোখ পড়লো। দেখলো তার বৃদ্ধ মুখ, বিধ্বস্ত চেহারা। রান্নাঘরে গিয়ে দ্রুত হাত লাগালো। সকলের চাহিদা পূরণ করে হাত মুখ ধুয়ে মাগরিবের নামাজে দাঁড়ালো। এমন সময় এলো একদল মেহমান। তারা নব প্রজন্মের আত্মীয় –কুটুম। কোনদিন বকুলের সাথে তারা কুশল বিনিময় পর্যন্ত করেনি যদিও তার তৈরী খাবার তারা আনন্দের সাথে উপভোগ করে। প্রশংশা কোনদিন কেউ করেনি। এদেরই কেউ খবরের কাগজের ঠোঙ্গায় করে চিনা বাদাম নিয়ে এসেছিল। কাজ শেষ করে ঠোঙ্গাটি যখন ফেলতে যাবে এই সময়ে চোখ আটকে গেল একটি বিজ্ঞাপনে। গাজীপুরের হোতাপাড়ায় বৃদ্ধদের জন্য আশ্রম। কোন খরচ লাগবে না। ষাট বছর বয়স,নিরাশ্রয়, অসহায়, মস্তিষ্ক বিকৃত নয় এমন মহিলাদের থাকা খাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এতদিন পর বকুল যেন অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষে একটু আলোর আভাস দেখতে পেল। পরদিন সকালে কাজ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়লো। বাসে চড়ে গেল গাজীপুরের কুড়িবাড়ী হোতাপাড়ায়। গভীর গজারী বনের অভ্যন্তরে এক আশ্রম। নাম তার বয়স্ক ও শিশু পূনর্বাসন কেন্দ্র। সংক্ষেপে ‘বশিপুক’। প্রতিষ্ঠাতা এক মহান ব্যক্তি। নাম খতিব আব্দুল জাহিদ মুকুল। যিনি নিজের খরচে এই অসহায় বৃদ্ধ – বৃদ্ধাদের অতি আপনজন হয়ে আশ্রয় কেন্দ্র খুলেছেন এবং সবদিকে খেয়াল রাখছেন। বকুল মেয়েদের এলাকায় গেল। লম্বা টানা বারান্দাওয়ালা ব্যারাক। সুপ্রশস্ত কামরা। সঙ্গে প্রশস্ত বাথরুম। প্রতি রুমে দুই সারিতে পাঁচজন করে দশজন থাকে। ডাইনিং রুম, টিভি রুম, নামাজের ঘর, রান্না ঘরের বিরাট এলাকা, আর আছে অফিস রুম সমূহ।
বকুল ঘুরে ঘুরে সব দেখলো। প্রত্যেক রুমের সামনে বসার জন্য বেঞ্চ পাতা আছে। বকুলের মন চলে গেল অতীতে। তারা দুই বোন হস্টেলে থাকতো। দলবেঁধে গান গাইতো , নাচতো, ফাংশান করতো, কবিতা আবৃত্তি করতো। বকুল একটা কবিতা খুব গাইতো –
Row row row your boat,Gently down the stream
Merrily merrily merrily, Life is but a dream.
সব মেয়েরা একসঙ্গে গেয়ে উঠতো। মেট্রন খালাম্মা কত বকা দিতেন। আজ কোথায় গেল সেসব সোনাঝরা দিন। আবার ফিরে এলো হস্টেলে। ছোট বেলার স্বপ্ন ছিল সুখের স্বপ্ন। এখন আছে ফেলে আসা অতীতের ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন। দরজায় বসে আছে জরা ,ব্যাধি আর মৃত্যু। সামনে শেষ বিকেলের অন্ধকার, নিঃশব্দ রাত্রির সেই কবরস্থানের আহ্বান।
আবার কান্না এলো বকুলের। বুক ভাঙ্গা কান্না! বাসায় তো কান্নার স্বাধীনতাটুকুও ছিল না। এখানে সে কাঁদতে পারবে, হাসতে পারবে শান্তি না থাক স্বস্তি থাকবে। বকুলের মনে পড়ে গেল অদৃষ্টের কথা। হায়রে অদৃষ্ট। কি অনিষ্ট করেছিলাম আমি তোর? এত বড় বিশ্বে আমার কত বড় ঠাঁই এর প্রয়োজন ছিল। How much land does a man require? আমার যমজ বোন চম্পা, সে তো মহাসুখে আছে, আদরে, মমতায় সকলের মা হয়েছে। আমার গুণ তার চাইতে কম কিসের! সেও আমা হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আমার খোঁজ রাখে না। পাছে তার সুখে ভাগ বসাই। এক জোড়া কাপড় আর যত সামান্য জিনিসপত্র নিয়ে আমি এ আশ্রমে এসেছি। টাকা পয়সা যা কিছু ছিল সব ফেলে রেখে এসেছি।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে আনমনা হয়ে ভাবছিল বকুল। হঠাৎ দেখে বারান্দার নীচে অনেক শিউলি গাছে। শরতের সকালের ঝরা ফুলে ছেয়ে আছে চারিদিক। দেখবার কেউ নেই। মনে পড়ে গেল স্কুলের স্টেলের কথা। লুকিয়ে লুকিয়ে ভোর বেলায় ফুল কুড়িয়ে মালা গেঁথে বন্ধুদের দিত। অদূরে দেখা যাচ্ছে বাগানে একটা দোলনা। পুরানো সেই দিনের কথা স্মরণে এলো।
‘মোরা ভোরের বেলা ফুল তুলেছি, দুলেছি দোলায়-
বাজিয়ে বাঁশি গান গেয়েছি বকুলের তলায়।’
যমজ বোনের কথাই বকুলের মনে পড়ছে বেশী। সেই তাকে দেখেশুনে রাখতো। তার জ্বর হলে নিজের জ্বর উপেক্ষা করে চম্পার শুশ্রূষার দিকে ছিল তার সকল মনোযোগ। বোন ছিল তার প্রান প্রিয়। অথচ আজ মনে হচ্ছে মানুষ একাই জন্ম গ্রহণ করে। তার কী প্রয়োজন ছিল চম্পার সঙ্গে জন্মাবার। কেন এসেছিল সে? কেন পেয়েছিল এত আদর, সোহাগ, মায়া মমতা, স্বামী সন্তান, সুখ সমৃদ্ধ –কি দরকার ছিল? কোনো মহাভারত কি অশুদ্ধ হতো তার জন্ম না হলে? কেন হারালো সব? কেন পরাশ্রিত হলো? নিজের উপার্জন, কর্মদক্ষতা থাকা সত্বেও কেন অন্যের গলগ্রহ হয়েও অপমানিত হলো? কি দোষ ছিল তার? তবুও হয়েছে। এই তার নিয়তি। তার তকদীর । তার কপালের লিখন!
বৃদ্ধাশ্রমে সব বুক ভাঙ্গা, মন ভাঙ্গা, দুঃখী মানুষের বসবাস। যারা জীবনের বৃন্ত হতে বিচ্ছিন হয়েছে, বাড়িতে থেকে পরিত্যক্ত হয়েছে, তারাই এখানে আশ্রয় পেয়েছে। জীবনের শেষ আশ্রয়। ঘাটের পাড়ে নিজের নৌকা খানির অপেক্ষায়। এখানকার সকলের সঙ্গে বকুল সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করে নেবে। সকলকে ভালবাসবে। দুঃখে যাদের জীবন গড়া তাদের আবার দুঃখ কিসের। কি পেয়েছি, কি পাইনি, সে হিসাব আর কোনদিন করবে না। আর ভবিষ্যত? সে তো সেই আলেমুল গায়েব –তারই হাতে ন্যস্ত। ভাগ্যবান, ভাগ্যহত সকলেই যার কাছে সমর্পিত।
No comments:
Post a Comment