Showing posts with label ভ্রমন কাহিনী- একটি ভয়ঙ্কর রাত্রি. Show all posts
Showing posts with label ভ্রমন কাহিনী- একটি ভয়ঙ্কর রাত্রি. Show all posts

Friday, February 27, 2026

ভ্রমন কাহিনী- একটি ভয়ঙ্কর রাত্রি

 তিমির রাত্রি। গভীর অন্ধকার। শব্দহীন, বর্ণহীন। চারপাশে কি আছে, কি নাই, ঠাহর করা যায় না। কঠিন শৈত্যের হিমশীতল পরশ অস্থিতে কম্পন জাগায়। হৃৎস্পন্দন জানান দিয়ে বলে বেঁচে আছি।

কোয়েটা থেকে ফোর্ট সান্দামানে যাচ্ছিলাম আমরা যুদ্ধ বন্দির দল (Prisoner of War)। তখনও গন্তব্য জানা ছিলনা। দীর্ঘ রেল ভ্রমণের এক পর্যায়ে হিন্দুকুশ পর্বতের একটি শাখা অতিক্রম করতে হয়। তখন রজনী দ্বিযাম অতীত।  হঠাৎ ট্রেনের গতি শ্লথ হয়। দস্যুর ভয়ে নয়। সামনে চড়াই। অর্থাৎ খাড়া পর্বত আরোহণ। খুবই বিপদজনক পরিস্থিতি। রেলগাড়ির পেছনে গার্ডের কামরার সঙ্গে যুক্ত করা আছে আরেকটি এঞ্জিন। যাত্রীবাহি ট্রেনটি যখন উপরের দিকে চলবে তখন পেছনের এঞ্জিনটি তাকে ধীরে ধাক্কা দিবে যেন ভারসাম্য রক্ষা হয়। শত শত চাকার ট্রেনটির সম্মুখের এঞ্জিনটি টানতে থাকে উপর থেকে। নীচেরটি তাকে ধাক্কা দিয়ে সহায়তা করে। গভীর পার্বত্য অঞ্চলে ট্রেনটিকে একটি শতপদী সরীসৃপের মত দেখায়। চারিদিকে গিরিখাত অন্ধকারে দৃশ্যমান নয় বলে সেই আতংকের হাত থেকে রেহাই পেয়েছি। তবুও ট্রেন চলতে থাকে  একমাত্র লাইটটিকে সম্বল করে। ট্রেনের গতি বেশ ধীর। মনে হয় অতিশয় সতর্কতার সঙ্গে চলছে। তারপর শুরু হয় পর্বতের উপরিভাগ অতিক্রম করবার পালা। ট্রেনের অর্ধেক পর্বতের ওপারে, বাকি অর্ধেক এপারে।   

শব্দেরও ভাষা আছে। ট্রেনের লোহালক্কড়ের  আওয়াজের মাধ্যমে তার গতিবিধি কিছুটা হলেও আন্দাজ করা যায়। এবার উৎরাইয়ের পালা। ট্রেন নামতে থাকে। পর্বতের ওপারে যখন চলতে শুরু করে তখন পেছনের এঞ্জিনটি তাকে টেনে ধরে রাখে যেন ট্রেনটি নিজের ভারে উল্টে পড়ে না যায়। সামনে এঞ্জিনটির কাজ হলো সতর্কতার সঙ্গে লাইনের উপরে থাকা এবং ধীরে ধীরে চলা। মনে হলো ট্রেনও দম নিচ্ছে, ভয় পাচ্ছে। আমরা যাত্রীরাও ইষ্টনাম জপ করতে লাগলাম। যদি কোনরকমে দুই এঞ্জিনের ব্যালেন্স একটু এদিক ওদিক হয়, তখন ট্রেনটি গিয়ে কোথায় পড়বে এবং কিভাবে পড়বে কেউ তা জানে না। বহির্বিশ্বে কেউ জানতে পারবে না, এই ঘন তমসাচ্ছন্ন ভয়ংকর রাত্রির ভয়ংকর দুর্ঘটনার কথা। কেউ জানতে পারবে না এই যাত্রীদের জীবনের যাত্রা ভংগের কথা। কেউ জানতে পারবে না এইসব  যাত্রীদের নিজের স্বপ্ন ছিল, আশা ছিল, আনন্দ ছিল, আরো কিছুকাল বাঁচার আকাংখা ছিল।     

নিশ্ছিদ্র আন্ধকার, চোখ বন্ধ রাখার কোন অর্থ হয় না। তাই দম বন্ধ করে প্রহর গুনতে লাগলাম আমি এবং আমার স্বামী মেজর হারুন, আর আমাদের শিশু কন্যা। আমাদের কম্পার্টমেন্টে আছেন কর্নেল রাকিব এবং মিসেস রাকিব এবং তাদের সাত রাজার ধন –সাত সন্তান। দিনের বেলায় তাদেরকে দেখেছিলাম। আঁধার হওয়ার পর আমরা কেউ কারো চেহারা দেখতে পাইনি। এমন ভয়ানক ভ্রমণ, যে কথাবার্তা তো দূরের কথা, এক অদ্ভুত নীরবতা আমদেরকে গ্রাস করে ফেলে। এভাবে ট্রেন হেঁটে হেঁটে চলতে লাগলো।  এই ট্রেনটি একটি ন্যারো গেজের লাইনের উপর দিয়ে চলে। পথ দুর্গম বলে প্রতিদিন রেল চলাচল করেনা। এই পার্বত্য অঞ্চলে অন্য কোন স্টেশন আছে বলে মনে হয়না। কারণ লোকালয় নেই। সুতরাং রেললাইনের গন্তব্য একটাই। ফোর্ট সান্ডামান। ইরানের  বর্ডারের নিকটবর্তী, পাহাড়ে ঘেরা পাকিস্তানের একটি বিরান পরিত্যক্ত অঞ্চল। বৃক্ষলতাহীন, মনুষ্য বসতিহীন, জীবজন্তুহীন, পশুপাখিহীন। সেইজন্য বিষাক্ত ও নিরীহ সর্প ও পোকা মাকড়েরা এখানে ঘরবসতি করে নির্বিঘ্নে। এই ফোর্ট সান্দামানেই আমাদের যুদ্ধবন্দি করে রাখা হয়।

প্রাকৃতিক দুর্গ। পালাবার উপায় নেই। ব্রিটিশ আমলে এটি একটি ফোর্ট ছিল। এখানে বসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অত্যাচারি শাসকেরা এই দেশীয় রাজ্য শাসন করতো। পাহাড়ের উপর ছিল তাদের আস্তানা। রাতে জ্বালিয়ে রাখতো সার্চ লাইট। ঘুরে ঘুরে সে লাইট চারিপাশে নজরদারি করতো। আমরা ওখানে নির্বাসিত হওয়ার বহু বছর পূর্বে এ স্থান পরিত্যক্ত হয়। চারিপাশের পাহাড় পর্বত পার হয়ে কোন দিকে পালাবার কোন উপায় নেই। তবুও প্রহরা ছিল বড়  কড়া এবং আচরণ ছিল বড় নির্মম, নিষ্ঠুর এবং রুক্ষ। 

ন্যারো গেজের লাইনের উপর চলে ছোট ডাব্বা অর্থাৎ ছোট ছোট কামরা। প্রতিটি কামরায় দুইপাশে এবং মাঝখানে লম্বালম্বি ভাবে তিন সারি বেঞ্চ। চওড়া নয় মোটেও। আমরা তিনজন এককোণে । দুই বেঞ্চের মাঝখানে স্যুটকেস রেখে বেঞ্চের সমান উচ্চতায় শিশুকন্যার বিছানা তৈরী করে নিয়েছি। লক্কর ঝক্কর ট্রেনের কামরায় অনেক ফাঁক  ফোকর আছে। সেগুলো দিয়ে ঠান্ডা বাতাস আর বরফ গলা জল ভিতরে ঢুকছে। সেগুলো রোধ করার জন্য টাওয়েল গুঁজে দিয়েছি। কামরার ভিতরে ডিপ ফ্রিজের চাইতে ঠান্ডা। একটু পর পর হাতের ছোট্ট টর্চ জ্বালিয়ে দেখি আমার শিশু কন্যা ঠিক আছে কি না। ট্রেনের ঝাঁকুনীতে সে তো গভীর ঘুমে।  যত গরম কাপড় সব তার পরিধানে। আমাদেরও একই অবস্থা। তবুও মনে হয় এগুলো কোন গরম কাপড়ই নয়। 

এভাবে কাটতে থাকে ভয়ংকর প্রহর। একসময় বোধ হলো অবতরনের পালা সমাপ্ত। ট্রেন সমতলে নেমেছে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচলাম। বাঁচার প্রথম পর্ব অতিক্রান্ত। ট্রেন এখন ঝিকঝিক কর থেমে থেমে চলছে। এরকম একবার যখন ট্রেন থেমে থাকে তখন মেজর হারুন ট্রেনের সশস্ত্র পাঞ্জাবী প্রহরীদের নিকট থেকে পারমিশান নিয়ে ইঞ্জিন থেকে গরম পানি আনতে যান। কারণ সঙ্গে রাখা গরম পানি এতক্ষণে ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। তাতে বাচ্চার জন্য দুধ তৈরী করা সম্ভব ছিলনা। তখন  তিনি দেখতে পেলেন রেল লাইন বরফে ঢাকা। বাঙালী বন্দি সিপাহীগণ বরফ কেটে লাইন পরিষ্কার করছে এবং ট্রেন ধীরে ধীরে চলছে। মনে পড়লো মধ্যযুগীয় ক্রীতদাসদের কথা। ‘দি রুটস্‌’ ফিল্মের কুন্তা কিন্তের কথা। আমাদেরকে নির্বাসনে পাঠিয়ে তাদের কি লাভ হচ্ছে বুঝতে পারলাম না। ক্ষমতা এমন জিনিস যা মানুষকে দানবে পরিণত করে। চতুর ইংরেজ, রেলের লাইন বরাবর স্লিপারের নীচে গর্ত করে রেখেছে। পরিষ্কার করা বরফ ঐ গর্তে পড়ে যাচ্ছে। এই কঠিন শীতে গভীর অন্ধকার রাতে বাঙালী সৈনিকদেরকে দিয়ে বরফ পরিষ্কার করানো যেন রূপকথার দৈত্যদানোর কল্পকাহিনীকেও হার মানায়। বাঁচার  আশায়, কঠিনশাস্তির ভয়ে তারা একাজ করতে বাধ্য। কারণ তাদের আশে পাশেই আছে বন্দুকধারী প্রহরী। তারা অবশ্যই কামরার ভেতরেই অবস্থান করছে।  মেজর হারুন থার্মোসে করে গরম পানি নিয়ে ফিরে এলেন। গরম দুধ তৈরী করে বাচ্চাকে দিলাম। দেখি বাচ্চা দুধ পান করছে। স্বস্তি পেলাম যে সে ঠিক আছে। 

দুঃখের রজনী যেন শেষ হতে চায়না। 

বাচ্চার পাশে দু’জনে বসে থাকতে থাকতে একসময় রাত পোহালো। পাখির কোলাহল শোনার ভরসা মিছে। চারিদিকে শ্বেতশুভ্র বরফের সাদা আভায় ভরে গিয়েছে। সারা নিশি গভীর অন্ধকারে নিমগ্ন ছিলাম। প্রভাতে সেরকমই সাদা আলোর আভায় চোখ ধাঁধিয়ে গেল। তবে পূর্বদিক কোনদিকে, সূর্য কোথায় কিছুই বুঝা গেল না। 

ট্রেন ধীরে ধীরে চলতে লাগলো। চতুর্দিক কেবল বরফে ঢাকা পাহাড় আর পাহাড় –ছবির মত। আর কিছুই দেখার ছিল না। এ এক অন্য জগৎ। যেন অন্য গ্রহে। নদী নেই, নালা নেই, গাছ নেই, পালা নেই, মানুষ নেই, পশু নেই, পাখি নেই, জলাশয় নেই, জনপদ নেই। কি বিচিত্র দৃশ্য। তবু ধুরন্ধর ব্রিটিশ এই দুর্গম পথ কোনকালে তৈরী করে রেখেছে, কেন কে জানে! যেখানে শস্য এই, সম্পদ নেই, দুর্বাঘাস পর্যন্ত নেই। বালির স্তুপ আর কঙ্কর পাথর মৃত্তিকার স্তরকে ঢেকে রেখেছে। 

চতুর ইংরেজ তাদের প্রভুত্ব বজায় রাখার জন্য এই রেলপথ নির্মাণ করেছিল আমাদের মত নিরাপরাধ মানুষকে বন্দি রাখার জন্য। কবে কোথায় কে বা কাহারা, কি অপরাধ করবে, তাদের জন্য কি এই দুর্গ নির্মাণ? মানুষকে শাস্তি দেবার জন্য কত প্রাণের বিনিময়ে, কত অর্থের বিনিময়ে এই এ পথ তৈরী করা হয়েছিল তা তারাই জানে। এই দুর্গম দুর্গ নির্মাণ  তৈরী করে এই পৃথিবীতে   মানুষকে পারত্রিক জীবনের নারকীয় স্বাদ গ্রহণ করিয়ে পৈশাচিক অনন্দ লাভ করা ছাড়া আর কি হতে পারে?

এই রেলভ্রমণ এক ভয়ংকর রাত্রির বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা একটি দুঃস্বপ্নের মত। যেন পুনর্জন্ম লাভ করে এ মাটিরে পৃথিবীর মাটির গৃহে ফিরে এলাম। 

১৬ই ডিসেম্বর, ২০১০


***


উৎসর্গ

 আমার পিতাকে যাঁর জীবনের পাথেয় ছিল আপোষহীন নীতি আর শৃঙ্খলা।   আমার মাতাকে ছেলেমেয়েদের মেধা ও মননশীলতায় যিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। আমার স্বামী...