Friday, January 30, 2026

প্রবন্ধ - নারী

 অনাদি কালের স্রোতে নারী পুরুষ মিলেই সৃষ্টির ধারা প্রবাহিত। স্বর্গ উদ্যান হতে যদি আদম হাওয়া একসঙ্গে বহিস্কৃত না হতেন, তবে আদম একা একা বনে বাঁদাড়ে জীবন কাটিয়ে দিতেন। গৃহ বা সংসার হতো না। অন্য জীব জন্তুর ন্যায় তার জীবন অতিবাহিত হতো। 

নারী পুরুষ একজন আরেকজনের পরিপূরক। ‘বিশ্বে যা মহান চির কল্যাণকর/ অর্ধের তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’    

নারী – মাতা, ভগ্নি, বধূ, কন্যারূপে সংসারে মায়ার বন্ধন সৃষ্টি করে । তার হৃদয় স্নেহ ভালবাসার মনি মঞ্জুষা। তার  মমতার ঝর্ণাধারা একের সঙ্গে অপরের সম্পর্ক মধুর করে। নারী মিষ্টভাষী। কথার জালে পরিবারের এবং সমাজের সঙ্গে সকলকে সম্পৃক্ত করে। সন্তানের মাতা হিসাবে তার তুলনা নেই। সন্তানকে স্নেহ ভালবাসা দিয়ে, সাহস দিয়ে সকল বিপদ আপদ থেকে অতন্দ্র প্রহরীর মতো আগলে রাখে। সন্তানকে মানুষ হতে দেখে জগতের সব যন্ত্রণা ভুলে যায় এই মহীয়সী নারী – এই মা। মা শব্দটি যেন মধুর , বন্ধনও তেমনি নিবিড়। দেশ কাল পাত্র ভেদে পাহাড়ে অরণ্যে কিম্বা মরু অথবা মেরু অঞ্চলে – সর্বত্র মা একজন মা –ই । সে যে তুলনা রহিত –সন্তানের মাতা। 

একটি বিদেশী গল্প প্রচলিত আছে। নাম তার ‘মাদার ট্রি’ যার বাংলা নাম ‘গাছ –মা।’ এই বৃক্ষমাতার একটি সন্তান ছিল। সে বড় হয়ে তাকে ছেড়ে চলে গেল নিজের জীবনের সন্ধানে। একদিন সে মায়ের নিকট এসে বলে, মা, আমার টাকার প্রয়োজন। মা বললেন, 

- কি দিই বাছা! আমার পত্র পল্লব ছিন্ন করে নিয়ে যাও। তোমার চাহিদা   পূরণ হবে। 

পুত্র চলে গেল। কিছুকাল পর আবার সে মায়ের কাছে এলো। একই আবদার। মা বললেন, 

- এবার তুমি আমার ডালপালা কেটে নিয়ে যাও। তাতে প্রয়োজন মিটবে। তাই হলো। 

বেশ কিছুদিন পর আবারও এলো সে। বললো, এবার কি দিতে পারো?

মা বললেন, গোড়া থেকে করাত দিয়ে কেটে নাও। তাতে অনেক মুদ্রা পাবে। তোমার অনেক অভাব ঘুচে যাবে। 

পুত্রের দুরবস্থা দেখে বৃক্ষ মাতা চোখের জল রোধ করতে পারে না। দীর্ঘদিন অতিক্রান্ত হলো। পুত্রের দেখা নেই। হয়তো ভাল আছে। অকস্মাৎ একদিন পুত্র এসে হাজির। বিধ্বস্ত, বিমর্ষ, বয়স্ক। খুঁজে পায় না কোথায় তার মা? যে নাকি মায়া দিয়ে, ছায়া দিয়ে, আশ্রয় দিয়ে নিজের সব উজাড় করে দিয়েছিলেন। হঠাৎ মায়ের কন্ঠ শুনতে পেল ছেলে। 

- কি জন্য এসেছ বাছা?

- মা, আমার তো কিছুই নেই। 

মা বললেন, আমারও কিছুই নেই বাছা। তুমি তো বড্ড ক্লান্ত। শুকনো পাত আর শুকনো বালি সরিয়ে দেখ, এইখানে আমি। আমার গুড়িটিতে বস। একটু জিরিয়ে নাও। তোমার ক্লান্তি দূর হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে রুশ আগ্রাসনে আজ লক্ষ লক্ষ মানুষ ইউক্রেইন থেকে প্রাণ রক্ষার্থে আশ্রয়ের সন্ধানে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে ছুটে চলছে। সেখানে আবহাওয়া কতই না প্রতিকূল, কতই না ভয়ানক ঠাণ্ডা। সেখানে প্রতিটি মা তার এক সন্তানের হাত ধরে আরেক সন্তানকে কোলে নিয়ে হেঁটে চলছে মাইলের পর মাইল। আহার নেই, নিদ্রা নেই, নিশ্চিন্ত গন্তব্য নেই। এরকম একজন মায়ের ছবি দেখলাম পত্রিকায়। প্রচন্ড ঠান্ডার মধ্যে রেল স্টেশনে ভারি গরম পোশাক পরিহিত আতঙ্কিত মা বেঞ্চে বসে  অপেক্ষা করছেন। ক্রোড়ে তার শিশু সন্তান ভারি গরম কাপড়ে তারও আপাদমস্তক ঢাকা। ঘুমাচ্ছে নির্ভয়ে। এ দৃশ্য দেখে আমার চোখের কোল বেয়ে অশ্রু নেমে এলো। এই –ই  তো আদি থেকে অনন্ত কালের মা!   

নারী ভগ্নি – ভ্রাতা, ভগ্নির সম্পর্ক তুলনাহীন। স্নেহ মমতায় পূর্ণ মণিমাণিক্যের মতো দামী, উজ্জ্বল। এ সংসারে ভাই বোনের ন্যায় আর আপন কেউ নেই। এ সম্পর্ক কেবল বোনই তৈরী করে এবং ধরে রাখে চিরকাল। ভাইয়ের মঙ্গল চিন্তায় বোন সারাজীবন ব্যাকুল থাকে। 

‘কত মাতা দিল হৃদয় উপাড়ি, কত বোন দিল সেবা
বীরের স্মৃতি স্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কে বা।’
নারী বধূ – কেবল বধূই নহে বন্ধুও বটে। এই পৃথিবীর আকাশ – বাতাস, পাহাড় – নদী, ঝর্ণা, ফুল –ফল, শস্য শ্যামল বিস্তীর্ণ অঞ্চল – এসবই নারী তার পুরুষ সংগীকে নিয়ে উপভোগ করবার জন্যই প্রকৃতি সৃষ্টি করেছেন। পাখির কন্ঠে জেগে উঠে প্রভুর সুমধুর জয়গান। পুরুষ রমণী মিলে এই জয়গান, নদীর কলতান, সাগরের বিরহি গর্জন – অন্তর হতে অন্তরে সঞ্চারিত করে।  তারা হারিয়ে যায় অন্য কোন মোহময় জগতে, অন্য কোথাও মহামিলনের অন্তঃপুরে।
নারী কন্যা – বিধাতার এক অপূর্ব উপহার। একটি কন্য সন্তানের সঙ্গে হীরা, মতি, জহরতের তুলনা চলে না। সে যে আঁধার ঘরের আলো। স্নেহ মমতার উৎস। তার জাদুকরী হাসি, আনন্দ পদচারণা, সবার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়া – সে এক অপূর্ব  মধুময় অনুভূতির সঞ্চার করে। 
সভ্যতার অগ্রযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে নারীর অগ্রযাত্রা থেমে নেই। ঘর, সংসার রক্ষা করা সন্তান লালন, পালন করা, মনুষ্যত্বের শিক্ষা দান করা, অফিস আদালতে দক্ষতার সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালন করা – কোনদিকে নয়?  সর্বদিকে আজ নারীর জয়জয়কার। তবুও স্বীকার করতেই হয় আজও নারী নিগৃহীত, নির্যাতিত। এই নির্যাতনের কারণ নারীর অশিক্ষা। অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং অন্য নারীদের সহযোগিতার অভাব। নারী পুরুষ উভয়কেই নিপীড়িত নারীদের রক্ষা করবার দায়িত্ব নিতে হবে। তাদেরকে সামনে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। 
প্রকৃতিগত ভাবে নারী দুর্বল। অনেক বর্বর পুরুষ এই দুর্বলতার সুযোগ গ্রহন করে। নারীর উপর তাদের বাহুবল প্রয়োগ করে। মেয়েদেরকে শারিরীক ও মানসিক অত্যাচারেরে হাত থেকে রক্ষা করবার জন্য পিতা, ভ্রাতা, স্বামী ও পুত্র হিসাবে পুরুষদেরকে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।
সাম্প্রতিক কালে CEDAW  নামে একটি প্রতিষ্ঠান তৈরী হয়েছে। এটি হচ্ছে Convention on Elimination of all forms of Discrimination Against Woman. এই প্রতিষ্ঠানটি নারী নির্যাতন নিবারনের জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছে। আশাকরি দিনে দিনে নারীরা একটি সুন্দর, সুশীল সামাজিক পরিবেশে সম্মানজনক জীবন কাটাতে পারবে। 
কাজীনজরুল ইসলাম রচিত ‘নারী’ কবিতা পাঠ করলে আর কিছু বলবার বাকী থাকে না। তবুও দু’চারট পংক্তি বলা প্রয়োজন মনে করি। কবি বলেছেন, “পুরুষ হৃদয়হীন –  মানুষ করিতে নারী দিল তারে আধেক হৃদয় ঋণ।”
“নারীর বিরহে, নারীর মিলনে নর পেল কবি প্রাণ,
যত কথা তার হইল কবিতা, শব্দ হইলো গান।”
“এ বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল, ফলিয়াছে যত ফল,
নারী দিল তাহে রূপ –রস –মধু –গন্ধ  সুনির্মল। 
জ্ঞানের লক্ষী, গানের লক্ষী, শস্য – লক্ষী নারী,
সুষমা –লক্ষী নারীই ফিরিছে রূপে রূপে সঞ্চারি। ”
কবি আরো বলেছেন,
“সেদিন সুদূর নয় –
যেদিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়।”

আজ লক্ষ্য করা যাচ্ছে নারীর অগ্রযাত্রা। পুরুষের চাইতে নারীর যোগ্যতা ও দক্ষতা কোন অংশেই কম নয়। জীবনের সর্বক্ষেত্রে ঘরে অথবা বাইরে নারী আজ পুরুষের সঙ্গে সমান তালে তার নিজের যোগ্যতার প্রমাণ রাখছে। নারী ধৈর্য্যশীল, বিশ্বস্ত। ক্ষমাশীলও বটে। আজ চারিদিকে নারীর জয়জয়কার। জীবন যাত্রার মানও উন্নত করছে। পরিবার ও সমাজে নারী সসম্মানে অগ্রসরমান।       
***



Friday, January 16, 2026

প্রবন্ধ - মধ্যরাতের কড়চা

লেখার খুব ইচ্ছা। কিন্তু কি লিখবো বুঝে উঠতে পারছি না। একবার ভাবি কবিতা লিখি। আবার ভাবি গল্প লেখাই শ্রেয়। তাতে মনের ভাবটি যথাযথ প্রকাশ করা সম্ভব। কিন্তু কোনোটি হয়ে উঠে না। কবিতার ছন্দ মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাই। একটি শব্দ ধরে এনে আরেকটির পাশে বসাই। যেন জোর করে বিয়ের পিড়িতে বসানো। কনের মুখ অধোবদন। বরের উচ্চশীর। কারণ বাহাদুর সে। বৌ নিয়ে বাড়ি যাবে। যেমন আলেকজান্ডার দিগবিজয় করে দেশে ফিরে যেতেন।  কিন্তু কনের সে বাহাদুরি নেই। কারণ আজ প্রাপ্তির চাইতে হারাবার দিন। এত আনন্দ উৎসবের ভিতর দিয়ে তার আজন্মের আশ্রয় থেকে উচ্ছেদ করা হলো। সে হতে যাচ্ছে পরবাসী, পরাশ্রয়ী – যে আশ্রয়ের কোন নিশ্চয়তা নেই। 

যে কোন ঝড়ে বুলবুলির বাসার ন্যায় তার আশ্রয়টি দমকা হাওয়ায় কোথায় উড়ে যাবে সে তা জানে না। তার একূল ওকূল – দুকূলই অস্থায়ী হল। সেজন্য কাব্যচর্চা একটি সাধনারই বিষয়। অন্ত মিলের শব্দটি পছন্দসই না হলে তাকে বাদ দিয়ে আরেকটি শব্দ চয়ন করতে হয়। সেটি জুতসই না হলে আরেকটি। মন মতো পেয়ে গেলে তবে সে শব্দটি টিকে থাকে। সুতরাং কাব্য সাধনা সরস্বতির দান। কসরত করেই তবে সাধনায় সিদ্ধি লাভ করা । পরক্ষণে মনে করি প্রবন্ধ রচনাই উত্তম। কোন কিছু হারাবার ভয় নেই। যা বাস্তব তাই ব্যক্ত করা। তার ভাল ভাল দিক , মন্দ দিক, ক্ষতিকর দিক, শোধরানোর দিক সব ব্যাখ্যা করা যায়। তাতে কারো না কারো জ্ঞান পিপাসিত হৃদয়ে কিছু না কিছু বারিসিঞ্চন করা সম্ভব হয়। এতে জোর করে ধরে এনে বরকনের পদ্য লেখার প্রয়োজন পড়েনা। আর গদ্য কাব্যের মত বেসুরো তানপুরার তাল – লয়হীন ধ্বনির আঘাতে কানেরও বারোটা বাজাতে হয় না।গদ্য কবিতা সত্যিকার অর্থে রচনা করা খুবই কঠিন। যদিও মনে হয় পত্রিকার বিজ্ঞাপন অথবা যে কোন মজার খবর হ্রস্ব – দীর্ঘ  লাইনে খাড়া করে দিলেই কবিতা হয়ে গেল। আসলে তা মোটেই না। তাল, লয়, ছন্দ, অর্থ ঠিক রেখে তবেই গদ্য কবিতায় হাত দিতে হয়। নচেৎ নির্ঘাত তার মরুপথে যাত্রা করতে হয়। সে আর গতি খুঁজে পায় না। যথেষ্ট দক্ষতার এবং মুন্সিয়ানার প্রয়োজন হয় গদ্য কাব্য রচনায়। আর আমরা যারা পাঠক, তাদের ঠকারই সম্ভবনা বেশী। খুঁজে খুঁজে পথ হারাই। ক্ষ্যাপার মত। ‘যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দিবে তাই।’ ছাই উড়াতে গিয়ে জীবনের অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়। তবুও একটি স্বরবৃত্ত বা মাত্রাবৃত্তের ছন্দোবদ্ধ সুখপাঠ্য গদ্য কবিতা খুঁজে পেতে সময় চলে যায় অনেক।

এখন বাকী রইলো গল্প বলা। গল্প বলাতো সহজ কাজ। মনের যত কথা গড়গড় করে বলে বলে যাওয়াই তো গল্প। সে কথা আংশিক সত্য। তবে প্রকৃত পক্ষে গল্প পরিপক্ক হাতের লেখা বটে। একটি মনোমুগ্ধকর গল্প লেখার জন্য প্রয়োজন হয় উচ্চ শ্রেণীর সৃজনী শক্তি। অনেকটা প্রকৃতি প্রদত্ত, অনেকটা চর্চা। পড়াশুনা করে জ্ঞান অর্জন, স্বতঃস্ফুর্ত আগ্রহ, প্রখর দৃষ্টি , সর্বোপরি মানবতা বোধ। এসব গুণাবলীর সমন্বয়ে একটি হৃদয়গ্রাহী গল্প রচনা সম্ভব।

নানা আকারের গল্প পড়ি আমরা। অনেক সময় একটি ছোট গল্পও হৃদয়, মন, আত্মাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়ে যায়। কয়েকদিন তা ভুলতে পারিনা। অনেক সময় শ্বাস রুদ্ধকর অবস্থায় পড়া শেষ করি। অবাক হয়ে ভাবি, কি করে লেখক এমন একটি বিষয় চয়ন করলেন? কি করে এমন চমৎকার ভাবে বর্ণনা করলেন। উপমা, উপস্থাপনার সৌন্দর্য্য স্টাইল কেমন করে পেলেন। যেমন মার্ক টোয়াইনের গল্পগুলো এমন দমবন্ধকর অবস্থায় পড়ে শেষ করতে হয়। সে এক অপূর্ব অনুভূতির সঞ্চার করে। আমি এখানে খুব উচ্চ  শ্রেণীর লেখক কবিদের কথা বলছি না। যারা কাব্য সাহিত্য চর্চায় নিয়োজিত রাখেন নিজেদেরকে, তাদের কথাই বলছি। গল্প মানুষের উর্বর মস্তিষ্কের ফসল। চর্চা করতে করতে একদিন তা ‘সোনালী ধানের শীষে ফলিয়া উঠিবে’ – সন্দেহ নেই।

যদি অর্ধেক পরিমাণে গল্প পঠন, কবিতা আবৃত্তি, প্রবন্ধ পর্যালোচনা করি, তবেই আমরা –সাধারণ পাঠকরা, অনেক মানিক–রতন  কুড়াইয়া পাইতে পারি। লিখতে না পারি, পড়তে তো পারি। পাঠ করে যদি মধু মক্ষীকার মতো মধুরস আহরণ করতে পারি, তবে অতৃপ্তি কোথায়? তৃপ্তিই তো জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ আনন্দ।
‘ছোট প্রাণ ছোট কথা,
ছোট ছোট দুঃখ ব্যথা, 
নিতান্তই সজহ সরল
অজস্র বিস্মৃতি রাশি
প্রত্যহ যেতেছে ভাসি,
তারই দু’চারটি অশ্রুজল!’

এই উপলব্ধিই তো আমাদের বড় প্রাপ্তি।    


***


Thursday, January 1, 2026

প্রবন্ধ - ঘড়ির কাঁটার হেরফের

 ঢাল নেই তলোয়ার নেই, নিধিরাম সরদার। দেশে আইন নেই, শৃংখলা নেই, বিদ্যুৎ নেই, চাকুরী নেই তবুও বীনদেশী নিয়ম কানুন প্রচলন করে উন্নতির বুলি উচ্চারণ করি। সবকিছু ধ্বংসের পথে। উন্নতির ক্ষেত্র কোনটি তা গবেষণার বিষয়। বিদেশের সময় পরিবর্তনের ঘটনা  দেখে আমাদের মত দেশের সাধ জাগে বছরে দু’রকম সময়ের ঘোড়া চালাতে। তাতে নাকি দেশের উন্নতি হবে। বিদ্যুতের উৎপাদন সময়ের হেরফেরে কিভাবে সম্ভব এবং কতটুকু সম্ভব সেটা ভাববার বিষয়। বিষয়টি জুতা আবিষ্কারের মতই সহজ। এতোদিন মনে ছিলা। এই যা।

সত্যিই তুঘলকি কান্ডই বটে! নইলে একই দেশের standard time কোন এক বিশিষ্ট ব্যক্তির খামখেয়ালীপনার উপর নির্ভর করে কি করে! বর্তমান যুগ একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক। এত অগ্রসরমান কালে কি করে দেশের ঘড়ির কাঁটা এক ঘন্টা এগিয়ে যায়! ঘড়ির কাঁটা চলর নির্ণয় করার করবার মালিক হচ্ছে ভূ-মন্ডলের উপর উত্তর – দক্ষিণে প্রলম্বিত কল্পিত রেখা – যার নাম দ্রাঘিমা। সূর্য্য যখন দেশের মধ্যাংশের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া দ্রাঘিমার ঊপর অবস্থান করে তখনই সেদেশের ‘সময়’ নির্ধারণ হয় এবং তখনই সে দেশে দুপুর বারোটা বাজে। এই ‘বারোটা’ বাজাই সময়ের খুঁটি। দেশটি ছোট হলে এই একই সময় সারা দেশের লোকেরা মেনে চলে। যদিও লক্ষ্য করবেন, দ্রাঘিমার পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের সময়ের কিছুটা তারতম্য দেখা যায়। আর দেশ যদি আমেরিকার মতো বিরাট হয়, তখন দেশে দু’রকম সময় বজায় রাখতে হয়। একটি standard time আরেকটি local time. কারণ দেশের দুই দিকে সূর্যের অবস্থানের কারণে সময়ের অনেক ব্যবধান দেখা যায়।

সুতরাং দেশের সময় নির্ধারণ একটি প্রকৃতিগত ব্যাপার, ভৌগলিক ব্যাপার। রাজা বাদশার ইচ্ছা বা আবদারের উপর ভিত্তি করে স্থির করা যায় না। অন্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আদিকাল থেকে বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ব্যাক্তিগণ সময়কে নির্দ্দিষ্ট করে গিয়েছেন। নিজেদের খামখেয়ালীপনা চরিতার্থ করবার জন্য নয়। এদেশের বাসিন্দাদের জন্য যা প্রাকৃতিক ভাবে ধার্য্য করা হয়েছে তাই ঠিক। এর ব্যতিক্রম ঘটানো কোন বুদ্ধিমান গোষ্ঠীর বা দলের উচিৎ নয়। এতে জাতির মানহানি হয়। দেশের সম্মান ক্ষুণ্ণ হয় । সারা বিশ্বের সময়ের সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে অংক কষে চলতে হয়। অংক কেবল আমাদেরকে কষতে হবে। অন্য কোন দেশকে নয়। তাদের মস্তিষ্কে বিদ্যা বুদ্ধি ও জনগণের সুযোগ সুবিধার বাস্তব ধারণ আছে।

এই ‘সময়’ এগিয়ে নেওয়াতে আরেকটি অপরাধ হয়েছে। পরের দিন এবং তারিখ থেকে আমরা এক ঘন্টা চুরি করছি বা দখল করে নিচ্ছি। যেমন শুক্রবার রাত বারোটায় ধরা যাক ২০ তারিখ শেষ হবে। নতুন (পরিবর্তিত) সময় তখনও ১১ টা। নতুন সময় যখন রাত ১২টা বাজবে, তখন পুরাতন দিনের শনিবারের ১ ঘন্টা সময় দখল  হয়ে যাবে।এভাবে শনিবারও পরের রাতের অন্ধকারে রবিবারের ১ ঘন্টা চুরি করে নেবে। অর্থাৎ শনিবারের শুরুর ১ ঘন্টাকে আমরা শুক্রবার বলবো। তদ্রুপ রবিবারের প্রথম ঘন্টাকে আমরা শনিবার বলবো। এভাবে দিন ও তারিখ দুটোকেই চুরি করা হচ্ছে। এটি খারাপ কাজ নয়কি? আমরা নাগরিকরা নিরুপায় হয়ে সরকারের এরকম একটি অন্যায় আদেশ পালন করছি। প্রকৃতি, সূর্য, সকাল–সন্ধ্যা, নামাজের ওয়াক্ত, ইফতারের সময়,পশু পাখির জীবন যাপন এসব কিন্তু ভূগোলের নিয়ম মেনেই চলছে। প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষের চলা উচিৎ হচ্ছে কি?

***


উৎসর্গ

 আমার পিতাকে যাঁর জীবনের পাথেয় ছিল আপোষহীন নীতি আর শৃঙ্খলা।   আমার মাতাকে ছেলেমেয়েদের মেধা ও মননশীলতায় যিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। আমার স্বামী...