Tuesday, March 31, 2026

স্মৃতিচারণ মূলক-আমাদের আবু ভাই

বগুড়া ক্যান্টনমন্টে তখন নির্মানাধীন।সেজন্য কর্ণেল হারুন এবং অন্যান্য অফিসারগণ ক্যান্টনমেন্টের বাইরে শহরে বাড়ি ভাড়া করে বসবাস করতেন। আমরা যে এলাকায় বাসা নিয়েছিলাম তার নাম ছিল ঠনঠনিয়া। সময়টি  ছিল – ১৯৭৮ সালের জানুয়ারি মাস। বগুড়ায় অবস্থান কালে আমাদের বাড়িতে আরেকটি ঘটনা ঘটে, যা ভুলবার নয়। তা হচ্ছে আমাদের প্রিয় আবু ভাইয়ের (আবু আইয়্যুব) মৃত্যু। তিনি হারুন সাহেবের আপন চাচাতো ভাই এবং আপন জ্যেষ্ঠ ভগ্নীর স্বামী। তিনি এদের সকলের ফ্রেন্ড, গাইড এবং ফিলসফার ছিলেন। তিনি যেন নিজের ভাইয়ের চাইতে অধিক দায়িত্বশীল ছিলেন। সেই ভাই বুকের ব্যথায় একটু অসুস্থ হন খুলনায়। সেখানকার ডাক্তার বললেন বাত জ্বরের ব্যথা, সেরে উঠবেন। কিন্তু আবু ভাই এর ধারণা হারুনরে চিকিৎসায় তিনি সেরে  উঠবেন। তিনি  বগুড়ায়  এলেন। প্রথমেই  গেলেন  সি.এম. এইচ. -এ । হারুন উনার  এক্স-রে দেখেন এবং অন্যান্য পরীক্ষা করেন। তিনি দেখতে পান উনার হার্ট এনলার্জড। বৃহৎ আকার ধারণ করেছে। হার্টের অবস্থা মোটেই ভাল নয়। শরীরের জন্য রীতিমত রক্ত সঞ্চালন করা হৃদপিন্ডের জন্য  কষ্ট সাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। হারুন খুব ব্যাকুল হন। কিন্তু আবু ভাইকে এসব বলেননি। আবু ভাই বাসায় চলে এলেন। বললেন, ‘হারুনের মুখ কালো হয়ে গেল এক্স-রে দেখে। আমাকে কিছু বললো না। তুমি একটু জিজ্ঞেস করে দেখতো, আমার কি হয়েছে। খুলনার ডাক্তার তো বললেন বাতের ব্যথা, সেরে যাবে অষুধ-পত্র খেলে।’ 

আমার মন ভারাক্রান্ত ছিল আগে থেকেই। কারণ আবু ভাই বাসায় পৌঁছাবার আগেই হারুন  ফোনে উনার বিপদ জনক ব্যাধির কথা জানিয়ে দিয়েছেন। বললাম, ঠিক আছে, আমি এখনই উনার সঙ্গে কথা বলে দেখি। পরে উনাকে বললাম, আপনার হার্টে একটু অসুবিধা দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসার প্রয়োজন। হারুন বাসায় এসে বেড রেস্টের পরামর্শ দিলেন, এবং সেই রকম ব্যবস্থা করে দিলেন। বিছানার শিয়েরের দিকটা উঁচু করে দিলেন। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করলেন। পরে বগুড়ার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ফিজিসিয়ান ডাক্তার তৈয়বকে কল দিলেন। তিনি ছিলেন আমাদের বিশেষ বন্ধু। তিনি এসে উনাকে পরীক্ষা করে দেখলেন। চিকিৎসায় একমত পোষণ করলেন। 

সেই সময় বগুড়ায় কোন ই.সি.জি. মেশিন ছিল না। মিলিটারি কিম্বা সরকারী হাসপাতালে, কোথাও ই.সি.জি. মেশিন নেই। রংপুর সি.এম.এইচ. থেকে মেশিন, স্পেশাল পারমিশনে, আনিয়ে উনার ই.সি.জি. করা হল। তাতে দেখা গেল উনার মাইওকার্ডিয়াল ইনফারকশান -হার্টের অবস্থা ভাল নয়। হার্ট  ফেইলিওরের দিকে যাচ্ছে। যে কোনদিন  দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। সপ্তাহ দুয়েক বেশ ভালই চলছিলেন। কারণ অসুখটা বাইরে থেকে বোঝার উপায় ছিলনা। বিছানায় থাকতেন বেশীর ভাগ সময়, উঠে বসতেন, টেবিলে এসে খাবার খেতেন। টেলিভিশনে খবর দেখতেন। আমার সঙ্গে অনেক গল্প করতেন দেশের সমস্যার কথা, জীবনের কথা, উনার পরিবারের কথা। আর হারুনরে প্রশংসা করতেন। খুব বুঝতে পারতাম হারুন তাঁর খুব প্রিয় পাত্র। একদিন দিন তিনি আমাকে ডেকে বললেন, ‘আমাকে তওবা করাবার ব্যবস্থা কর।’ 

হারুন অফিসিয়াল কাজে রংপুর গিয়েছিলেন। ফিরে আসার পর তাকে জানালাম উনার অভিপ্রায়। শুনে হারুনের মন খারাপ হল, মুখভার হল। তা লক্ষ্য করে আবুভাই আমাকে বললেন, ‘হারুনকে মন খারাপ করতে নিষেধ কর। মানুষ মারা যাবার আগেই কেবল তওবা পড়তে হয় এমন কোন কথা নেই। আমার ভাল লাগবে সেজন্য করতে চাই।+

আমি পারুলরে বোন রানু আপাকে একথা জানাই। তিনি খুব তাড়াতাড়ি সব বন্দোবস্ত করে দেন। মৌলবী সাহেব, দু'তিনজন সঙ্গীসহ এসে উনাকে তওবা পড়ান। তিনি নিজেও এসব পাঠ খুব ভাল রকম জানেন। তারপর উনার আরোগ্য লাভের জন্য প্রার্থনা করা হয়। তিনি বললেন, মনের দিক থেকে তিনি খুব আরাম বোধ করছেন, তাতে আমাদের ও মন খুব হালকা হয়। 

হারুন প্রতিদিন উনাকে একবার চেস্ট এগজামিন করেন। কিন্তু অবস্থার উন্নতি লক্ষ্য করা যায় না। মন আরো খারাপ হয়। আবু ভাই খুব ধার্মিক ছিলেন। বসে বসে নামাজ পড়তেন। কারণ উঠাবসা একদম নিষেধ ছিল। আমাদের বাসায় যতদিন ছিলেন ততদিন একদম চিৎ হয়ে কখনও শুতে পারেননি। মাথার দিক উঁচু রেখেই শয়ন করতেন। 

একদিন তিনি বাথরুমে যান সকাল দশটার দিকে। কিন্তু আর উঠতে পারছেন না। বাসায় কেউ নেই নেই, কাজের একটি ছোট ছেলে, আর ভাসুরের ছোট ছেলে ফারুক ছাড়া। দুই ছোট ছেলেকে দিয়ে কোন কাজ হল না। তিনি লম্বা চওড়া বিশাল দেহি মানুষ। বাড়ির সামনে একটি দোকান ছিল। সেই দোকানী  দুলালকে ডেকে আনলাম। দুলাল ও দুই ছোট ছেলে বহু কষ্টে উনাকে বাথরুম থেকে বের করে এনে চেয়ারে বসায়। পরে চেয়ার টেনে এনে বারান্দায় রৌদ্রে বাসানো হয়। 

আমি খুব ঘাবড়ে যাই। শুধালাম, ‘বুবুকে (উনার স্ত্রী) আসতে বলি? ’ 

বললেন,‘না, বাসা খালি, বাবুলও অফিসে যায়। থাক, উনার আসার প্রয়োজন নেই। তুমিই তো আমার দেখাশুনা করছ।’ 

বললাম, ‘বুবু হয়ত আপনার পছন্দের খাবার তৈরী করতে পারতেন। আপনার হয়ত ভাল লাগতো। আপনি একদম খাবার খাচ্ছেন না। আমার খুব চন্তিা হচ্ছে।’ 

বললেন, ‘না, তোমার রান্নাই ভাল। আমার মুখে রুচি নেই। আবার ঠিক হয়ে যাবে শীগিগীরই।’ 

আবু ভাই এরকম অসুস্থ শুনে আমাদের আত্মীয় বন্ধু অনেকেই আমাদের বাসায খুব আসতেন, উনার খবর নিতেন। তখন অনেকেই আমাকে বলতে লাগলেন, উনার স্ত্রী পুত্রকে ডাকেন, উনার অবস্থা ভাল ঠেকছে না। একদিন তিনি খুলনায় ট্রাংকলে কথা বলেন বাবুলের সঙ্গে। সকলের খবরাখবর জানতে চাইলেন। কে একজন মারা গিয়েছেন উনার বগুড়ায় আসার আগের দিন, তাদের সবার কুশল সংবাদ শুধালেন। পরের দিন হতে তিনি একটু বেশী কথা বলতে লাগলেন। আমি হারুনকে বললাম, ‘খুলনায় ফোন বুক কর।’ যান্ত্রিক কারণে সেদিন খুলনার লাইন বিকল ছিল। বগুড়ার আমজাদ ভাইয়ের স্ত্রী টেলিফোনে চাকুরী করতেন। তিনি মেজর হারুনরে  ফোনকল  পড়ে আছে দেখে বাসায় ফোন করেন। ওনাকে  বললাম সব কথা। তিনি রাজশাহী দিয়ে খুলনায় ফোন কানেকশান লাগিয়ে দেন। কথা ভাল মত শোনা যাচ্ছিল না। আমি হারুনকে বললাম, কষ্ট করে লাইন পাওয়া গিয়েছে, অন্য কোন কথা নয়। বাবুলকে বল ওর আম্মাকে নিয়ে আজই রওনা হতে। বাবুল কথা বুঝতে পারে না। তবুও হারুন উচ্চস্বরে একই বার্তা বারবার উচ্চারণ করতে লাগলেন। লাইন সত্যি কেটে গেল। জোরে জোরে কথা বলার দরুণ  আবু ভাই সবই শুনে ফেললেন । তিনি বললেন, ‘কেন তাদেরকে টানাটানি করছ। আমি কয়েক দিনের মধ্যে চলে যাবো। সেখানে আমার অনেক কাজ পড়ে আছে। একটু ভাল হলেই আমি চলে যাবো।’ 

খাদ্যের প্রতি উনার খুব বিতৃষ্ণা। খাবার দেখলেই বিরক্ত বোধ করতেন। বলতেন এত খাবার । একটুখানি দাও। পরেই ভাল লাগছে না বলে, একেবারেই খেতেন না। বলতেন একটু পরে দিও। কমলা লেবু একটুখানি মুখে নিতেন। অন্য কিছুই নয়। পরে আমি অনুভব করেছিলাম এবং অন্যদের কাছ থেকে শুনেছিলাম যে, মৃত্যুর পরওয়ানা যার এসে যায়, তার মুখের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। 

সেদিন সন্ধ্যায় আমি উনার শয্যাপাশে বসা। উনি আধো শোয়া অবস্থায় অনেক গল্প করলেন। নিজের গল্প, পরিবারের গল্প। মাঝরাত থেকে একটু প্রলাপ বকতে শুরু করলেন। তন্দ্রাচ্ছন্নভাব। তারই মাঝে কাকে যেন অংক শেখাচ্ছেন। তিনি ছিলেন সেই যুগের বি.এস.সি পাশ এবং অংকে ওস্তাদ । টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন ডিপার্টমেন্টে  সে আমলে ইঞ্জিনিয়ারের চাকুরী করতেন। যারা মৃত এবং বহুদিন পূর্বে গত হয়েছেন তাদের সকলের নাম ধরে কথা বলতে লাগলেন। আমি তাদেরকে অনেককে চিনি না। তিনি তাদের কথা বলতে থাকলেন অনর্গল। 

হারুন সাহেব, বাড়িওয়ালা ও অন্যান্য পরিচিত সকলকে আবু ভাইয়ের অবস্থার অবনতির কথা জানিয়ে রাখলেন। পরদিন বাসা র্ভতি লোকজন। কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তর দিচ্ছেন। কিন্তু নিজে থেকে কথা বন্ধ রাখতে পাচ্ছেন না। আর্মি ইউনিটের মৌলভী সাহেবরা এসে অনেক দোয়া পড়ালেন। আর্মির চিকিৎসকরা এলেন। দেখলেন, বুঝলেন যে আর তেমন কিছু করবার নেই। 

সন্ধ্যার দিকে বুবু ও বাবুল (উনার স্ত্রী পুত্র) এসে পৌঁছালেন। আবু ভাই তাদেরকে চিনলেন। বললেন, ‘এসেছ, এসেছ তোমরা?’ 

তারপর আবার সেই প্রলাপ, সারারাত এইভাবে কেটে গেল। ভোরেও বাসায় প্রচুর লোকজন। ব্রিগেড কমান্ডার সাদেকুর রহমান চৌধুরী নির্দেশ দিলেন, মেজর হারুনরে  যা কিছু সাহায্যের প্রয়োজন, তা যেন ইউনিট থেকে দেয়া হয়। মেজর হারুন সাহেবের পুরো ইউনিট আমাদের পাশে ছিল। সি. এম. এইচ. এর সি. ও., কর্নেল আব্দুস সালাম, মেজর হারুনকে সর্বপ্রকার সহযোগীতা দান করেছেন। মেডিকেল এসিসট্যান্টরা সাকশান মেশিন দিয়ে একটু পর পর উনার গলা পরিষ্কার করে দিতে থাকলো। 

এদিকে আমি মুখরোচক খাবার কি দেয়া যায় সেজন্য বাজারে লোক পাঠালাম। শিং মাছের পাতলা ঝোল দিয়ে যদি নরম ভাত একটু খাওয়ানো যায়। সকাল নয়টার দিকে কমলা লেবুর কোয়া ছিলে উনার মুখে তুলে দিচ্ছিলাম। পিছনে বেড উঁচু করে উনাকে বসানো হল। একটি কোয়ার ভেতরে বীজ ছিল। আস্তে আস্তে সেটিকে বের করে নিজের হাতে নিয়ে আমাকে দিলেন। 

বললাম, ‘মিষ্টি কমলা আরেকটু খান, আপনার ভাল লাগবে।’ 

বললেন, ‘কি যে বল তুমি!’  

তারপর আর খাবেন না বলে ইশারা করলেন। মনে মনে ভাবলাম, আজ দুপুরের খাবারটা একটু আগেই দেবো। উনার খাদ্য গ্রহণ বিশেষ প্রয়োজন। শরীরের শক্তি ক্রমশই কমে আসছে। খাচ্ছেন না বলেই এই অবস্থা। 

 একটু পরেই উনার গলায় কেমন ঘরঘর আওয়াজ হতে লাগলো। বুবু ব্যাকুল হলেন। বললেন, এ আওয়াজ আমার চেনা। জীবনে অনেকবার এ আওয়াজ আমি শুনেছি। এ আওয়াজ বাঁচার আওয়াজ নয় বলে কান্না শুরু করলেন। সেই সময় আমাদের বাসা লোকে লোকারণ্য। হারুনরে চাচাতো ভগ্নিপতি সালাহউদ্দিন ভাইও ঘরে বসে আছেন। আরো কতজন! মৌলভী সাহেব কোরান তেলাওয়াত করতে লাগলেন। মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট গলা পরিষ্কার করে দিচেছ। বুবু, বাবুল, হারুন উনাকে জাপটে ধরে  রেখেছেন। আমি ও অন্যান্যরা উনার হাতে, পায়ে ধরে রাখলাম। প্রায় আধ ঘন্টা ধরে এরকম চলতে থাকলো। হঠাৎ  উনার গলার আওয়াজ থেমে গেল। একবার চারিদিকে তাকিয়ে তাঁর চোখের পাতা মুদ্রিত হল। তিনি শান্ত হলেন। নীরব হলেন। চলে গেলেন মহা প্রস্থানের পথে চিরতরে। আমাদের সকলের হাতের বন্ধন আগ্রাহ্য করে কখন চলে গেলেন বুঝতে পারলাম না। 

সারা শরীর গরম, হাত, পা ঠান্ডা নয়, স্বাভাবিক। মনে হয় ক্লান্ত  হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। কিন্তু না, তিনি আর ইহজগতে নেই। মাত্র একটি নিশ্বাসের এপার ওপার। এই মাত্র ছিলেন, এখনই নেই। নাই, নাই, কোথাও নাই। মাত্র ৫৭ বৎসরের দেহ ত্যাগ করে তিনি চলে গেলেন। ঘর ভরা লোক। কেউ তাকে রাখতে পারলো না। সকল মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে তিনি উর্দ্ধলোকে আরোহন করলেন। কত কাজ করা বাকী ছিল। সব ফেলে রেখে  চলে গেলেন। 

‘প্রিয়া তারে রাখিল না,রাজ্য তারে ছেড়ে দিল পথ,
রুধলি না সমুদ্র পর্বত।
আজি তার রথ
চলিয়াছে রাত্রির আহ্ববানে
নক্ষত্রের গানে
প্রভাতের সিংহ-দ্বার পানে।
জীবনেরে কে রাখিতে পারে!
আকাশের প্রতি তারা ডাকিছে তাহারে।
তার নিমন্ত্রণ লোকে লোকে
নব নব পূর্বাচলে আলোকে আলোকে।’

আমরা গভীর দুঃখে মগ্ন হলাম। উপস্থিত আমাদের বন্ধু ও অন্য ভদ্র মহিলাগণ আমাদের সান্ত্বনা  দিতে লাগলেন। জীবনের  বাস্তবতা কথা বললেন কেউ কেউ। সকলকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে, জন্মিলে মরিতে হবে........। কত কথা বলে তারা আমাদের সীমাহীন শোকে অংশ গ্রহণ করেন। 

বাজার করতে দিয়েছিলাম অনেক কিছু। রান্না আর করা হলনা। তিনি আর কোনদিন বলবেন না, ‘একটু খাবার দাও, ক্ষুধা পেয়েছে।’

সকলে মিলে আবু ভাইয়ের শেষ কৃত্যের প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেন। দেখে মনে হচ্ছে তিনি ঘুমাচ্ছেন শান্তিতে । প্রাণহীন দেহ পড়ে আছে মনেই হচ্ছে না। ডাকলেই যেন উঠে বসবেন। নামাজ পড়বার জন্য তৈরী হবেন, কথা বলবেন। কিন্তু তা আর কোনদিন হবে না। উনার নুরানী চেহারা বড় পবিত্র দেখাচ্ছিল। বিকেলের দিকে নামাজে জানাজা শেষে বগুড়ার ভাই পাগলার মাজার সংলগ্ন সরকারী কবরস্থানে উনাকে সমাহিত করা  হলো। হারুন সাহেবের পুরো মেডিকেল ইউনিট ও অন্যান্য বন্ধু বান্ধব, পরিচিত ও সকলেও উনার জানাজায় শরীক হলেন।

আমাদের এই দুঃসময়ে পারুলের বোন রানু আপা, আমাদের বন্ধু কাইয়ূম সাহেব, আমাদের দেশের ছেলে মহিউদ্দিন, বাড়িওয়ালার ছেলে আক্কাস ও অনান্য স্থানীয়রা ভীষণভাবে সাহায্য করেছিলেন। আল্লাহর রহমতে দাফন কার্য এমন সহজতর হয়েছিল, যা কল্পনা করা যায় না। নিজের গ্রাম নয়, নিজের শহর নয়, আত্মীয়স্বজন নেই সেখানে,তবুও সকলে এমন সাহায্যের হাত বাড়ালেন যেন আপনার চেয়ে আপন তারা। মানুষের বিপদে যারা পাশে দাঁড়ায়, তারাই প্রকৃত আপন জন। আমরা চিরকাল তাদের সহানুভূতি ও সদাচরণের কথা কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ রাখবো। 

আবু ভাইয়ের মৃত্যু বগুড়াকে আমাদের নিকট চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। উনার অর্ন্তধান  আমাদের পরিবারে এক বিরাট ক্ষতি। উনার মৃত্যুতে পরিবারের সকলের মনোবল ভেঙ্গে যায়। আজও আমরা উনার জন্য খুবই কষ্ট পাই। উনার  অভাব অনুভব করি। তাঁর কবর আজও সেই গোরস্থানে বাঁধানো রয়েছে। চির নিদ্রায় শায়িত আছে তাঁর মরদেহ। মহাকালের যাত্রীদের কাফেলায় তিনি শরীক হয়েছেন। 

.........




Tuesday, March 24, 2026

স্মৃতিচারণমূলক - নিভে গেল আলোর শিখা


তিনি ছিলেন আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। সেই শিশুকাল হতে যার কোলে পিঠে আমি মানুষ হয়েছি। অক্ষর চিনেছি, কলম ধরতে শিখেছি। সেই অন্ধকার যুগে যিনি আমাকে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পথ চিনিয়েছেন। পাঠ্য পুস্তকের বাইরে প্রতিটি ক্ষেত্রে যিনি আমাকে জ্ঞান দান করেছেন, অজানাকে জানবার দরজা খুলে দিয়েছেন। নিজে চাকুরী গ্রহন করবার পর থেকে আমার লেখাপড়ার খরচ বহন করেছেন – তিনি আমার এই ভাই – লে. কর্নেল ডাঃ হাফিজ আহমেদ –আমার দাদু। মেধা ও মননে তুলনাহীন একজন ব্যাক্তি। তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, ক্ষুরধার প্রতিভা, অপরিসীম জ্ঞান মানুষকে অভিভূত করেছে। তাঁর সংস্পর্শে যারা এসেছেন তারা তাঁর কাছে ঋণী। ক্ষণিকের উপস্থিতিতেও তারা জ্ঞান বা সদুপদেশ লাভ করেছেন। তাঁর ক্ষমাশীল অন্তর নিরন্তর মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত ছিল।

তিনি পেশায় ছিলেন চিকিৎসক। আর্মি মেডিকেল কোরের একজন দক্ষ অফিসার। প্রথমে  আজাদ কাশ্মীরে, পরে পাকিস্তানে, পরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে তিনি লে. কর্নেল হিসেবে চাকুরী থেকে অবসর গ্রহন করেন। মানুষের সেবা করাই ছিল তার ব্রত। অসুস্থ  ব্যাক্তির চিকিৎসার বন্দোবস্ত করা, কারো অর্থকষ্ট দূর করা, ক্ষুধার্ত লোকের অন্ন সংস্থান করা, চাকুরী দেওয়া –এইসব ছিল তার নিত্যদিনের কাজ। তার উপকার পায়নি এরকম কেউ নেই। 

শিশুদের ভালবাসতেন তিনি। খেলাচ্ছ্বলে তাদেরকে জ্ঞান দান করতেন। মজার মজার কথা বলে তাদের বুদ্ধির সলতে উসকে দিতেন। তাদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন প্রাইমারি স্কুল নিজের বাড়ির আঙ্গিনায়। শিশুরা তাকে খুব পছন্দ করত। সবসময় তার পিছনে ঘুরতো। আমরা বলতাম, ‘দাদু, তুমি হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। তোমার কাছে জাদু আছে।’

আজাদ কাশ্মীর ও ভারত সীমান্তে একবার প্রচন্ড যুদ্ধ হয়। চারিদিকে বোমা বৃষ্টি। যত্রতত্র মানুষের লাশ পড়ে আছে। এক যুদ্ধাহত সহকর্মীর আর্তনাদ তার অন্তরকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। তিনি নিজের বিপদ তুচ্ছ করে তাকে কাঁধে তুলে বিপদ মুক্ত এলাকায় নিয়ে আসেন।

 


সাহিত্য এবং কাব্যচর্চা ছিল তার সহজাত বৃত্তি। ‘বনফুলের’ মত ডাক্তার হয়ে তিনিও একজন সাহিত্য প্রেমিক ছিলেন । যে কোন বিষয়ে তার কলম থেকে বের হয়ে আসতো সুন্দর এবং সুখ পাঠ্য একটি রচনা। যাযাবরের দৃষ্টিপাত ছিল তার মুখস্থ। রবীন্দ্রনাথ ছিল তার আত্মস্থ। বাংলা বানানের উপর তিনি গবেষণা করেছেন। শুদ্ধ বানান এবং শুদ্ধ উচ্চারণের রীতির তিনি এদেশে একজন পথিকৃত। সহজ পদ্ধতিতে বাংলা বানান কিভাবে লেখা যায়, তার উপায় তিনি বহু রচনায় প্রকাশ করেছেন। শিক্ষিত সমাজকে সচেতন করবার জন্য বানান রীতির উপর প্রচুর সহজ নিয়ম বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় দীর্ঘদিন চিঠিপত্র কলামে এইচ. আহমেদ নামে প্রচার করে গিয়েছেন। রম্য রচনায় তিনি ছিলেন সিদ্ধ হস্ত। প্রচার বিমুখ ছিলেন বলে তার লেখাসমূহ বই আকারে প্রকাশ করেন নি।          

বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে আমার পিতা একটি আলোর শিখা স্বরূপ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বহু সংগ্রাম করে তিনি এলাকায় আলোর সন্ধান দিলেন। তাঁরই ফেলে যাওয়া শিখাটি লে. কর্নেল. হাফিজ আহমেদ মশাল হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি আমার পিতার প্রতিষ্ঠিত স্কুলটিকে বহু সংগ্রাম করে সরকারীকরণ করেন। সেটিকে নিজের উঠানে সরকারি সহায়তায় দালান নির্মাণের ব্যবস্থা করেন। বর্তমানে সেখানে দুটি দালানে ছেলেমেয়েদের ক্লাস চলে। স্কুলটি তিনি তার মায়ের নাম অনুসারে নামকরণ করেছেন। স্কুলটির নাম ‘জুবাইদা ফিরোজা সরকারী প্রাইমারি স্কুল –হরিরামপুর।’

ছাত্র ছাত্রীরা এই স্কুল থেকে প্রাইমারি পাশ করে অন্যান্য হাইস্কুলে যাচ্ছে। কেউ কেউ উচ্চশিক্ষার পথে আগ্রসর হচ্ছে। গ্রামের অনেক ছেলেমেয়ে এখন অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন। শহরে বন্দরে আজ তাদের পদচারণা। সভ্যতা এবং প্রযুক্তির সঙ্গে তাদের পরিচয় ঘটছে। ডা. হাফিজ আহমেদ গ্রামে পাকা রাস্তা ঘাট নির্মাণ করে দিয়েছেন। তারও বহু বছর পূর্বে আমার পিতা আব্দুস সোবহান বিশ্বাস সেই ব্রিটিশ আমলে বর্তমান রাস্তার নকশা তৈরী করে কাঁচা রাস্তা বানিয়ে গিয়েছিলেন। আমার দাদু আমাদের অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবররাহের ব্যবস্থা করেছেন। এখন ঘরে ঘরে বৈদ্যুতিক আলো জ্বলে। কেরোসিনের কুপি আর নাই। গ্রামে যান্ত্রিক যানবাহন অনবরত চলছে। মানুষ সর্ব পর্যায়ে একটু উন্নত জীবনের সন্ধান পেয়েছে। 

আমার ভ্রাতা একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ। রাস্তা, ঘাট, স্কুল, মাদ্রাসা এবং অনেক সমাজ হিতৈষী কাজ তিনি করেছেন। তার মত নম্র ভদ্র বিনয়ী সুশিক্ষিত মানুষ একটি দৃষ্টান্ত স্বরূপ। তার মত আদর্শ মানুষ বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে জন্মগ্রহণ করুক এই আমার প্রার্থনা। 

তিনি তার পিতা মাতার খুব খেয়াল রাখতেন। তাঁদের যত্ন, তাঁদের চিকিৎসার কোন ত্রুটি করেননি। তার ন্যায় এরকম সুপুত্র ভাগ্যবান পিতার ঘরেই জন্মায়। তার মানবতা বোধ ছিল সীমাহীন। যেখানেই মানুষের দুঃখ কষ্ট সমস্যা সেখানেই তিনি। তিনি সকলের আপনজন। সেই মানুষটি নিরলস পরিশ্রম করে গিয়েছেন সারাটি জীবন। নিজের জন্য কোন সময় রাখেন নি।তার ফুসফুস যে তিলে তিলে আক্রান্ত হয়েছে,সে খবরও তিনি পাননি। শারীরিক সমস্যাগুলোকে উপেক্ষা করে দিব্যি পরের কাজ করে, চলে ফিরে বেড়াতেন।ফুসফুসের ক্যান্সার তার সম্পূর্ণ সুস্থ শরীরে চুপিসারে বাসা বাঁধলো। যখন রোগ ধরা পড়লো তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে।চার মাস মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ঢাকা সি. এম. এইচ. -এ ৯ই জুন, ২০১২ শনিবার ঠিক দুপুর বারোটায় অচীনপুরে চলে গেলেন। এই কয়েকটি মাস ক্রমাগত চিকিৎসার সময় তার শরীরে অন্য  কোন অসুখ ছিল না, যন্ত্রণা ছিল না। জ্ঞান বুদ্ধি ছিল আগের মত প্রখর ও অটুট। নিজে ডাক্তার ছিলেন। নিশ্চিত মৃত্যুর পরোয়ানা হাতে পেয়েও নির্ভিক চিত্তে মৃত্যুকে বরণ করে নিলেন।

তিনি আমাদের খুব প্রিয় ছিলেন। মারা যাবেন সে কথা কখনও বলতেন না। পাছে আমাদের হৃদয় যমুনা উথলে উঠে। একদিন বললেন, ‘মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে।’ চুপ করে রইলাম আমি। মনে হলো তাঁর খুব কষ্ট হচ্ছে। বললেন, ‘আমার মা নেই। যদি থাকতেন তবে তোমরা তার কাছে জানতে চাইতে আমার কথা।’ 

তারপর বললেন, 

‘বাঁশ বাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ঐ / মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই?/ 

ওঘর থেকে কেন মা আর দিদি আসে না কো / দিদির কথায় আঁচল দিয়ে মুখটি কেন ঢাকো?’

এইটুকু বলে চুপ করে চোখ বন্ধ করে রইলেন –যেন ক্লান্তি বোধ করছেন। আমারও গলা ধরে আসছিল, আমিও চুপ করে থাকলাম। বললাম, ‘আর কথা বলো না।’  তিনি বললেন, ‘আর কবে কথা বলবো।’ 

.........

Thursday, March 19, 2026

স্মৃতিচারণমূলকঃ একাকী একজন – আমার মা

 

মানুষ ভাগ্য নিয়ে জন্মায়। জীবনের বাঁকে বাঁকে ঘটনার বিবর্তন ঘটে বটে, তবে ভাগ্য তার সঙ্গ ত্যাগ করে না। তিন ভাই বোনের মধ্যে জুবাইদা খাতুন সর্বকনিষ্ঠ। বড় দুজন ভাই। মাত্র দু’বছর বয়সে জুবাইদা খাতুন মাতৃহারা হন। এখান থেকেই তার জীবনের একাকীত্বের শুরু। মায়ের স্নেহ কি তার জানা নেই। 

পিতা মোহাম্মদ হানিফ, সুফি দরবেশ। দেশ-দেশান্তর ঘুরে বেড়ান। শেষে আশ্রয় নেন মক্কা মদিনায়। মক্কায় ঘর সংসার পাতেন। দীর্ঘ এগার বছর আর দেশে ফেরেননি। সঙ্গে ছিল তার জ্যেষ্ঠ পুত্র বালক মোহাম্মদ  সিদ্দিক। সেখানেই লেখাপড়া করতেন। পিতা বিদ্বান ছিলেন। নানা ভাষায় পারদর্শী। কঠোর ধার্মিক। কিন্তু কোমল, উদার মনোবৃত্তির অধিকারী ছিলেন। মানবতার দিকে দৃষ্টি ছিল। স্বল্প ভাষী। ভক্ত সংখা ছিল প্রচুর। তবে তিনি পীর  ছিলেন না। ছিলেন না সংসারীও। বাড়ির অবস্থা ভাল। বিষয় সম্পত্তি যথেষ্ট। জমি বন্ধক দিয়ে টাকা পয়সা নিয়ে  বেরিয়ে পড়তেন।

বিরাট বাড়ি।  সূর্য দীঘল নয়। উত্তর দক্ষিণে প্রসারিত। বহু শরীকের বসবাস – একই বংশোদ্ভূত। জুবাইদা খাতুন বাড়িতে বিরাট আট চালা ঘরের একা বাসিন্দা। বাড়িতে লোকের অভাব নেই। কেউ না কেউ তার সঙ্গে  থাকতেন। তার উত্তরের ঘরের জেঠি, দক্ষিণের ঘরের জেঠি, পশ্চিমের ঘরের জেঠিরা খুবই স্নেহ করতেন। মাতৃহারা মেয়েটিকে স্নেহের ছায়া দিয়ে রাখতেন। খাবার দিতেন, নিরাপত্তার খেয়াল রাখতেন। বয়স তখন তাঁর পাঁচ বছর । ১৯১০ সালে তার জন্ম।

তখন ব্রিটিশ আমল। বাড়িতে লেখাপড়ার চর্চা ছিল। তবে মেয়েদের জন্য নয়। জুবাইদা খাতুন ঘুরে ঘুরে সব ঘরেই  লেখাপড়ার আশে পাশেই থাকতেন। তাদের বাদ দেয়া বই নাড়া চাড়া করতেন। তাতে তার পড়াশুনা আয়ত্তে এসে যায়। পরীক্ষা পাশ করা ছাড়াই সরস্বতি তাকে অনেক কৃপা করেন। ধাপে ধাপে সব ক্লাসের বই পড়া  শেষ  হয়। এমনকি ইংলিশ কবিতাও তার শুনে শুনে মুখস্থ ছিল। আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণ তার অনেকখানি মুখস্থ ছিল। 

সেই সময় আমার বড় মামা মোহাম্মদ সিদ্দিক বাড়িতে এসে আমার মা জুবাইদা খাতুনকে মাদ্রাসায় ভর্তি করে দিলেন। মাদ্রাসাটি অনেক প্রাচীন কালের। বড় মামা ঘোড়ায় চড়ে তার ছোট বোনটিকে মাদ্রাসায় দিয়ে যেতেন,  আবার এসে নিয়ে যেতেন। তখন বাড়ি বাইরে গিয়ে বিদ্যার্জন মেয়েদের জন্য ছিল এক আশ্চর্য ঘটনা। এই ছিল  তার  প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনা। কোরান পাঠ, গুঁলিস্তা, বুস্তা, পুস্তা এসব বই পড়াশুনা কিছুদিন করেছিলেন। ঘোড়ায়  চড়ে  মাদ্রাসায় পড়তে আসা তখনকার দিনে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, বিশেষ করে অবরোধ বাসিনীদের  কাছে। মামা লাখনৌ চলে যাওয়ার পর পড়াশুনাও বন্ধ।  

তার কিছুদিন পর দূরদেশী দরবেশ পিতা বাড়িতে এলেন। তিনি ছিলেন উঁচা লম্বা গৌরবর্ণ এক সুন্দর   সুঠাম দেহের অধিকারী। গ্রামের লোকেরা মজাক করে বলতেন “কাবুলিওয়ালা”। এক পুণ্যময় নুরানী আলো যেন  তাকে ঘিরে রাখতো। দেশে ফিরে এসে তিনি জেষ্ঠ্য পুত্র মোহাম্মদ সিদ্দিকের বিবাহ দিলেন, আরেক পরিবারের সম্ভ্রান্ত  সুশ্রী দির্ঘাঙ্গী তরুণীর সঙ্গে। তাদের ছিল সৌন্দর্যের খ্যাতি। বিশেষ করে গাত্রবর্ণ ছিল তাদের বিশেষ   অহংকারের কারণ। চাকুরী নিয়ে মোহাম্মদ সিদ্দিক লক্ষ্ণৌতে পাড়ি জমালেন। সঙ্গে নিলেন ছোট ভাই মোহাম্মদ জাকারিয়াকে। সেখানকার মাদ্রাসায় তাকে ভর্তি করে দিলেন। তারও কিছুকাল পর ছোট বোন জুবাইদা খাতুনকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন। 

এটা আমার মায়ের জীবনের আরেকটা বাঁক। এখানেও তিনি একা। ভাবী তার মাতৃহারা হৃদয়ে কোন স্নেহ  মমতার বারি সিঞ্চন করতে পারেননি। এখানে জুবাইদা খাতুনের কাজ ছিল বাচ্চার পরিচর্যা করা, ঘর গেরস্থালীর   কাজ করা। আরবী উর্দু পড়া এবং কথা বলা।

এই লখনৌ শহর ছিল ভারতের উত্তর প্রদেশের রাজধানী। অত্যন্ত অভিজাত শহর। তবে আজকের মত সুযোগ সুবিধা ছিলনা। যানবাহনের মধ্যে ছিল “ডুলি” পালকির সাধারণ সংস্করণ। সম্ভবত কাঠের তৈরি একটি  বাক্সের মত। চারদিক কপড় দিয়ে ঘেরা। দুই বেহারা কাঁধে করে নিয়ে যেত গন্তব্যে। আমাদের রিক্সার মত তারা সর্বত্র ঘুরে বেড়াতো। যার যখন দরকার ডেকে নিত – “এ ডোলি ওয়ালা ইধার আও”। ডুলিতে চড়ে চলে যেতেন বেড়াতে, হাসপাতালে অর্থাৎ যেখানে ইচ্ছা সেখানে। জুবাইদা খাতুনের কাজ ছিল নিয়মিত তার ভাবী সাহেবার জন্য ডুলি ডেকে আনা।

সেই সময় সেই শহরে হাজী আমীর আলী নামে একজন বিখ্যাত পীর সাহেব বাস করতেন। তিনি অত্যান্ত  নেক এবং পরহেজগার ব্যক্তি ছিলেন। আমার বড় মামা হাফেজ ক্বারী মৌলানা মুহাম্মদ সিদ্দিক সাহেব তাঁর একজন  বিশেষ ভক্ত এবং বন্ধু ছিলেন। কথিত আছে পীর সাহেব বিছানার গদি উঠালেই অনেক টাকা বের হতো। তিনি  দয়ালু ছিলেন। নির্ধনকে দান করতেন। তার বাড়িতে অন্দরে কোন রান্নাবান্না হতনা। পাক হত দহলিজে। সেখানে বহুত উমদাহ্‌ খানা তৈয়ার হত। বাড়ির ভেতরের জেনানাগণ এবং অন্য সকলে সেই খানা গ্রহন করতেন। আমার মাতা জুবাইদা খাতুন সেই সময় বালিকা ছিলেন। বড় মামি প্রায়ই সেই বাড়িতে তশরিফ নিতেন। ডুলিতে চড়েই  যাতায়াত। সঙ্গে যেতেন জুবাইদা খাতুন বাচ্চা মেয়ে নূরীকে দেখভাল করবার জন্য।

বড় মামার পাশের বাসার একটি মেয়ের সঙ্গে জুবাইদা খাতুনের পরিচয় হয়। নাম তার রাসুলান। সম বয়সী হলেও একটু বড়। এই ছোট মেয়েটিকে এত কাজকর্ম করতে দেখে তার মায়া হয়। সে বলতো এত কাজ কর কেন?  তোমার ভাবিতো সারাদিন ঘুরে বেড়ান। তুমি ছোট, এত কাজ কর, বাচ্চা সামলাও। তিনি যেমন তোমার ভাই সাহেবের বিবি, তুমিও তো তার বোন। কম কিসে? দেখ আমার কোন কাজ নেই। আমার মা-ই সব করেন। জুবাইদা খাতুনের চোখ ছল ছল করে ওঠে। বুকের ভিতরটা হাহাকার করে। মুখে বলতেন আমার অভ্যাস  হয়ে গেছে। তাছাড়া এ বাচ্চা মেয়েটিও আমার খুব প্রিয়। সে আমাকেই বেশি পছন্দ করে। আর ঘরের কাজ কর্ম তো করতেই হবে।

জুবাইদা খাতুন ঘর সংসার গুছিয়ে রাখতেন। নিজের পড়াশুনা করতেন। তাদের বাড়ির নীচের তলায় ছিল বাজার, দোকানপাট। উপর থেকেই বাজার করতেন। এক আনায় অনেক কিছুই ক্রয় করা যেত। তাছাড়া আসতো ফেরিওয়ালা। তাজা হারে আমরুদ, (পেয়ারা) তাজা হারে আমরুদ বলে হাঁক দিত। এক পয়সায় অনেক পেয়ারা  দিয়ে যেত। হারা মিরিচ (কাচা মরিচ), শাক সবজি, আঙ্গু্‌র, সেভ (আপেল), কিসমিস, মনাক্কা, নানা প্রকার মসলা  দিয়ে যেত। চার আনার বাজারে বাড়ি ভরে যেত এমনকি মিঠাই মন্ডা সহ।  

আমার ছোট মামু মাদ্রাসা থেকে ফিরে এলে তার ছোট বোন জুবাইদা খাতুন নিচে গিয়ে দরজা খুলে দিয়ে আসতেন। একটি ঠিকা মেয়ে বাসার কাজ করে দিয়ে যেত। কোনদিন আসতে দেরি হলে এই জুবাইদা ছাদের উপরে গিয়ে তাকে চিৎকার করে ডেকে আনতেন। তার নাম ছিল মান্নু কি আম্মি। তিনি ডাকতেন, এ মান্নুকি আম্মি, জলদি আও। দের হো রাহা হ্যায়। সম্ভবতঃ তাদের বাসস্থান ইনাদের বাসস্থানের নিকটবর্তী ছিল। সেই মেয়েটি এসে ভারি ভারি কাজ করে দিয়ে যেত।

এক রাতে মহল্লায় চোর হানা দেয়। গভীর রাতে চোর আসে রাস্তার ওপারের বাসায়। তখন রাস্তার মোড়ে মোড়ে বাতিওয়ালা সন্ধ্যায় বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে যেত। সকালে এসে বন্ধ করে দিত। সে আলো কতই বা উজ্জ্বল ছিল। তবুও তো আলো। আজকের দিনের সাথে তার কোন তুলনা চলেনা। সেই বাড়ির গৃহকর্তা বাড়িতে ছিলেন কিনা জানিনা। তবে গৃহকর্ত্রী উচ্চস্বরে চিৎকার করে বললেন, মহল্লা ওয়ালা জাগো, হামারা ঘর মে চোর আয়া।   কেউ এলোনা। শেষে ডাকলেন, ক্বারী সাহাব জাগো, ক্বারী সাহাব জাগো। হাম মুশকিল মে হ্যায়। তখন আমার   বড় মামা সাড়া দিলেন। তিনি দু’নলা বন্দুকটি বারান্দা থেকে তাক করে চোরকে গর্জন কোরে ধমক দিলেন। চোর  ততক্ষন পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলো। কোনো সাহায্যকারী না এলে সে ঘরের জিনিসপত্র নিয়ে যাবে। বড় মামুর ধমক খেয়ে এবং বন্দুক দেখে লোকটি লাফ দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়। মামা সেই মহিলাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,  দরজা বন্ধ রাখেন। আবার যদি আসে তবে আমাকে ডাকবেন। এইভাবে তিনি তস্করের হাত থেকে সেই ভদ্রমহিলাকে রক্ষা করেন।

সেই সময় লখনৌকে আমার আম্মারা হিন্দুস্থান বলতেন। তখন বাংলাদেশও ভারতের অন্তর্গত ছিল। লখনৌ ছিল অনেক দূরের রাস্তা। আম্মার ভষায় তিন দিন তিন রাত থাকতে হতো ট্রেনে। আমার বড় মামা মোঃ  সিদ্দিক একটি কামরা রিজার্ভ করে নিতেন। উনার নিজের পরিবার, ছোট মামা জাকারিয়া, আম্মা জুবাইদা খাতুন। আমাদের এলাকার আরো কয়েকজনকে লখনৌ মাদ্রাসাতে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে যাতায়াত করতেন। ট্রেনের কামরার চাবি বড় মামুর হাতেই থাকতো। ট্রেনে যেতে যেতে অনেক দৃশ্য অবলোকন করতেন। পাকশী ব্রিজ বিরাট রেল সেতু অতিক্রম করা, গুম গুম শব্দ অনুভব করা বড় রোমাঞ্চকর মনে হত। কোথাও ট্রেনটি একটি বিশাল মাছের পাজরের দুই পাশের কাঁটার ভিতর দিয়ে চলে যেত। এত বিরাট মাছের কাঁটা, না জানি কত  বিরাট মাছ ছিল সেটি। এটিও পুলক অনুভব করবার মত ঘটনা। এখন আর সে সবের চিহ্নও নেই। কেউ জানেও  না। ট্রেনে যেতে যেতে নানান প্রাকৃতিক দৃশ্য, নানান জনপদ , নানা প্রকার বেশ ভূষা, জীবন যাত্রার ধরণ, ভাষা  চেহারা দেখতে দেখতে অবশেষে সবুজ শ্যামল বাংলা এলাকা ছেড়ে রুক্ষ ধূসর দেশে উত্তর প্রদেশে গিয়ে  পৌঁছাতেন। গার্ড এসে চাবি নিয়ে যেতেন। মামারা অবতরণ করে গন্তব্যে পৌঁছে যেতেন। জুবাইদা খতুন ঘর সংসারের কাজ করতেন, পড়াশুনা করতেন এবং মামার মেয়েদের ছবক দিতেন। বড়মামার পড়াশুনার প্রতি খুব আগ্রহ ছিল। তিনি পড়াশুনার জন্য জুবাইদা খাতুন এবং তার মেয়েদের খুব উৎসাহ দিতেন। আমার আম্মা জুবাইদা খাতুন বিদুষী মহিলা ছিলেন। মজার বিষয় ছিল তিনি লিখতে জানতেন না। প্রচুর পড়াশুনা করতেন বাংলায় যেমন, উর্দুতে তেমন। আর হাদিস কোরান তো কথাই ছিলনা। আমরা ছোট বেলায় দেখেছি অবসর সময়ে মানচিত্র ছিল তার সঙ্গী। পৃথিবীর সব সাগর, মহাসাগর, মহাদেশ, দেশ, রেলপথ, নৌপথ, আকাশপথ, কোথা হতে কোন গন্তব্যে পৌঁছায় সব ছিল তার নখদর্পণে। কোন কিছু জানতে চাইলে পরম যত্নের সঙ্গে আমাদের তা বুঝিয়ে দিতেন। শিল্প  সাহিত্য সম্বন্ধে তার জ্ঞান ছিল প্রচুর। নবী কাহিনী, আসমানী  কিতাব, তাদের শানে নজুল তাঁর মুখস্থ ছিল। যত পুঁথি ছিল তাঁর কন্ঠস্থ এবং সুরেলা কন্ঠে তা পাঠ করতে পারতেন। ইংরেজী পড়তে পারতেন না তবে অনেক গল্প জানতেন শেক্সপীয়রের। প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যা না থাকলেও তিনি একজন স্বশিক্ষিত এবং সুশিক্ষিত মহিলা ছিলেন। আমাদের গ্রামে আজ পর্যন্ত তার সমকক্ষ আর কেউ নেই। যদিও মেয়েরা বি.এ. পাশ করছে। তবুও তাঁর তুলনা  তিনি নিজেই। 

লখনৌতে থাকতে থাকতে তার বয়স বেড়ে যায় ১৩/১৪ তে। তখনকার বিধান অনুযায়ী বিবাহের বয়স। সুতরাং কোন ছুটীতে মামারা বাড়ি এসে তার বিবাহের ব্যবস্থা করে ফেলেন। আমাদের গ্রামের এক গ্রাম পরেই দক্ষিণে নিঘুরকান্দা গ্রাম। দুই ক্রোশ হয়তবা হবে। আমাদের গ্রামের নাম হরিরামপুর। আমার পিতা আব্দুস সোবহান বিশ্বাস ১৯১৯ সালে এনট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি ছাত্র ছিলেন তুখোড়। তিনি গল্প করতেন, প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের পর যখন  ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তখন ম্যাট্রিক পাশ করেছিলেন। তাদের সময় মিডিয়াম অব ইন্সট্রাকশন ছিল ইংলিশ। পরীক্ষায় ভালভাবে পাশ করার দরুণ দূর দূরান্ত হতে লোকেরা তাকে দেখতে আসেন। তিনি ছিলেন এক অদম্য এবং নির্ভিক পুরুষ। তাঁর শিশু কালেই পিতৃবিয়োগ হয়। তাঁর মায়ের সহায়তায়, নিজের অসম সাহসে এগিয়ে যান। আর্থিক অনটনে কলেজের লেখাপড়া ত্যাগ করতে বাধ্য হন। কারো পরামর্শ ছাড়াই, নিজের সাহসে ভর করে গিয়েছিলেন মুক্তাগাছা এলাকার প্রবল পরাক্রমশালী জমিদার রাজা জগৎ কিশোরের নিকট। তিনি তরুণের বক্তব্য  শুনে মন্তব্য করলেন, Look, higher education is not for the poor. জমিজমা যা আছে দেখেশুনে চালাও, তাতেই চলে যাবে।  বিফল মনোরথ হয়ে পিতা আমার ফিরে এলেন। ঘুষের চাকুরী করবেন না বলে দারোগার চাকুরী  প্রত্যাখ্যান করলেন। সাব রেজিস্ট্রারের চাকুরিও নিলেন না। শেষে নান্দিনা স্কুলের টিচার হিসেবে যোগ দেন। তার বিষয় ছিল অংক আর ইংলিশ। এই স্কুল প্রতিষ্ঠায় নলিনী মোহন দাস (মাখন বাবু), রিয়াজ মাস্টার, জয়েন মৌলবি সাহেবদের সঙ্গে তারও অবদান ছিল। এই স্কুল অল্প সময়ের মধ্যেই একটি বিখ্যাত স্কুল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এর সব কৃতিত্ব শিক্ষকদের। এই নান্দিনা স্কুলেই আমাদের সব ভাইয়েরা লেখাপড়া করেন। তখনকার দিনে ১৯৪৩ সালে আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা নাজির আহমেদ undivided বেঙ্গলের শিক্ষা বোর্ডে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পঞ্চম স্থান অধিকার করেন। পরবর্তীতে কলকাতায় প্রেসিডেন্সি কলেজে, পরে কলকাতা ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারী পাশ করেন। পরে ইংল্যান্ড থেকে এফ এফ এ তার সি এস পাশ করেন, কম সময়ে কৃতিত্বের সঙ্গে। 

বিবাহের সময় আমার আম্মা কিশোরী মাত্র। মা নেই। বাবা বিদেশে বসবাস করেন। একা একা আমাদের বাড়িতে একটি সংসারের দায়িত্ব গ্রহন করেন। শাশুড়ি রায় বাঘিনী। তবে ননদিনী অন্যান্যরা বড়ই স্নেহের চক্ষে দেখতেন। আমার মা বড়ই ধৈর্য্যশীলা সহিষ্ণু রমণী ছিলেন। তিনি বাড়িতেই থাকতেন বিরাট আটচালা ঘরে একাই  থাকতেন। আমার এখন মনে আছে ঘরের উপরের কাঠের পাড়ে বড় করে খোদাই করে লেখা ছিল ১৩৩০ সাল। আম্মা ভয়ে ভয়ে একাই থাকতেন। তার কষ্টের কথা বলার জায়গা ছিলোনা। বাবা ছিলেন রাগী মানুষ, তাকেও কিছু বলার উপায় ছিলনা। যাই হোক। সংসার বড় হলো। এই প্রথম তিনি তাঁর প্রথম সন্তানকে নিজের মত করে পেলেন। সম্পূর্ণ নিজের কেউ। তাকে লালন পালন করা, শয়নে স্বপনে বুকের কাছে রাখা, অক্ষর জ্ঞান দান করা সব কিছুই নিজের মত করলেন। কয়েক বছর পর তাকে ছাড়তে হলো। ভর্তি করা হলো নন্দিনা স্কুলে।  ছাড়তে খুব কষ্ট হতো। তিনিও তাকে ছেড়ে যেতে চাইতেন না। আম্মা লুকিয়ে তাকে একটি টাকা দিতেন। বুঝিয়ে সুঝিয়ে স্কুলে পাঠাতেন। তিনি ছিলেন দূরন্ত প্রকৃতির ছেলে। অত্যন্ত মেধাবী। নতুন বই কয়েক দিনে মুখস্থ করে    ছিড়ে বাতাসে উড়িয়ে দিতেন। বলতেন আমার সব মুখস্থ। বই নিয়ে স্কুলে যাওয়ার প্রয়োজন কি? অংকও তার  নখদর্পণে ছিল।

সে প্রসঙ্গ থাক এখন মায়ের প্রসঙ্গ বলি। মা তখন পরবর্তী সন্তানকে নিয়ে ব্যস্ত হতেন। এইভাবে তিনটি  ভাইয়ের পর আমার জন্ম। বাড়িতে আনন্দের জোয়ার এলো। হাঁটি হাঁটি পা পা যখন আমার মা আমার হাতে শিশুতোষ বই তুলে দিলেন। বইটির নাম “কমল কলি”। শেখালেন অসংখ্য ছড়া, ছড়া গান, কবিতা। ভোর হল দোর  খোলো, খুকু মণি উঠরে.....। গাছে বসে ডাকে পাখি উঠ, উঠ, উঠ বলে, নয়ন মেলরে শিশু জয় জগদীশ বলে।  আরো অনেক কবিতা শুনিয়ে ঘুম ভাঙ্গাতেন। আমার বাবা আমার বড় ভাইদের জন্মের পর গ্রামে একটি মক্তব (প্রাইমারী স্কুল) প্রতিষ্ঠা করেন। সেটি আজও বর্তমান আছে। সেই স্কুলেই আমাদের সকলের হাতে খড়ি। সেখান থেকে আমরা একে একে বেরিয়ে এসে শহরের হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করে, প্রত্যেকে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করি। একদিন রাতে আমরা যখন ঘুমে, বাবা মাকে বললেন, ফিরোজার ভর্তির ব্যাবস্থা করে এসেছি। বিদ্যাময়ী গার্লস  স্কুলে। আগামী সকালে তাকে নিয়ে যাবো। তাকে তৈরি করে দাও। ৬ টি ব্লাউজ, ৬ টি শাড়ি, ৬ টি পেটিকোট ইত্যাদি খুটিনাটি, সব কিছু লেখা একটি প্রোসপেক্টাস আম্মার হাতে দিলেন। আমার চোখের ঘুম উধাও। আমি মাকে ছেড়ে কি করে থাকবো? আমার প্রিয় বন্ধুরা, প্রিয় পেয়ারা গাছ, কুল গাছের আগডালে মগডালে চড়া, সারাদিন টো টো করে গ্রাম শুদ্ধ ঘুরে বেড়ানো, এসবের কি হবে? আমি সেখানে হোস্টেলে থাকতে পারবোনা। কিন্তু আমার প্রচন্ড রাগী বাবার সঙ্গে এমন কথা বলা অসম্ভব। সুতরাং এক বুক কান্না নিয়ে পরদিন প্রত্যুষে বাড়ি হতে বের হয়ে গেলাম। সব গুছিয়ে দিলেন আম্মা, হাতে দিলেন একটি টাকা।

তখনকার দিনে গ্রামাঞ্চলে যানবাহন ছিলনা। ছিল দুই বেহারার ডুলি। তাতে চড়ে ধলা রেল স্টেশনে  পৌঁছালাম। কারণ ঐ বয়সে পদব্রজে ৫ মাইল পথ অতিক্রম করা সম্ভব ছিলনা। আম্মা এদিকে রিক্ত হলেন। সারাদিনের শতকাজের মধ্যেও তাঁর চোখের জল শুকায় না। কয়েক বছর পর আমার বাবা আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা আজিজ আহমেদকে নান্দিনা স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। আমার মা এবার সম্পুর্ণ শুন্যতার মধ্যে পড়ে গেলেন। তার  শৈশবের একাকীত্ব আবার তার কাছে ফিরে এলো। সপ্তাহান্তে একটি চিঠির অপেক্ষায় থাকতেন তিনি। বড় ভাইয়েরা তখন স্কুল কলেজের গন্ডি পেরিয়ে অনেক দূরে। কেউ প্রেসিডেন্সি কলেজে, কলকাতা মেডিকেল কলেজে, কেউ অন্যান্য কলেজে ভর্তি হয়ে পুরোদমে লেখাপড়া করছে। ছুটিতে আমরা বাড়িতে এলে মায়ের খুব আনন্দ হত। খুব যত্ন করতেন আমাদেরকে, যেন অতিথি, মেহমান! 

একবার শীতের সময় বার্ষিক পরীক্ষার পর বাড়ি এসে দেখি তিনি ভয়ানক অসুস্থ। তার শ্বাস কষ্ট অ্যাজমা হয়েছে। ব্রংকিয়াল অ্যাজমা। শ্বাস প্রশ্বাসের কষ্ট যে এত ভয়ংকর হতে পারে, তা কল্পনার বাইরে ছিল। একটি দম শেষ হতে না হতেই আরেকটি দম এসে শ্বাস টেনে ধরে। উপর্যুপরি শ্বাস টানার ফলে ব্যক্তিটি হাঁপিয়ে ওঠেন। সেজন্য হয়ত এর আরেক নাম হাঁপানি রোগ। আমার মায়ের এহেন কষ্ট দেখে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। এতই কষ্ট যে কথা বলারও সময় দেয় না। এই অ্যাজমা রোগ বাকি জীবনের সঙ্গী হয়ে রইল। তিনি কিছুটা সুস্থ হলেন। আমার ছুটীও শেষ হল। আমরা একে একে বাড়ি থেকে যার যার হোস্টেলে চলে গেলাম। উনার একাকীত্বের সঙ্গী হয়ে রয়ে গেল ঐ ভয়ানক ব্যাধি। জীবনের বাকি ত্রিশটি বছর তিনি এই নিষ্ঠুর ব্যাধির সঙ্গে লড়াই করে জীবন কাটিয়েছেন। আমরা কেউ তাকে সঙ্গ দিতে পারিনি। তিনি কাউকে তার সঙ্গে থাকার জন্য অনুরোধ বা জোর করেননি। কত ঝড় ঝঞ্ঝা, কত গ্রীষ্ম, কত বর্ষা একা ঘরে একাকী অবস্থায় দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী অতিক্রম   করেছেন। যতক্ষণ ভাল থেকেছেন, ততক্ষণ সংসারের কাজে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। 

আমার মা জুবাইদা খাতুন পরম দয়ালু ছিলেন। মানুষের কষ্ট দূর করার চেষ্টা করতেন। বিশেষ করে খাবার  দিয়ে খুব সাহায্য করতেন। কেউ অভুক্ত দরজায় এসেছে তাকে ফিরাতেন না। “মাফ কর” কখনও বলেননি। খাদ্য দিয়ে, চাউল দিয়ে, টাকা দিয়ে সাধ্যমত সাহায্য করতেন। তার হাতের রান্না ছিল উৎকৃষ্ট। অনেকেই অসুস্থ হলে উনার হাতের রান্না করা বিশেষ খাবারের আবদার করে পাঠাতেন। আমার মা সঙ্গে সঙ্গে তার ব্যাবস্থা করে পাঠিয়ে দিতেন। তারা বলতেন, তোমার মায়ের হাতের রান্না যে খেয়েছে তার জীবন সার্থক।

বাড়িতে মাহে নাও, সওগাত, মাসিক মোহাম্মদী ম্যাগাজিন আসতো। আমার বাবা, ভাইয়েরা বাড়িতে  আসার সময় খবরের কাগজ নিয়ে আসতেন। সেগুলো তিনি পুংখানুপুংখ রূপে পড়তেন এবং সংরক্ষণ করতেন।  সেজন্য সমসাময়িক পৃথিবীতে কোথায় কি ঘটছে সব জানতেন। তিনি প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ দেখেছেন, খবর রেখেছেন। উনার নিকট থেকে পরবর্তী কালে আমরা এসব যুদ্ধের অনেক তথ্য জানতে পারি। জাপানীদের রেঙ্গুন আক্রমনের পুরো ঘটনা তার কাছ থেকেই শুনেছি। ইতিহাসে যা পড়েছি তার চেয়েও বেশী। কারণ আমার ছোট মামু মোহাম্মদ জাকারিয়া তখন রেঙ্গুনে চাকুরী করতেন। আক্রমনের সময় বাংকারে চলে যান। পরে সেখান থেকে বের হয়ে ৯ দিন ৯ রাত আসামের জঙ্গলের ভিতরে হেঁটে সিলেটের সীমান্তে এসে পৌঁছান।

জুবাইদা খাতুন মুগলদের ইতিহাস পড়তেন। নবাব সিরাজুদ্দৌলার কথা, পলাশীর প্রান্তরে মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কথা সব যুদ্ধের গল্প আমাদেরকে বলতেন। ধর্মের সকল পুস্তক তার কন্ঠস্থ ছিল। কোরান হাদিসের কথা মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন। পুঁথি সাহিত্যে তার দখল ছিল। সুন্দর সুললিত কণ্ঠে পুঁথি পাঠ করতেন। গ্রামে তাকে সকলেই ভালবাসতো। মেয়েরা যে কোন সমস্যা নিয়ে সর্বদা তার কাছে আসতেন। ধর্মীয় পরামর্শ ও শিক্ষা তার কাছ হতেই নিতেন। আমার মায়ের রাগ ছিলনা। ছিলনা কারো বিরুদ্ধে বিদ্বেষ। তিনি ছিলেন সহনশীলতার প্রতীক। একটি আলোর প্রদীপ। যে আলো মানুষকে পথ দেখায়, দহন করেনা। পরবর্তীতে রেডিও আসার পর নিয়মিত খবর শুনতেন। তিনি গ্রামের মেয়েদের পথ প্রদর্শক ছিলেন।

আমার পিতা অত্যন্ত প্রতাপশালী এবং দাপটের লোক ছিলেন। সমাজ সেবা তার জীবনের আদর্শ। আজকালকার যুগে যেমন স্বামী স্ত্রীরা একসঙ্গে পরামর্শ করে ঘর-সংসার পরিচালনা করেন, সে যুগে তেমনটি ছিলনা। তখন গৃহকর্তা ছিলেন সকলেরই গার্জিয়ান। তার নাম হুকুম আর বাকীদের নাম তামিল। এই হুকুমের  নড়চড় নেই। সেই কারণেই আমার পরিশিলিত হৃদয়বান, সংস্কৃতিবান মাতা জুবাইদা খাতুন নিঃসঙ্গ ছিলেন। বই –পত্র পত্রিকা, কবিতা, ছড়া, গজল, এসবকে সঙ্গী করে নিমগ্ন থাকতেন। অবসর সময়ে আলস্যে ব্যয় করতেন না।  তবে তার কোন আফসোস ছিলনা। একাকীত্বের মাঝেও তিনি পূর্ণতা লাভ করেছেন বইয়ের মধ্যে। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই। অনুযোগ নেই। পিতা আব্দুস সোবহান বিশ্বাস রাগী হলেও আমার মায়ের উপর ছিল অগাধ বিশ্বাস আর পরম নির্ভরতা। কোন সিদ্ধান্ত নেবার আগে মাকে জানাতেন। লেখাপড়া শেষে আমরা দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়লাম। পিতা অবসর নিলেন। বাড়িতে এলেন। ধর্ম-কর্ম, সমাজসেবায় আরো মনোযোগী হলেন। মাতা ঘর-সংসার আর শ্বাস কষ্টকে সঙ্গী করে চলতে লাগলেন। সবকিছুই একদিন শেষ হয়। তাই তিনিও ১৯৮২ সালের ২৬ শে জুলাই সকল মমতার বন্ধন ছিন্ন করে জান্নাতবাসী হলেন।

মা শব্দটি কত না মধুর। কতই না সুন্দর। অনেক ভাষায় আমার জানামতে, মা শব্দের সঙ্গে ‘ম’ শব্দটি জড়িত এবং ‘ম’ তেই মধু। মাতা একটি পরিবারের পত্তন। পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু। সন্তানের জননী। সন্তানের চাইতে প্রিয় ধনসম্পদ মায়ের কাছে আর কিছুই নেই। দিবা রাত্রি অষ্টপ্রহর মা বক্ষে জড়িয়ে তার সন্তানের সেবা –যত্ন আর নিরাপত্তা রক্ষা করে থাকেন। তার লেখাপড়ার হাতেখড়ি থেকে শুরু করে মানুষের মত মানুষ করবার প্রয়াসে নিয়োজিত থাকেন। আমাদের মা আমাদেরকে সৎ এবং সুশীল মানুষ হবার দীক্ষা দিয়েছেন। পরম সতর্কতার সঙ্গে আমাদের মানসিক বিকাশের পথ সুগম করে দিয়েছেন। তাই তাঁর সন্তানেরা আজ নিজের নিজের জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত। পরের জন্য তাদের হৃদয় কুসুমকে প্রস্ফুটিত করেছেন। এমন মায়ের সন্তান হয়ে আমরা গর্বিত। সার্থক জনম মাগো জন্মেছি তোমার কোলে। তোমার আত্মা পরম শান্তি লাভ করুক অনন্তকাল – এই প্রার্থনা আমার। 

...........

Sunday, March 15, 2026

স্মৃতিচারণমূলক- আমার বাবার কথা


 বিশ শতকের গোড়ার কথা। গ্রাম বাংলা গভীর তমশায় আচ্ছন্ন। বিশেষ করে ত্রিশাল থানার হরিরামপুর এলাকা। বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এক প্রত্যন্ত পল্লী অঞ্চল। শিক্ষা দীক্ষার অভাব, এক নিরক্ষর জনপদ। সাদা পুস্তকের ভিতর কালো অক্ষর কি বলে, তা তাদের চিন্তার বাইরে। তবে কেউ কেউ আরবী অক্ষর চেনেন। মসজিদে ইমামতি করেন।  

আমাদের এ অঞ্চল যখন গভীর আঁধারে ঢাকা, কালো অন্ধকার চাদরে জনপদ আবৃত, কোথাও কোন আলোর চিহ্ন নেই, সেই সময় হয়তো দূর দিগন্তের ওপার হতে একটি নক্ষত্রের আলো ভেসে আসে। এবং সেটি উজ্জ্বলতর হতে হতে আমাদের হরিরামপুর গ্রামে এসে পতিত হয়। আমার পিতা জন্ম লাভ করেন। সেই নক্ষত্রের দেশ থেকে অবতরণ করে, এই মাটির পৃথিবীর এক কোণে দীপ্তিমান আলোর বিচ্ছুরণ ঘটান। সেটি ছিল ১৮৯৯ সাল। তিনি ছিলেন ‘স্টার চাইল্ড’ –বিধাতার বর প্রাপ্ত। যিনি সুদূর আকাশ থেকে একটি আলোর প্রদীপ এনে পরবর্তীকালে আমাদের অঞ্চলকে আলোয় উদ্ভাসিত করেছেন। 

জন্মের তৃতীয় বছরেই তিনি পিতাকে হারান। তাই পিতার ছত্রচ্ছায়া কি, অভিভাবক কি তা তার জানা ছিল না। একমাত্র মা তার সবকিছু। মাতা ছিলেন অত্যন্ত প্রখর বুদ্ধিমতী এবং দৃঢ় চিত্তের মহিলা। তিনি একাই তার পথপ্রদর্শক। চার পুত্র আর দুই কন্যা নিয়ে তার জীবন পরিক্রমা। 

আমার বাবার শিশুকাল। শৈশবের আনন্দ তার ধরা ছোঁয়ার বাইরে ছিল। বাড়ির আঙ্গিনায় অন্য শিশুদের সঙ্গে  বিকেলে একটু খেলাধুলা করতেন। বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে হিন্দু ছেলেরা যাতায়াত করতো। বালক অবাক হয়ে মা কে শুধায়, 

- এরা ধুতী ফতোয়া পরে হাতে স্লেট পেন্সিল নিয়ে কোথায় যায় মা?  

মা বলেন, ওরা পাঠশালায় যায়।

- পাঠশালা কি, মা?

- পাঠশালায় ওরা লেখাপড়া করে। 

- আমিও যাব। আমিও লেখাপড়া করবো। 

- না, ওরা  হিন্দু। ওদের পড়া আমাদের পড়া এক নয়। আমাদের পড়া মক্তবে। ঐ যে জুমার ঘরের পাশে ছনের ছাউনি দেওয়া ঘরখানি, ওটাতে তুমি পড়তে যাবে, আরেকটু বড় হয়ে। 

বালক বলে, না মা, ওখানে আমি যাব না। হিন্দুদের পাঠশালায় যাব। মা বললেন, তোমার নাম আব্দুস সোবাহান, তোমাকে ওরা নেবে না। ওদের পড়া বাঙলা। ছেলের পীড়াপীড়িতে মা অতিষ্ঠ হয়ে তাকে মক্তবে নিয়ে যান। মৌলবী সাহেব নাম লিখে নিলেন। শুরু হলো পাঠ দান। প্রথম পুস্তকের নাম ‘কায়েদা’। আরবী অক্ষর পরিচয় এবং পাঠ শিক্ষা। অল্প দিনেই তার কায়দা পড়া শেষ। তারপর শুরু হলো, শিক্ষা কোরান তেলাওয়াৎ। তাও শেখা শেষ। তখনকার দিনে একটি ঘরে সব বিষয় পড়ানো হতো।  লেখার রীতি ছিল না। ক্লাশরুম ছিল না।

এবার কি পড়বে? অস্থির মতি বালককে নিয়ে মা পড়লেন বিপাকে। তিনি তার জ্যেষ্ঠ পুত্রদের পরামর্শ চাইলেন। তারা একবাক্যে সব উড়িয়ে দিয়ে বাস্তবে পদার্পণ করার উপদেশ দিলেন। ওসব ঝামেলা বাড়িয়ে কাজ নেই। বাংলা পড়ার প্রয়োজন কি। আমরা তো লেখাপড়া শিখি নাই। তাতে তো ক্ষতি দেখি না। তোমার ছোট ছেলের অদ্ভুত চিন্তা ভাবনা মাথা থেকে নামাও। ওকে সময় মতো কাজে লাগাও। নয়তো উচ্ছন্নে যাবে।  ওর মতিগতি বড়ই অস্থির। আমাদের মতো নয়। সত্যিই তিনি অস্থির চিত্তের অধিকারী ছিলেন। ছিলেন নির্ভীক প্রকৃতির। একাই শিশুকালে বড় চিন্তা করতে পারতেন। ছোট হলেও তার সিদ্ধান্ত তিনি নিজেই নিতেন। তাকে সাহস দেবার, পথ দেখাবার কেউ ছিল না। মা শিরে হাত দিয়ে ভাবতে থাকেন। একদিকে মাতৃস্নেহ, অন্যদিকে বাস্তবতা। বড় কঠিন সমস্যা। একদিন ছেলের হাত ধরে একটি শাড়ি চাদরের মতো ভাঁজ করে গায়ে জড়িয়ে ছোট্ট নদীটির সাঁকো পার হয়ে চলে গেলেন ওপারের পাঠশালায়। শিক্ষক গিরিশ বাবু। ভ্রু কুঁচকে অবাক চোখে তাকালেন, 

- কি চাই বিবি? 

তখনকার দিনের সম্ভ্রান্ত মুসলমান মহিলাদেরকে বিবি বলে সম্বোধন করা হতো। তিনি তার পুত্রের পড়ালেখার   প্রতি আগ্রহের কথা ব্যক্ত করলেন। গিরিশ বাবু বিস্মিত হলেন। বললেন, পারবে?

তিনি বললেন, পারবে না কেন? মক্তবের পড়া শেষ করতে তার একবছরও লাগেনি। যেখানে অন্য ছেলেরা বছরের পর বছর ধরে পড়ছে। 

মাস্টার মশাই বললেন, ঠিক আছে কাল নিয়ে আসেন। পরের দিন আমার সাহসী দাদী তার দুঃসাহসী পুত্রকে নিয়ে স্কুলে গেলেন। মাস্টার মশাই বললেন, ধুতি, ফতোয়া লাগবে। আর লাগবে শ্লেট পেন্সিল, বাংলা আদর্শ লিপি বই। এতসব জিনিসপত্র জোগাড়  করা সহজ ছিল না সেই সময়ে। আমার বাবার সেই থেকেই শুরু হলো সংগ্রাম। উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে তিনি ঘোড়ার গতিতে এগিয়ে যেতে লাগলেন। কিন্তু বাধ সাধলো পাঠশলার ছেলেরা। একমাত্র মুসলমান ছেলে তাদের মাঝে পেয়ে কৌতুক বোধ করতে লাগলো। তাকে তারা উত্যক্ত করতে লাগলো। একদিন তিনি সতীর্থদের বাক্যবাণ সহ্য করতে না পেরে একজনকে চড় মেরে বসলেন। গিরিশ বাবু রেগে গিয়ে অগ্নিমূর্তি ধারণ করলেন। তিনি নতুন ছাত্রকে হাতের কঞ্চি দিয়ে আঘাত করলেন। ছোট হলেও নতুন ছাত্রের ছিল প্রচন্ড রাগ। তিনি অপমানিত বোধ করলেন। কাঁদতে কাঁদতে গড়াগড়ি খেতে খেতে বাড়ির দিকে আসতে লাগলেন। গাঁয়ের লোকেরা খবর পৌঁছালো আমার দাদীর কাছে।  তিনি ছুটে গেলেন। সাঁকোর ওপার হতে পুত্রকে কোলে তুলে নিয়ে বাড়িতে এলেন। তার খুব জ্বর হলো। কবিরাজ ডাকা হলো। সে সময়ে কবিরাজের ফি ছিল সোয়া পাঁচ আনা। এরমধ্যে গিরিশ বাবু বাড়িতে এলেন। জানতে চাইলেন ছাত্র স্কুলে যায় না কেন। আমার দাদী গিরিশ বাবুর ব্যবহারে মর্মাহত ছিলেন। বললেন, 

- আপনি শিক্ষিত বয়স্ক মানুষ। আমার এতটুকু ছেলের গায়ে হাত তুললেন?  স্কুলের একটিমাত্র ঘরের ভেতরে গত একমাসে প্রতিদিন আমার ছেলেকে অপমান করা হচ্ছে। আপনি তা লক্ষ্য করেন নি। লক্ষ্য করেছেন যখন আমার ছেলে মাত্র একদিন কাউকে প্রতিহত করবার  জন্য থাপ্পড় মেরেছে। আপনিও ভেদাভেদ করছেন। কেন?  মুসলমান হওয়া কি অপরাধ? তাদের কি লেখাপড়া করার অধিকার নেই? এটা কি একটা অন্যায় ? আমরা কি কোম্পানীর (East India Company) খাজনা দিই না? সেরে উঠুক, তাকে মাদ্রাসাতে ভর্তি করে দিয়ে আসবো। আপনাদের মতো এত বড় লেখাপড়ার দরকার নেই।

মাস্টার বাবু  সেদিনকার ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন। বললেন, ওকে পাঠশালায় পাঠিয়ে দেবেন, আমি দৃষ্টি রাখবো। বার্ষিক পরীক্ষার মাত্র একমাস বাকী, দেখি সে কেমন করে। সে লেখাপড়ায় মনোযোগী।  তার দুই দিন পর আমার দাদী তার পুত্রকে পাঠশালায় রেখে এলেন। আমার বাবা ছিলেন তুখোড় ছাত্র। লেখাপড়ায় মন দিলেন। বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে দ্বিতীয় শ্রেনীতে উত্তীর্ণ হলেন। ছেলেরা চমকে  উঠলো। তারপর থেকে সতীর্থরা তাকে সমীহ করতো। 

ব্রিটিশ আমলে চতুর্থ শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষা হাইস্কুলে গিয়ে দিতে হতো। অনেকটা বোর্ডের পরীক্ষার মতো এবং সেটার একটা বিশেষ কদর ছিল। আমার বাবা ভাল রেজাল্ট করে প্রাইমারি অতিক্রম করে এলেন। গিরিশ বাবু নিজে বাড়িতে এসে বললেন, বিবি, আপনার ছেলে উচ্চশিক্ষার উপযুক্ত।  তাকে হাইস্কুলে পাঠাবার ব্যবস্থা করেন।

দাদীর মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। তিনি তার ছেলেদেরকে ডাকলেন। সব শুনে তারা বললেন, আমাদের পিতা নেই। কেবল জমিজমা থাকলেই হবে না। তার থেকে ফসল ঘরে তোলা চারটি খানি কথা নয়। বর্গা দেওয়া সব জমি। অর্ধেক ফসল ঘরে আসে। সংসারে মুখ বেড়েছে। সুতরাং আমরা এসবের মধ্যে নেই। পুস্তক কেনার জন্য কাঁচা টাকা বের করা সম্ভব নয়। আপনি আমাদেরকে জুদা করে দেন। যার যার সংসার সে নিজে দেখেশুনে রাখুক। দাদী বিষন্ন হলেন। পরবর্তীতে শুনেছি, তিনি বলতেন, দু’পয়সার পুস্তকের জন্য আমার পুত্রেরা পৃথক হাড়ি চড়ালো। কনিষ্ঠ পুত্রের দৃঢ় ইচ্ছার ফলে আমার দাদীর পরিবার খন্ড খন্ড হয়ে গেল। আমার পিতা এক ঐশ্বরিক শক্তির বলে এগিয়ে চললেন। 

আমার পিতা গফরগাঁও হাইস্কুলে ভর্তি হলেন। বিদ্যালয়ের দূরত্ব বাড়ি থেকে ছয় মাইল। প্রতিদিন পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতে হতো। আজকের দিনে যা কল্পনা করে দুরূহ। যেতে আসতে সব সময় ব্যয় হয়ে যেত। সেজন্য আমার বাবা জায়গীর থাকার ব্যাবস্থা করলেন। তখনকার দিনে এটি একটি প্রচলিত প্রথা ছিল। এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তিনি লজিং থাকলেন। মেধাবী ছাত্র আদর্শ ছাত্র যাকে বলে তিনি ছিলেন তাই। সেই বাড়ীতে থেকে তিনি তাদের ছোট ছেলেদের পড়াতেন। তার পরিবর্তে  তাদের স্নেহ মমতাও পেয়েছেন খুব। তারা তাকে বাড়ির ছেলের মতোই গণ্য করতেন। 

যথাসময়ে আমার বাবা এন্ট্রান্স (Entrance) পরীক্ষায় ভাল ভাবে উত্তীর্ণ হন। সেটা ছিল ইংরেজী ১৯১৯ সাল। তিনি বলতেন সেই সময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। 

এখানে আমার পরম শ্রদ্ধেয় পিতার চরিত্রের একটি উল্লেখযোগ্য দিক বর্ণনা করতে হয়। স্কুলের নিয়ম কানুন তিনি মেনে চলতেন। শিষ্টাচার বজায় রাখতেন। ভাল ছাত্র এবং আদর্শ ছেলে হিসাবে তিনি সকলের কাছে পরিচিত ছিলেন। সেজন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে অনুষ্ঠান করে ‘বিশ্বাস’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এটি একটি অসাধারণ পুরস্কার। এরপর থকে তিনি আবদুস সোবাহান বিশ্বাস নামে পরিচিতি লাভ করেন। 

তিনি বাড়িতে ফিরে এলেন। গ্রামের লোকেরা খুব খুশী হলো। একজন শিক্ষিত লোকের স্বভাব চরিত্র আচার আচরণ কেমন হয় তা দেখবার সুযোগ পেল।  তারপর শুরু হলো তার প্রকৃত জীবন সংগ্রাম। কলেজে ভর্তি হতে চাইলেন। টাকার প্রয়োজন। বইখাতা, বেতন, শহরে থাকার অন্যান্য খরচ জোগাড় করা এক অসম্ভব ব্যাপার । গ্রামের জমিজমা থাকলেও হাতে টাকা থাকে না। কারণ ধান বিক্রির টাকা দিয়ে সংসারের যাবতীয় খরচ চালাতে হয়। আমার বাবা ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ পাড়ি দেবার জন্য দুর্দমণীয় সাহস নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চললেন।  

আমার দাদী, ছোট ফুফু, আমার বাবা – এই  তিনজনের সংসার। হাতে টাকা নেই। আমার বাবা তাদের পরগণার জমিদারের সাক্ষাৎকার প্রার্থনা করে দরখাস্ত করেন। তখন তাদের জমিদার ছিলেন রাজা জগৎকিশোর। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় ছিল তাদের বিরাট প্রাসাদ। ময়মনসিংহের টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, মহিলা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ (শশী লজ) – এসব স্থাপনা তদেরই কীর্তি। যথাসময়ে সাক্ষাৎকারের জন্য জমিদার বাড়িতে গেলেন আমার পিতা। সাদা ধুতি, সাদা শার্ট, কালো জুতা পরিধান করে হাজির হলেন জমিদার বাড়িতে। দর্শনও মিললো তার। আমার পিতা তার বক্তব্য পেশ করলেনঃ তিনি পিতৃহীন, লেখাপড়ায় খুব আগ্রহ, রেজাল্ট ভাল কিন্তু আর্থিক আনুকুল্য নেই। সেজন্য কলেজে ভর্তি হতে পারছেন না। একটা বৃত্তির ব্যবস্থা হলে তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহন করতে পারতেন। বিবরণ শুনে জমিদার বাবু বললেন, ‘Listen, higher education is not for the poor. গ্রামে যে জমিজমা আছে তাই দেখাশুনা কর। চলে যাবে।’

জমিদার বাবুর সঙ্গে আর কথা বলার উপায় নেই। ভগ্ন মনোরথে ফিরে এলেন বাড়িতে। শুনে দাদী আঁচল দিয়ে নিজের চোখ মুছলেন। ছেলের মুখের ঘাম মুছে দিলেন। 

আমার বাবা খুব সাহসী ছিলেন। ঐটুকু বয়সেই কারো পরামর্শ ছাড়াই নিজে সাহস করে প্রচন্ড প্রতাপশালী জমিদারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন। এটা কম কথা নয়। মিশন ব্যর্থ হলেও তার সাহসের তারিফ করতে হয়। পরে তিনি মুক্তারী পড়েছিলেন। কিন্তু সে পেশা জীবনে গ্রহন করেননি।

তারপর শুরু চাকুরীর অনুসন্ধান। দারোগার চাকুরী পাওয়া গেল। ভাবনায় পড়ে গেলেন। মনস্থির করলেন পুলিশের চাকরী করবেন না। পরে পেলেন সাব রেজিস্ট্রারের চাকরী। এটাও মনপুতঃ হলো না। এখানেও সততা বজায় রাখা কঠিন। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলেন শিক্ষকতাই সর্বোত্তম পেশা। সৎ ও সুন্দর জীবন যাপন শিক্ষকতাতেই সম্ভব। হয়তো আর্থিক অনটন থাকবে। তিনি জামালপুর এলাকায় সিংজানী স্কুলে প্রথম শিক্ষকের চাকুরী গ্রহন করেন। একবছর চাকুরী করার পর তিনি নলিনী মোহন দাস (মাখন দাস), মৌলবী জয়েন উদ্দিন, রিয়াজ মাস্টার, এস কে বসু এবং আরো অনেক উচ্চ শিক্ষিত জ্ঞানী ও গুনী ব্যাক্তিদের প্রচেষ্টায় নান্দিনা মহারাণী হেমন্তকুমারী উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয় স্থাপনে উদ্যোগী হন। স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়।  শিক্ষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে ধীরে ধীরে এটি একটি অনন্য সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্থান অধিকার করে। শিক্ষকরা ছিলেন নিবেদিত প্রাণ ও বিদ্যোৎসাহী। ছাত্ররাও তেমনি ছিলেন তুখোড় ও শৃংখলাবদ্ধ।

শ্রী শৈলেন্দ্রনাথ চৌধুরী, বঙ্কিম রাও, সুরেন্দ্রনাথ রক্ষিত, বিধুবাবু এবং অনেকের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে এই স্কুলের ছাত্ররা দেশের সেরা মানুষ হিসাবে বেরিয়ে আসে। এটি আদর্শ বিদ্যাপীঠ হিসাবে দেশে সুনাম অর্জন করে। শিক্ষকের সততাই ছাত্রের পথপ্রদর্শক। আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা নাজির আহমেদ নান্দিনা স্কুলের ছাত্র ছিলেন। তিনি ভারত বিভাগের পূর্বে Undivided Bengal –এ ক্যালকাটা শিক্ষাবোর্ডের এন্ট্রান্স (SSC) পরীক্ষায় পঞ্চম স্থান অধিকার করে বিশেষ কৃতিত্বের অধিকারী হয়েছিলেন। তিনি পাঁচ বিষয়ে লেটার মার্কস অর্জন করেছিলেন। বৃত্তি পেয়েছিলেন। উল্লেখ্য তখনকার দিনে সেই ১৯৪৩ সালে লেটার মার্কস লাভ করা খুব দুরূহ ব্যাপার ছিল। লেখাপড়ার মাধ্যম ছিল সেই ব্রিটিশ আমলে ইংরেজী। স্কুল প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অনেক কাঠ খড় পোড়াতে হয়েছে। কঠোর পরিশ্রমের দ্বারা  তারা এই স্কুলকে এতো উন্নত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। 
সেই সময়ে আজকের দিনের মতো এতো হস্টেল ছিল না। আমার বাবা আবদুস সোবাহান বিশ্বাস, রিয়াজ উদ্দিন মাস্টার সাহেবের বাড়িতে জায়গীর থাকতেন। আমার বড় ভাই নাজির আহমেদ, খলিলুর রহমান (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) সাহেবের পিতা জয়েন উদ্দিন মৌলবী সাহেবের বাড়িতে জায়গীর থাকতেন। পরে আমার পিতা একখন্ড জমি ক্রয় করে সেখানে একটি বাড়ি নির্মাণ করেন। তখন তিনি আমার ছোট ভাই আজিজ আহমেদকে নিয়ে ওই বাড়িতে বসবাস করতেন। 
আমার ভাইয়েরা নান্দিনা স্কুলের ছাত্র। বড় ভাই নাজির আহমেদ ক্যালকাটা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে কৃতিত্বে সঙ্গে আই. এস. সি. পাশ করেন। সব বিষয়ে তার সমান দক্ষতা।  শেষ পর্যন্ত মেডিক্যাল লাইনে বিদ্যাঅর্জন করবার সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। ভর্তি হন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে। সেখানে তিনি তুখোড় এবং ভাল ছাত্র হিসাবে পড়াশুনা করছিলেন। ছাত্র রাজনীতিতেও ছিলেন অগ্রগামী। এই সময়ে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া  নানান ঘাত প্রতিঘাত, যুদ্ধ বিগ্রহ, সিপাহী বিদ্রোহ, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তুংগে অবস্থান করছিল। ‘বন্দে  মাহতরম’ শ্লোগানে প্রকম্পিত ভারত। শেষ পর্যন্ত বড়বড় নেত্রীবৃন্দ ব্রিটিশ শাসকদেরকে ভারত ত্যাগ করতে বাধ্য করলো। ব্রিটিশের ভারত ত্যাগ এবং ভারত বিভাজন পৃথিবীর ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। ভারত বিভক্তির ফলে পাকিস্তান ও হিন্দুস্থানের জন্ম হয়। পাকিস্তান পায় দুটি ভূখন্ড - একটি ভারতের পশ্চিম অংশে পশ্চিম পাকিস্তান, অন্যটি পূর্ব বংগ  অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান। এই পূর্ব পাকিস্তানই আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। ব্রিটিশগণ ভারত ছাড়ার সময়ে হিন্দু মুসলিম দাংগা লাগিয়ে দিয়ে যায়। ফলে বহু মানুষ নিহত হচ্ছিল। তখন আমার ভাই নাজির আহমেদ অনন্যোপায় হয়ে অতি কষ্টে নিজের মুসলমান পরিচয় গোপন রেখে এক কাপড়ে শিয়ালদহ স্টেশনে রওনা হন। ট্রেনের বাইরে ও ভিতরে বাঙ্গালী মুসলমান বোঝাই। তিল ধারণের ঠাঁই নাই। দুই জন কুলিকে চার আনা, চারা আনা করে পয়সা দিয়ে ট্রেনের কামরার জানালা দিয়ে তাকে ঢুকিয়ে দেবার ব্যবস্থা করেন। অনেক কষ্টে তারা তাকে ঠেলে ঠুলে ভিতরে ঢুকিয়ে দিল। গাদাগাদি অবস্থায় তিনি ময়মনসিংহ রেল স্টেশনে অবতরণ করেন। তারপর অন্য ট্রেন ধরে ধলা স্টেশনে পৌঁছেন। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে বাড়ি পৌঁছান। 
কয়েকদিন বিশ্রাম নেবার পর পিতার আদেশে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন। এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ছাত্র হিসাবে যোগদান করেন। এখানেও তার খ্যাতি ও কৃতিত্ব প্রকাশ পায়। তিনি কলেজ ছাত্র ইউনিয়নে ভিপি নির্বাচিত হন। তার  ব্যক্তিত্ব বিদ্যা এবং জ্ঞানের জন্য তিনি সকলের প্রিয়ভাজন হন। পরবর্তীতে ঢাকা মেডিক্যালে কলেজের ছাত্র হিসাবে বিশেষ ভাল রেজাল্ট করে এম. বি. বি. এস. পাশ করেন। 
পরবর্তীতে পাকিস্তান আর্মির মেডিক্যাল কোরের অফিসার হিসাবে বিলেতে পড়তে যান। সেখানে দুই বছরের কোর্স দেড় বছরে সম্পন্ন শেষে এফ. এফ. এ. আর. সি. এস. ডিগ্রী অর্জন করেন। আমার পরের ভাই ডাক্তার হাফিজ আহমেদ আর্মি মেডিক্যাল কোরের অফিসার  হিসাবে আজাদ কাশ্মীরে চাকুরী গ্রহন করেন। আমার ছোট ভাই আজিজ আহমেদ ব্যাংকার হিসাবে উচ্চপদে আসীন হয়ে বর্তমানে অবসর গ্রহন করেছেন। এদিকে আমাদের হরিরামপুরের গ্রামের বাড়িতে আমার পিতার সংসার। তার মাতা তখন জীবিত ছিলেন। তিনি মাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। ঘোরতর অন্ধকার গ্রাম্য জীবনে এই মা –ই  তাকে আলোর মশাল হাতে, বৈরী পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে তার কনিষ্ঠ পুত্রের পথ চলার সঙ্গী ছিলেন। 
আমার মা আরবী, উর্দু এবং বাঙ্লা অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন মহিলা ছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও তিনি একজন স্বশিক্ষিত এবং সুশিক্ষিত মানুষ ছিলেন। পুত্র কন্যাদের শিক্ষা দীক্ষায় তাঁর অবদান কোন অংশে কম ছিল না। ছোটবেলায় আমাদের লেখাপড়ার হাতে খড়ি তাঁর হাতেই। ছড়া, কবিতা, রূপকথার হাজার গল্প বলতেন। তাঁর ছোটবেলা কেটেছিল হিন্দুস্থানের লখনৌতে। তিনি তার বড়ভাইয়ে সঙ্গে লখনৌতে থাকতেন। উর্দুতে তিনি ছিলেন পারদর্শী। আমাদের আরবী পড়াও তাঁর কাছেই শুরু।           
আর্থিক অনটনের পাহাড় অতিক্রম করার সংগ্রামে আমার বাবার সঙ্গে মায়েরও ত্যাগ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি অসংখ্য গ্রন্থ পাঠ করেছেন। অবসর সময়ে বসতেন মানচিত্র নিয়ে। সারা বিশ্বের ভৌগলিক অবস্থান, মহাদেশ, মহাসাগর, রেলপথ, নদীপথ, আকাশপথ –সব ছিল তার নখদর্পণে। রাশিয়ার বলশেভিক রেভোলিউশান, মহাযুদ্ধ সমূহ, অ্যাটমিক বোমা বিস্ফোরণ, হিরোশিমা নাগাসাকি –এসব  গল্প তার কাছ থেকে শুনে শুনে শেখা। 
সেই ঘোরতর দুর্দিনে যখন আমাদের এলাকায় নারীশিক্ষার প্রচলন ছিল না, আমার বাবা আমাকে ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। ১৯৫৩ সাল। সেই সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল খুব অনুন্নত। বাড়ি হতে পাঁচ মাইল দূরে ধলা স্টেশনে রেলে চড়ে ময়মনসিংহ শহরে যেতে হতো।  ছোট ছিলাম। দীর্ঘ পথ। হাঁটতে অসমর্থ। আমার পিতা ধৈর্য্য সহকারে উৎসাহ দিয়ে দিয়ে সেই দুর্গম পথ অতিক্রম করাতেন। তিনি ছিলেন রাগী এবং দাপটের মানুষ। কিন্তু ঐ রাস্তায় অত্যন্ত নরম ও স্নেহ পরায়ণ থাকতেন। পথে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিতেন, পানি খাওয়ার ব্যবস্থা করতেন। এভাবে শীত, গ্রীষ্ম,বর্ষায়, ঝড় বাদল মাথায় করে বছরের পর বছর তিনি আমাদেরকে মানুষ করবার কাজে ব্রতী ছিলেন। তার যে কত ক্লেশ, কত কষ্ট হয়েছে, আমরা হয়তো তার পুরোপুরি খোঁজ রাখিনি। বড় হয়ে বুঝেছি তিনি কি কঠোর পরিশ্রম করে আমাদেরকে কোথায় কিভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি ছিলেন বিরাট বটবৃক্ষের মতো। বজ্রপাত হলেও তিনি আমাদেরকে রক্ষা করে ছায়া দিয়ে গেছেন। 
তৎকালীন বিদ্যাময়ী স্কুল ছিল দেশের সেরা স্কুল। আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবন শুরু হয় এইস্কুলে। ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে যাত্রারম্ভ। বাড়ির বাইরে এই প্রথম। মন খুব খারাপ থাকতো গ্রামের জন্য। প্রতিদিন রাতে ও সকালে ভীষণ কান্না আসতো। সেজন্য বাবার চিঠির অপেক্ষায় থাকতাম প্রতি সপ্তাহে। আমার বাবার চিঠি লেখার ধরণ ছিল এই রকম –

My dear Firoza
দোয়া বহুত বহুত পর সমাচার এই যে, অদ্য তোমার একখানা পত্র পাইয়া সম্যক বিবরণ অবগত হইয়া অত্যন্ত সুখী হইলাম। ... মনোযোগ দিয়া লেখাপড়া করিও। বাড়ির জন্য চিন্তা করিও না। বাটিস্থ আমরা সকলে খোদার ফজলে ভাল আছি। তোমার সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করি।
ইতি –
তোমার আশীর্বাদক পিতা,
আব্দুস সোবাহান বিশ্বাস        
বাবার পত্র শান্তির বারি বহন করে আনতো। পরের বছর যখন ক্লাস সেভেনে উত্তীর্ণ হলাম, তখন থেকে English  এ চিঠি লিখতেন। এবং আমাকেও English -এ চিঠি লিখতে বাধ্য করতেন। 
সেসময়ে তিনি চিঠির শুরুতে লিখতেন, 
Glad to receive your letter dated 4.4.54. Happy to know that you are going on well with your studies regularly. Try to write correct sentences and consult dictionary for the spelling of the words. 
তারপর চিঠি লেখা শেষ করতেন। আমার চিঠিতে যদি কোন বানান ভুল থাকতো তবে তা উল্লেখ করে শুদ্ধ বানানটি লিখে পাঠাতেন। ছুটিতে বাড়ি আসার পর পরীক্ষায় কোন প্রশ্নের উত্তর কিভাবে লিখেছি সব জিজ্ঞেস করতেন এবং কিভাবে উত্তরটি আরম্ভ করা উচিৎ ছিল তাও বলে দিতেন।।   

আমার পরম প্রিয় পিতা নিজে বুদ্ধিমান ছিলেন। বুদ্ধিদীপ্ত  ছেলেমেয়ে খুব পছন্দ করতেন। ছেলেদেরকে বিশেষ করে যারা ছাত্র, তাদেরকে মানুষ তৈরী করবার তার ছিল আপ্রাণ প্রয়াস। তার আশেপাশে থাকলে বোকা থাকবার কোন উপায় ছিলনা। বুদ্ধিকে কিভাবে জাগ্রত করতে হয়, এ কৌশল তিনি জানতেন।
তিনি প্রতি সপ্তাহে বাড়ি আসতেন। গ্রামের জমিজমা, সংসার, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া সব ঠিকমতো চলছে কিনা দেখতেন। আবার নান্দিনায় তার স্কুলের দায়িত্বও তিনি সততা ও কঠোর শৃঙ্খলার সঙ্গে পালন করতেন। একটি ছাত্রের সর্বাংগীন উন্নতি সাধন করাই যেন ছিল তার ধ্যান জ্ঞান। এভাবেই তিনি নিজের ছেলেমেয়েদেরকে আদর্শ ছেলেমেয়ে হিসেবে গড়ে তোলেন। আমরা আজও তার আদর্শের অনুসারী। কোন অন্যায় অনৈতিক কাজ কোনদিন করতে পারিনি। তিনি যেন আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তার আদর্শের ছড়িখানি হাতে নিয়ে।                             
 নান্দিনা স্কুলের ছাত্ররা দেশের বড় বড় পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। বিদেশে নানাকাজে নিয়োজিত থেকেছেন। আজও অনেকেই সেই পুরানো দিনের ঐতিহ্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। এ সব কিছুই সেই সময়কার নিবেদিত প্রাণ শিক্ষকদের অবদান। তারা নিজের স্বার্থ দেখেননি। দেখেছিলেন ছাত্রদের স্বার্থ, স্কুলের উন্নতি, দেশের অগ্রগতি। 
আমার বাবা আমাদের গ্রামে, বাড়ির পাশে একটি প্রাইমারি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই স্কুল থেকেই আমরা এবং আমাদের গ্রামের ছেলেমেয়েরা শিক্ষা লাভ করতে শুরু করে। তিনি নিজের বাড়িতে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেটি ছিল ১৩৩৯ সাল। নামকরণ করেছিলেন তার জ্যেষ্ঠ কন্যার নামে – আমিনা লাইব্রেরী। গ্রন্থাগারটি আকারে ছোট হলেও প্রচুর দুর্লভ গ্রন্থে পূর্ণ ছিল। আমার অক্ষর জ্ঞান লাভ করার পরই তাঁর হাতে যে বইটি দেখেছি সেটির নাম ছিল ‘প্রতিভা।’


আরেকটি বইয়ের ভেতর একটি মানুষের ছবি দেখেছিলাম। ছবিটি যথেষ্ট লম্বা। পা দু’খানি টানটান, হাতও তাই। মাথাটিও ঠিক জায়গায় গোলাকার। পরবর্তীতে একদিন আমার ভাইয়ের নিকট থেকে জানতে পারলাম এটি মানুষের ‘ফসিল।’ দীর্ঘকাল মাটি চাপা পড়ে থাকলে যা পাথরে পরিণত হয় তাকেই জীবাশ্ম বা ফসিল বলে। তখন আমি মলাটের ওপর বইটির নাম দেখলাম। বইটির নাম The Last Days of Pompeii - ইটালীতে ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির সেই ভয়াবহ উত্তপ্ত লাভা উদগীরণের কাহিনী। ছোট আকারে পাঠ করেছিলাম যখন ছোট ছিলাম। ৭৯ খ্রীস্টাব্দে ছাই ভস্ম লাভা মাথায় নিয়ে এই পম্পেই নগরী তার আশ পাশের নগর সহ মৃত্তিকার গভীর অভ্যন্তরে অগ্নি সমাধিতে হারিয়ে যায়। পুনরায় ১৬৫০ সালের দিকে মানুষ তার সন্ধান পায়। এই ঘটনার উপর লিখিত গ্রন্থটিই The Last Days of Pompeii, দীর্ঘকাল মানুষের চৈতন্যে দারুণ ভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেই বিখ্যাত পুস্তকটি আমার বাবার টেবিলে দেখেছিলাম কয়েকবার। 
তিনি খুব পড়ুয়া ছিলেন এবং আমাদেরকে ভাল ভাল বই পড়ার জন্য উৎসাহ দিতেন। মাঝে মাঝে প্রশ্ন করতেন গল্পের সারমর্ম কি। মাসিক মোহাম্মদী, সওগাত ইত্যাদি ম্যাগাজিন বাড়িতে রাখতেন। মাঝে মাঝে নান্দিনা স্কুলের বার্ষিক ম্যাগাজিনও দেখেছি। তার নাম ছিল The Cosmopolitan. তখনকার দিনের তুখোড় শিক্ষকদের মূল্যবান লেখা এবং মেধাবী ছাত্রদের ভাল ভাল গল্প, প্রবন্ধ ও কবিতা ছাপা হতো সেই বার্ষিকীতে। আমি যখন উচ্চ শিক্ষায় ব্রতী তখন নান্দিনা স্কুলের ছাত্রদের ইংরেজী লেখার স্টাইল এবং স্ট্যান্ডার্ড দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছি।
লেখা এবং পড়ার অভ্যাস আমাদের বাড়িতেই গড়ে উঠে। আমার মাতাও সময় পেলেই সেসব বইপত্র পড়তেন এবং তিনি একজন বিদূষী মহিলায় পরিণত হন।   
আমার পিতা একজন দূরদর্শী এবং কর্মঠ ব্যক্তি ছিলেন। তখনকার দিনে আমাদের পোস্ট অফিস ছিল কাশীগঞ্জে। আমাদের ইউনিয়নের একেবারে শেষ সীমানায় ক্ষীরু নদীর তীরে। সেটি ছিল আমাদের এলাকা থেকে অনেক দূরে, দক্ষিণে। চিঠিপত্র বিলি করা ছিল পিয়নের জন্য এক দুরূহ কাজ ।  সেজন্য আমার পিতা নিজের বৈঠকখানার বারান্দায় একটি পোস্ট অফিস স্থাপন করেন। সেটিকে বলা হতো Donor’s post office. তার নামকরণ করা হলো হরিরামপুর ডাকঘর। সরকারী অনুমোদনের প্রেক্ষিতে সেটি স্থাপিত হয়েছিল। শিক্ষার আলো বিস্তারের জন্য একটি হাইস্কুল স্থাপন করেন নিজ গ্রামে। যেহেতু তিনি ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ছিলেন সেজন্য বিদ্যালয়টির নাম করেন আমাদের প্রিয় নবীজীর নামে – মোহাম্মদপুর হাইস্কুল, হরিরামপুর। সেই সময়ে ছেলেরাই এই স্কুলে পড়াশুনা করতো। পরবর্তীতে বিদ্যা শিক্ষা প্রসারের ফলে মেয়েরাও এই স্কুলে ভর্তি হতে শুরু করে। আজও এই বিদ্যালয় থেকে ছাত্র ছাত্রীরা এস.এস.সি. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হচ্ছে। এই হাইস্কুলকে ঘিরে তিনি একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। তার নাম নয়া বাজার। এর পূর্বে অত্র এলাকায় কোন হাট বাজার ছিল না।
স্কুল কমপ্লেক্সের ভিতরেই গ্রামের উন্নতির জন্য Multi purpose Co–operative Society গঠন করেন। চাষীদের উন্নতির জন্য seed স্টোর (বীজ কেন্দ্র) স্থাপন করেন। নিজের বাড়ি হতে সেই পোস্ট অফিসটিও এই কমপ্লেক্সে স্থানান্তর করেন। তার সরকারী নাম হরিরামপুর পোস্ট অফিস –কভায়া  ত্রিশাল। এটি আবার পাকা ঘর পায় এবং পায় উপযুক্ত স্থান -সকলের  সুবিধামতো জায়গায়। 
আমার পিতার আরেকটি উল্লেখযোগ্য কীর্তি হচ্ছে ইউনিয়ন বোর্ড স্থাপন। এ কাজটি স্থাপন করতে গিয়ে তাকে বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। কারণ ইউনিয়ন বোর্ডের নাম ছিল ৭নং সাখুয়া ইউনিয়ন বোর্ড। এটিও অত্র এলাকার একেবারে উত্তর সীমানায় অবস্থিত। এই ইউনিয়ন বোর্ডে যাতায়াত করা বহুলোকের জন্য কষ্টকর ও দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার ছিল। রাস্তাঘাট মোটেই ভাল ছিল না। বিদ্যুতের তো প্রশ্নই নেই। সাখুয়া ইউনিয়ন দ্বিধাবিভক্ত করে বর্তমান ৭ নং হরিরামপুর ইউনিয়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেন।  তিনি দীর্ঘকাল বারবার এই ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসাবে নির্বাচিত হয়ে এলাকার প্রভুত উন্নতি সাধন করেছিলেন। 
ঐ এলাকায় সেই ব্রিটিশ আমলেই রাস্তাঘাট নির্মাণ করিয়েছিলেন। আইন অনুসারে রাস্তার পাশে বৃক্ষ রোপন করে সীমানা নির্ধারণ এবং শ্রীবৃদ্ধি করেছিলেন। মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য বাড়ির পাশেই নিজের জমিতে একটি মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন। ছোট ছোট ছেলেরাও ঐ মক্তবে পড়তে যেত। এই মক্তবের চেয়ার–টেবিল, বেঞ্চ, ব্ল্যাক বোর্ড সবই তিনি নিজের  উপার্জনের পয়সায় নির্মাণ করেছিলেন। বাড়ি  বাড়ি ঘুরে অভিভাবকদের অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে মেয়েদেরকে স্কুলে আসার ব্যবস্থা করেছিলেন। একজন মৌলবী সাহেব আরবী পড়াতেন এবং ধর্ম শিক্ষা দিতেন। তার নাম ছিল মৌলবী মহর আলী। আরেকজন বাংলা মাস্টার সব বিষয়ে পাঠদান করতেন। আমার ভাই বোনদের এবং অন্যান্য কৃতি ছাত্রদের ঐ মক্তবেই হাতে খড়ি। এই মক্তব আজ থেকে প্রায় ৮০ বৎসর পূর্বে স্থাপিত হয়েছিল। সেটা সম্ভবত ১৯৩৩ সাল হবে। ঐ স্কুল এবং তার স্মৃতি আজও ঐ অঞ্চলে একটি আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলছে। স্কুলটি বর্তমানে আমার মায়ের নামে সরকারি করণ করা হয়েছে। স্কুলটির নাম জুবাইদা ফিরোজা সরকারি প্রাইমারি স্কুল - হরিরামপুর, ত্রিশাল। এটি এখন আমাদের বাড়িতে অবস্থিত। সরকারি প্ল্যান অনুযায়ী দুটি পাকা দালানে ক্লাস চলছে। 
আমার পিতা সারাজীবন মানুষের উপকার করে গেছেন। কুসংস্কারাচ্ছন্ন, পশ্চাতপদ মানুষদেরকে আলোকিত পথে আনার কাজে ব্রতী ছিলেন। এলাকার ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, চাকুরী, প্রমোশান, অসুখ – বিসুখে বা যেকোন প্রকার ঘটনায় দুর্ঘটনায় তিনিই তাদের পথ প্রদর্শক ছিলেন। বাধা বিপত্তি যে তাঁর ছিল না তা নয়। ইর্ষাপরায়ণ ব্যক্তিরা তাঁর বিরুদ্ধাচারণ করতো। কিন্তু তিনি ছিলেন নির্ভিক চরিত্রের অধিকারী। তিনি বলতেন, ‘আল্লাহ্‌ ব্যাতীত আর কোন শক্তির নিকট আমি মাথানত করিনা।’
তিনি কখনও অন্যায়ের নিকট মাথানত করেননি। সৎ, কর্মঠ, সাহসী এবং ধর্মপরায়ণ এই ব্যক্তিটি সমাজের কল্যাণে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত নিজেকে উৎসর্গ করে গিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন কেবল নিজের মঙ্গল হলেই চলবে না, সকলকে নিয়ে সৎ পথে, শিক্ষার পথে, শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে চলতে হবে। 
তিনি যেহেতু শৈশবেই পিতৃহীন ছিলেন, তাঁকে পথ প্রদর্শন করবার মতো কেউ ছিল না। তিনি একাই আলোকিত পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেন। এলাকায় আজও তিনি একটি প্রদীপ শিখার মতো। একাই সংগ্রাম করে শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছেন এবং তা বিতরণ করেছেন। পশ্চাতপদ সমাজে সকল বাধা অতিক্রম করে তিনি মানুষের কল্যাণে দৃপ্ত পদভরে এগিয়ে গিয়েছেন। তাই তাঁর  জনপ্রিয়তাও ছিল অসাধারণ। এই নির্ভিক, সৎ এবং প্রচন্ড দাপটের মানুষটির প্রজ্জ্বলিত বাতিঘরটি আজও মানুষকে পথ দেখাচ্ছে। 
আমরা ভাইবোনেরা এমন একজন মানুষের সন্তান হিসাবে গর্ব বোধ করি। শেষ জীবনে তিনি গ্রামের বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। ১৯৮৫ সালের ২৩শে জুন তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। গ্রামের মসজিদের পাশেই ‘শতাব্দীর অগ্নিপুরুষ অনন্ত শয়ানে’ তাঁর পারিবারিক কবরস্থানে শায়িত আছেন। আমরা তাঁর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করে চলি। মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে তাঁর আত্মার শান্তির জন্য প্রতিদিন প্রার্থনা করি। তিনি নেই। কিন্তু তাঁর কীর্তি, স্থাপনা, আদর্শ আজও আলোর শিখার মতো আজকের প্রজন্মকে পথ দেখাচ্ছে।
.........
১১.১১.২০১০              





Tuesday, March 10, 2026

স্মৃতিচারণমূলক - সেই হাতখানি

এপ্রিলের মাঝামাঝি এক সোনালী সন্ধ্যায় আমরা সৌদি এয়ার লাইন্সের এক বিমানে চড়ে মক্কা শরীফের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বহুদিন মনে ছিল আশা যদি মক্কা মদিনা যেতে পারতাম। সুযোগ এলো। আমাদের আত্মীয়, আমাদের আত্মীয়  ড. আবু তাহের জানালেন, ‘ওমরাহ্‌ ভিসা দিচ্ছে। আপনারা এবার আসেন। ’  তিনি মক্কা শহরেই চাকুরী সুবাদে বসবাস করতেন।

প্রায় ছয় ঘন্টা আকাশযানে  ভ্রমণ করে জেদ্দা বিমান বন্দরে পৌঁছালাম। বন্দর সংলগ্ন এক বিশাল বিল্ডিং-এ প্রবেশ করে দেখি দীর্ঘ লাইন। বাঙ্গালী যাত্রীর সংখ্যা অধিক। একজন বললেন, ঐ যে ওমরাহ্‌ যাত্রীদের লাইন –সকলের পরিধানে ইহরামের পোশাক। সেখানে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হলো।  সামনে  চারটি কাউন্টার। সৌদি ছেলেরা যাত্রীদের পুলসিরাত পার হওয়ার ছাড়পত্র দিচ্ছে। গতি তাদের বেশ মন্থর। আমরা দীর্ঘ লাইনে। তবে আমি আমার স্বামীর পাশে দাঁড়ানো। একটু পর লক্ষ্য করলাম আমার সামনেই একজন  মহিলা তার সঙ্গীর পাশে আমার মতই দাঁড়িয়ে। একটু পর পর আমাকে দেখছেন। আমার ছিল আপাদমস্তক কালো বোরখা এবং হিজাবে আবৃত। তার ছিল কালো বোরখা এবং সাদা হিজাব। সালাম বিনিময় করে জিজ্ঞেস করলাম –where do you come from? 

বললেন, সাউথ আফ্রিকা। 

আমি বললাম, আমার দেশ বাংলাদেশ। নাম শুনেছেন কখনও? 

উনি বললেন, হ্যা শুনেছি। আমরা তো পাকিস্তানে ছিলাম। আমি আগে হজ্ব করে গিয়েছি। এবার এসেছি উমরাহ্‌ করতে।

আমি বললাম, আমরা এবারই প্রথম উমরাহ্‌ করতে এসেছি। এরকম অল্প–স্বল্প বাক্য বিনিময়ের পর দেখি আমরা লাইনের অনেক পেছনে। তারপর হঠাত্ দেখি বাঁ দিকে একটু দূরে মহিলাদের একটি লাইন।  আমার পাসপোর্ট নিয়ে আমিও  গিয়ে ঐ লাইনে সামিল হই। সাথে সেই ভদ্রমহিলাকে ডাকলাম। তিনিও তার পাসপোর্ট নিয়ে আমার সঙ্গে দাঁড়ালেন। আমার টার্ন এলো ভেতরে ঢুকবার। ঘূর্ণায়মান নাতিউচ্চ গেইট অতিক্রম করে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। পাসপোর্টটি আমার হাত থেকে নিয়ে সৌদী ছেলে বললো, বেঙ্গালাদেশ? আমি সেই মহিলাকে ইশারায় ঢুকে পড়তে বললাম। আমাকে কাগজ দেওয়া হলো কাউন্টার থেকে। পথ নির্দিষ্ট করা আছে স্টিলের বার দিয়ে। এগিয়ে গেলাম পথ ধরে। পথপ্রান্তে কাগজটি জমা দিয়ে বেরিয়ে এলাম । সেই ভদ্রমহিলাও তার কাগজপত্র জমা দিলেন। আমার আর তাকে দেখবার সুযোগ হয়নি। 

বিস্তীর্ণ হলরুমের এক জায়গায় মালপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। আমি আমার বড় বাক্স, ছোট বাক্স কুড়িয়ে নিয়ে ট্রলিতে তুলে আবার কাউন্টারের একটু দূরে অপেক্ষা করতে থাকলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর আমার স্বামী মোহাম্মদ হারুন বের হয়ে এলেন। বিমান বন্দরে পুনরায় পাসপোর্ট পরীক্ষা নিরীক্ষা করিয়ে নিতে আরো ঘন্টা খানেক সময় লাগলো। তারপর আমরা পার্কিং এলাকার দিকে রওনা হই। সঙ্গে ছিলেন আমাদের আত্মীয়  ডা. আবু তাহের। তার গাড়ি অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য। পার্কিং এলাকায় নামতেই কে যেন আমার হাত ধরে ফেললো। অবাক হয়ে দেখি সেই ভদ্রমহিলা, যিনি সাউথ আফ্রিকা থেকে এসেছেন। আনন্দে আমার ‘বক্ষ মাঝে চিত্ত আত্মহারা, নাচে রক্তধারা।’ দুজনে হাসতে লাগলাম। বললেন, ‘যাচ্ছেন?’

- হ্যা । মক্কা যাচ্ছি। আগামীকাল উমরাহ্‌  করবো। পরশু বিশ্রাম। তারপরের বুধবার মদিনা শরীফ যাবো। শুক্রবার দিন জুমার নামাজ পড়ে মক্কায় ফিরে আসবো। 

উৎসাহের  সঙ্গে বললেন, আমরাও মদিনায় যাবো। মসজিদে নব্বীতে জুমার নামাজ পড়বো। দেখা হবে আবার।

বললাম, ইনশাল্লাহ্‌, দেখা হবে। বলে হাতে আন্তরিকতার মৃদু চাপ দিয়ে হাতখানি ছেড়ে দিলাম। দ্রুত পায়ে সঙ্গীদের সঙ্গে সামিল হলাম। হাতখানি ছেড়ে দিয়ে কেন জানিনা অন্তরে একটু বেদনার অনুভূতির সঞ্চার হলো। একটু দেখা, দু’চারটি মামুলী কথা! এই তো! তার জন্য এতো মমতা? কি যেন কি হারাবার বেদনায় প্রাণটা আনচান করে উঠলো। ভাবনায় মগ্ন হলাম। মনে হলো এটাই মানুষের ধর্ম। একের অপরের জন্য সহমর্মিতা। মমতা হয়তো একেই বলে।  মানুষ এজন্যই আশরাফুল মখলুকাত। 

উমরাহ্‌ সম্পন্ন করে মদিনা শরীফে চলে  গেলাম। সেখানে দুদিন মসজিদে নব্বীতে নামাজ পড়লাম। নবীজীর  রওজা মোবারক জিয়ারত করলাম। কিন্তু সেই ভদ্রমহিলার দেখা আর পেলাম না। নামাজ ইবাদতে মগ্ন থাকার দরুণ মনেও পড়ে নাই। সেই  বিশাল জনসমুদ্রে কারও দর্শন লাভ করা এক দুর্লভ ঘটনা। 

মক্কায় ফিরে এসে আবারও উমরাহ্‌ করেছি। বিদায়ী তাওয়াফ করেছি। কিন্তু সেই অনামিকার সাক্ষাৎ লাভ আর হয়নি। দুঃখ আমার তার নামটিও জানা হয়নি। নামটি জানা থাকলে অন্ততঃ নাম ধরে তার কথা স্মরণ করতে পারতাম। নিজেকে বড় ক্ষুদ্র মনে হলো। কেন নামটি জিজ্ঞেস করিনি! তবুও সেই ক্ষণিকের ভাল লাগা মানুষটির কথা ঘুরে ফিরে স্মৃতিতে আসে। হাসি মাখা মুখখানি মনে পড়ে। আর একটিবার যদি দেখা পেতাম, নাম ঠিকানা জেনে নিতাম। নাম ধরে চিন্তা করতাম। তার কথা ভাবতাম। ঠিকানা ধরে যোগাযোগ করতাম। এই খেদ আমার কোনদিন ঘুচবে না।  এই মনোবেদনা আমাকে চিরকাল বয়ে বেড়াতে হবে। তিনি তার প্রস্ফুটিত হৃদয় কুসুমের সুবাসটুকু নামহীন, পরিচয়হীন আমার মতো একজনকে দিয়ে ঋণী করে রাখলেন। তাঁর হাতের পরশখানি ভুলতে পারিনা। তাই আমার স্মৃতির বীণায় আজও বাজে সেই প্রথম এবং শেষ দেখার রেশ।

.........
এপ্রিল, ২০১০

Sunday, March 1, 2026

স্মৃতিচারণমূলক - আমার শৈশব

 

বসন্তের বিকাল। বসে ছিলাম দ্বিতলের বারান্দায়। একখানি বই হাতে। নামে মাত্র পড়ার ভান করে তাকিয়ে ছিলাম সম্মুখপানে। সারাদিন ভ্রমন করে সূর্যি মামা ক্লান্তিতে ঝিমিয়ে পড়েছে। ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে দীপ্তি। নিভে যাওয়ার পূর্বে সে তার এই তেজহীন আভাকে রূপান্তরিত করেছে সোনালী আলোতে। আর সেই সোনালী আলো মাখিয়ে দিয়েছে সকল প্রকার মানুষের মনে। এরকম ভালো লাগার আমেজে সকলেই উৎফুল্ল। বেশী উৎসাহীরা খেলছে, নিরুৎসাহীরা খেলা দেখছে। সেই নিরুৎসাহীদের দলে আমি একজন। সামনের মাঠে ছেলেমেয়েরা খেলা করছে। তাই দেখছিলাম। মনে মনে ভাবছিলাম যদি ওদের সঙ্গে মিশে খেলা করতে পারতাম। আমি আসলে স্বার্থপর। অন্যকে আনন্দ দেবার চেয়ে নিজে আনন্দ উপভোগ করতে ভালবাসি। খেলোয়াড়গণ প্রাণপণ খেলে দর্শকদের দেয় অনাবিল আনন্দ। আর আমরা অনেক সময় তা দেখতেও যাইনা। এসব কথা ভাবতে ভাবতে সহসা মনে পড়ে গেল অতীতকে। আমরাও তো একদিন এমনি ছোটাছুটি করতাম। সব কাজে আগ্রহ ছিল প্রবল। আনন্দ পেতাম প্রচুর। এমনি ভাবে অতীতের প্রতিটি ঘটনা আজ মনের কোণে স্মৃতি হয়ে ভিড় করেছে। তারা যেন দীর্ঘকালের অদর্শণীয় প্রিয়জনকে পেয়ে কে কার আগে অভ্যররথনা জানাবে সেজন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। তাই হারিয়ে যাওয়া মধুর অতীতকে কৃত্রিম ভাবে পাওয়ার আশায় স্মৃতির খাতার পাতা উল্টাতে শুরু করলাম।  

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘প্রকৃতি ছিল মুক্ত, আমি ছিলাম বন্দী। তাই মুক্তর প্রতি বন্দীর আকর্ষণ স্বভাবতঃই প্রবল ছিল।’ কিন্তু আমার বেলায় প্রকৃতিও মুক্ত ছিল, আমিও ছিলাম মুক্ত। কাজেই বন্দি হিসেবে মুক্ত প্রকৃতির  প্রতি কতটুকু আকর্ষণ থাকতে পারে, সেরকম প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আমার নেই। আমি মুক্ত বিহংগের ন্যায় ডানা মেলে সীমাহীন প্রকৃতির কোলে স্বাধীনভাবে বিচরণ করেছি। 

যদ্দূর মনে পড়ে তখন আমার বয়স ছিল তিন বৎসর। বেশীর ভাগ সময়েই মায়ের কাছে থাকতাম। বাকী সময় আমার সমবয়সীদের  সঙ্গে মিলে মিশে খেলা করতাম। সেই ছোটবেলা থেকে আমি আমাদের দলের সর্দারি করতাম। ওরা সবাই আমার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতো। এভাবেই কেটে গেল আরো কিছু কাল। মায়ের নিকট থেকে বাধ্য হয়ে সরে আসতে হলো। আমাদের আশেপাশে কোন প্রকার স্কুল ছিলনা। আমাদের পড়াশুনার সুবিধার জন্য আমার পিতা বাড়ির পাশে একটি ঘর তৈরী করেন। তিনি নিজের সাধ্যমতো স্কুলের আসবাবপত্র ক্রয় করেন। তারপরেই একজন সুযোগ্য মৌলভী সাহেবকে শিক্ষক হিসাবে নিযুক্তি প্রদান করেন। তার নাম ছিল মোহর আলী। আমার বাবা গ্রামের প্রত্যেকের ঘরে ঘরে গিয়ে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে ছাত্রী জোগাড় করে এই স্কুল আরম্ভ করেন। ক্রমেই এই স্কুলে পড়াশুনা করবার পালা পড়লো আমাদের দলের।  আমরাও স্কুলে গেলাম। ভর্তি হওয়ার কোন রেওয়াজ ছিলা না সেই সময়ে। আমি খুব ছোট থেকেই স্কুলে যেতাম। কারণ স্কুলটি ছিল বাড়ির পাশেই। পড়াশুনা করতাম কি না মনে নেই। তবে ইংরেজী বর্ণ পরিচয়ের কথা মনে আছে। ছোট একটি বই টানা টানা বড় বড় অক্ষরে পূর্ণ ছিল। তাদের নীচে আবার বাংলায় উচ্চারণ লেখা ছিল। যেমন ‘C’ এর নীচে ‘ক’, ‘G’  এর নীচে ‘গ’ ইত্যাদি। উর্দূ বর্ণ পরিচয়ের কথাও বেশ মনে আছে। আরবী থেকে একটু আলাদা। নিজেরা কালো কালি্ প্রস্তুত করে বাঁশের কঞ্চির কলম অথবা পাখির পালকের কলম দ্বারা কলা পাতায় মোটা মোটা করে যথাসাধ্য সুন্দর উর্দু অক্ষর তৈরী করতাম। তখন আমার লেখাই সবচেয়ে সুন্দর হতো। তাছাড়া পড়াশুনার দিক দিয়ে আমি অন্যদের চাইতে ভাল ছিলাম। 

আমাদের বাড়ির সকলেই পড়াশুনা জানতো। কিন্তু অন্যদের বাড়ির সবাই লেখাপড়া জানতো না। কেবল স্কুল ছাড়া ওদের পড়া লেখাপড়ার চর্চা ছিল না। আমি বাড়িতে অন্য কাজে ব্যস্ত থাকতাম না। স্কুলের বই নিয়ে পড়াশুনা করতাম। সেজন্য আমার সমবয়সীরা আমাকে তাদের চেয়ে বড় করে দেখতো এবং আমাকে খুব ভালবাসতো। আমিও প্রতিদান দিতে কার্পণ্য করতাম না। পড়ালেখায় সাহায্য করতাম। স্কুলের শিক্ষক মৌলবী সাহেব আমাকে খুব স্নেহ করতেন। শহর থেকে যারা স্কুল পরিদর্শন করতে আসতেন তারাও আমার খুব প্রশংসা করে যেতেন। মোটামুটি এই ছিল আমার একদম ছোটবেলার স্কুল জীবনের কথা। 

শৈশবের বেশীর ভাগ সময় কাটতো খেলাধুলায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে হাত মুখ ধুয়ে  কাপড় জামা পরে নিতাম। যদি বাবা কিম্বা আমার ভাইয়েরা কেউ বাড়িতে থাকতেন, তাহলে খুব চিৎকার করে ছোট ছোট গল্প পড়ে ফেলতাম। ছড়া ও কবিতাও সুর করে আবৃত্তি করতাম। আর যদি শাসক শ্রেণীর কেউ বাড়িতে না থাকতো, তবে আমি রাম রাজত্ব পেয়ে যেতাম। সকালেই সব বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে যেতাম। আমাদের আড্ডা হতো ঐ স্কুল ঘরে। তাছাড়া স্কুলের পেছনে বাগানের আনাচে কানাচে ছিল আমাদের খেলা ঘর। ছোট ছোট ঘর। সেখানে আমরা সর্বপ্রকার বিদ্যা – যতরকম খেলাধুলা সম্ভব – সব অনুশীলন করতাম। আমরা সব কাজে পাকা হয়ে উঠেছিলাম। পনের ষোলজন মেয়ে দিনের বেশীর ভাগ সময়ে একত্রে কাটাতাম। আমাদের পাড়া থেকে যারা একটু দূরে থাকতো তারা মাঝে মাঝে আমাদের দর্শন দিয়ে আনন্দ দিয়ে যেত।  

আমরা সেখানে ধুলাবালি দিয়ে ছোট ছোট মাটির হাঁড়ি বাসন যোগাড় করে ভাত রান্না করতাম। রাঙ্গা মাটি দিয়ে হলুদ, নানাপ্রকার ঘাসফুল দিয়ে লবঙ্গ, কাঁচামরিচ, গুলমরিচ তৈরী করতাম। মান্দারের লালফুল শুকিয়ে শুকনামরিচ তৈরী করে রাখতাম। মান্দারের গাছে যে ফল হয় তা শিম হিসাবে রান্না করা হতো। কলা পাতার ডাঁটা দিয়ে গরু, ছাগল বানিয়ে সেগুলো জবাই করে নানাপ্রকার মশলার মিশ্রণে কোরমা, কালিয়া তৈরী করতাম। হলুদ মাটি জলের সঙ্গে মিশিয়ে সেটা ডাল হিসাবে রান্না করা হতো। ঘৃতকুমারী পাতার ঘন রস দিয়ে সবুজ দই তৈরী হতো। তারপর গৃহিনীপনা শেষ করে সব্বাই গোসল করতে যেতাম, জলহীন ঢালু জমিকে পুকুর কল্পনা করে।   মনের সুখে আমরা সেখানে কল্পনা–সাগরে  সাঁতার কেটে আনন্দ পেতাম। স্নান সমাপনান্তে সুন্দর পোশাক পরে খাবার খেতে বসতাম। একপ্রকার অদ্ভুত শব্দ করে পরম তৃপ্তির সঙ্গে খাওয়া দাওয়া শেষ করে খুব তাড়াহুড়ো করে আমাদের কৃত্রিম স্কুলে হাজির হতাম। ঐ স্কুলের মাস্টার ছিলাম আমি। ওরা আম, কাঁঠাল আর তালের পাতা নিয়ে পড়া শিখতে বসে যেত। পড়া না পারলে খুব করে আমাদের মৌলবী সাহেবের মতো শাসাতাম। ঐ ক্ষুদে মাস্টার সেজে আমি খুব গম্ভীর হয়ে বসতাম। ওরা আমাকে সত্যিকারের মাস্টারের মতো মেনে নিত। তারপরে খুব জোরে জোরে ‘শতকিয়া, কড়াকিয়া’ পড়িয়ে ছুটি দিয়ে দিতাম। 

ছুটি পেয়ে সবাই যার যার বাড়ি গিয়ে খাওয়া দাওয়া করে হরিরামপুর ভাটিপাড়া বালিকা মক্তবে এসে হাজির হতো। মক্তবটি ছিলা আমদের বাড়ির পাশেই। আমিও ওদের সঙ্গী। ওদের তুল্নায় আমার বই–খাতা বেশী ছিল। সবগুলো বই–খাতা, শ্লেট–পেন্সিল স্কুলে নিয়ে যেতাম।  আমার বই–পত্র আমার বন্ধুরাই রোজ নিয়ে যেত। আমি কেবল কোরান শরীফখানি বুকে চেপে ধরে নিয়ে যেতাম। স্কুল ছুটি হলে ওরা আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে নিজেদের বাড়ি চলে যেত। খুব দ্রুত দক্ষিণ হস্তের কর্ম সমাপন করে আমাদের বাড়ি চলে আসতো। আমাদের বহির্বাটির উঠোনে পুরোদ্যমে আমাদের খেলাধুলার কার্যক্রম শুরু হয়ে যেত। আমাদের ছোট ছোট ক্ষেত ছিল। সেই ক্ষেতে চাষ করে নানারকম শস্য লাগাতাম। অন্যন্য চাষীরা যেরকম শস্য রোপণ করে আমরাও তাই করতাম। ছোট পুকুর বানাতাম। কলার খোলের দোন দিয়ে পুকুর থেকে পানি তুলে সেখানে মাছ ছেড়ে দিতাম। যদিও ছোট ছোট মাছ। 

বিকেল বেলায় খেলাধুলায় মেতে থাকতাম। প্রতিদিন বিকেলে পাড়ার সব ছেলেমেয়েরা খেলার মাঠে হাজির থাকতো। দাড়িয়া –বান্দা, গোল্লাছুট, হাডু-ডু, লুকোচুরি ইত্যাদি অনেক খেলাই আমরা খেলতাম। অনেকদিন ফুটবলও খেলতাম। ছোট রবারের বল দিয়ে ফুটবল খেলার আনন্দ পেতাম। ব্যথাও পেয়েছি পড়ে গিয়ে। নানারকম বিচিত্র খেলা, খেলা হতো। সেগুলো ছিল আমাদের নিজেদের আবিষ্কার। অনেক সময় খেলতে খেলতে মিছেমিছি রাত হয়ে যেত। তখন আমরা কলাপাতা বিছিয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম।   

আমাদের খেলাঘরটি ছিল তখন বিরাট এক কাঁঠাল গাছের গোড়ায়। বড় বড় শিকড়ের দু’পাশে সে সব খুব সুন্দর করে লেপে পরিষ্কার করে রাখতাম। আমরা যখন ঘুমাতাম আমাদের  সংগীদের  কেউ চোর সেজে শিকড়ের নীচ দিয়ে সিঁদ কেটে পুতুলের কাপড় –চোপড়, থালা বাসন চুরি করে  নিয়ে যেত। আমরা যথাসময়ে ‘চোর চোর’ বলে  চিৎকার করে ছুটে যেতাম। অনেক আয়াশে বেচারাকে ধরে নিয়ে আসতাম। তখন আমি হতাম দারোগা। আমার কাছে চোরকে ধরে নিয়ে আসতো। আমি ওদেরকে কাঠগড়ায় কোন গাছের শিকড়ের গোড়ায় দাঁড় করিয়ে  সাক্ষী  নিতাম। তারপর ন্যায় বিচার করে অপরাধীকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিতাম  বা দীপান্তরে পাঠাতাম বা কমপক্ষে বিশ বছরের জেল খাটার ঘোষণা দিতাম। সকলে মিলে ওকে অর্থাৎ চোরকে ধরে  বাড়ির উত্তর দিকের জঙ্গলে রেখে আসতাম। কতক্ষণ সে শাস্তি ভোগ করতো তারা, সেটাও মজার বিষয় ছিল। কারণ চোরের সঙ্গে চৌকিদারের ও সাজা হতো।  ঘুমন্ত পুরীর শান্তি রক্ষায় ব্যর্থতার জন্য তারও নিস্তার ছিলনা। 

আমরা ডাক্তারীও করতাম। ‘জিগার’ গাছের আঠা অনেক সময় সিরিঞ্জের আকারে গাছ থেকে পড়তো। সেগুলো সংগ্রহ করে গ্রামে সকলকে মিছেমিছি কলেরার ইনিজেকশান, বসন্তের টিকা দিয়ে দিতাম। সকলেই বলতো ‘উহ্‌ কি ব্যথা।’ আমাদের দোকানও ছিল। ভাঙ্গা কাঁচ চিনামাটির টুকরা দ্রব্য বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহৃত হতো। মাটির বাসনের টুকরাগুলো এক পয়সা ধরে নিতাম। পুতুলের শাড়ি, জামা, আমসত্ত্ব, কাঁচা আম আর লবণ, নানারকম মসলা, লাল মাটির গুড় প্রভৃতি বিক্রির দ্রব্য ছিল। লাভ হতো প্রচুর! গ্রামের লোকেরা আমাদেরকে গুড়, মুড়ি, পিঠে দিয়ে আপ্যায়ন করতো। আমরা বিদেশের সাথেও ব্যবসা করতাম। কাগজের নৌকা, কলার খোলের নৌকা তৈরী করে তাতে নানাপ্রকার দ্রব্যাদি দিয়ে ধান, চাউল, পাট, মসলা প্রভৃতি বিদেশে রপ্তানী করতাম। বৈদেশিক বাণিজ্য আমাদের ভালই চলতো। কারণ পুকুরের অপর পাড় থেকে আরেকদল মেয়ে আমাদেরকে তাদের মালামাল পাঠাতো।

কৃষকের বাড়ির উদ্বৃত্ত ছন, খড় দিয়ে ছোট ছোট ঘর তৈরী করতাম। পাট খড়ি দিয়ে ঘরের বেড়া দেওয়া হতো। চূন দিয়ে ঘরের মেঝেতে নানারকম কারুকাজ করা হতো। পাটের তৈরী শিকা ঝুলিয়ে তাতে হাড়িপাতিল  সাজিয়ে রাখতাম। পুতুলের জন্য খাট প্রস্তুত করে সেখানে সুসজ্জিত শয্যা পাতা হতো। চিকন তার দিয়ে পুতুলের অলংকার  এবং শাড়ি কাপড় বানিয়ে তাদেরকে মনের মতো সাজাতাম। সোনার খাটের পুতুলেরা সম্ভবত মনের সুখে ঘুমের দেশের স্বপ্ন দেখতো। মৌচাক থেকে মোম সংগ্রহ করে সেগুলো দিয়ে ওদের ঘরে প্রদীপ জ্বেলে দিয়ে আসতাম। পুতুলের জন্য পালকি ছিল। এবাড়ীর পুতুল ও বাড়ীতে বিয়ে দিয়ে আত্মীয়তা স্থাপন করতাম। 

আমরা হাট বসাতাম। সেখানে  জিনিসপত্র বেচাকেনা হতো। আমরাই ক্রেতা, আমরাই বিক্রেতা।  পুতুলের জন্য সুন্দর সুন্দর শাড়ী, অলংকার বাজার থেকে কিনে আনতাম। আমাদের যানবাহনের অভাব ছিল না। আমরা সুপারীর খোলে অথবা কলা গাছের খোলে পালকি তৈরী করতে পারতাম। সুপারীর খোলে একেক জন উপবেশন করতো এবং বাকীরা খোলের পাতার গুচ্ছ ধরে টেনে পাড়াময় ঘুরে আসতো। আমরাই যাত্রী আমরাই বেহারা। বাদল দিনে কখনো গাছ পড়ে যেত ঝড়ে। সেই গাছকে ট্রেন বানিয়ে ফেলতাম। সেই ট্রেনে চড়ে আমরা ঢাকা অথবা ময়মনসিংহ চলে যেতাম। গাছের ডালে ঝাকুনী দিয়ে দিয়ে সকলে মিলে ঝিক ঝিক শব্দ করে শহরে বেড়াতে যেতাম।     আরো বলতাম ‘ঢাকা যাব টাকা পাব, যতই যাব, ততই পাব।’ আনন্দের আতিশয্যে নাচানাচি করতে করতে কেউ কেউ গাছ থেকে ছিটকে পড়েও যেত। ডাক্তার সেজে আমরা তার চিকিৎসা ও সেবা দিতাম। আমাদের সকলেরই ঘুড়ি ছিল। প্রতিদিন বিকেলে আমরা ঘুড়ি উড়াতাম। ঘুড়িতে সুন্দর সুন্দর করে নাম লিখে রাখতাম। খুব আনন্দের সঙ্গে ঘুড়ি সূতার সঙ্গে প্যাচ লাগিয়ে বকাট্টা করে চিৎকার করে উঠতাম। এত আনন্দ আর আনন্দ - রাখবো কোথায়!

আমরা যেখানে থাকতাম সেখানকার ক্ষুদ্র এবং বৃহৎ প্রতিটি বস্তুর সঙ্গে আমাদের পরিচয় ছিল। সর্বপ্রকার পাখির বাসায় আমাদের যাতায়াত ছিল। পাখির ডিম থেকে শুরু করে যে পর্যন্ত বাচ্চা না উড়তে পারে, সে পর্যন্ত প্রত্যেক দিন আমরা দল বেঁধে গিয়ে চুপিচুপি পাহারা দিয়ে আসতাম। টুনটুনি পাখিরা গাছ গাছালীর ঝোপের আড়ালে দুটি বড় পাতা একসঙ্গে করে তূলা দিয়ে আটকিয়ে বাসা তৈরী করতো। এই পাখির ইংরেজী নাম টেইলার বার্ড। এই পাখির ডিম হালকা সবুজ রঙের। ছোট ছোট ডিম। দেখতে খুব সুন্দর। একবার একটি ঘুঘু পাখির ছানা ধরে নিয়ে এসেছিলাম। কয়েকদিন রাখার পর আমার আসর্তকতার দরুণ উড়ে গিয়েছিল। সেদিন পাখিটার জন্য খুব দুঃখ পেয়েছিলাম। যত্নের কোন ত্রুটি ছিল না। তবুও সে চলে গেল। ভেবেছিলাম ছানাটির কথা জীবনেও ভুলবো না। কিন্তু সেই মুক্ত ধর্মীয় পাখি শাবককে বন্দী করে রাখলে, তার কি দুঃখ হতো, তা তিলে তিলে উপলব্ধি করেছি। বনের পাখিকে খাঁচায় বন্দি করে রাখা উচিৎ নয় । তার জগৎ আকাশ, বাতাস, বৃক্ষরাজি। আমার গৃহের সুদর্শন খাঁচা নয়। এ সত্যটি অনুধাবন করে আমার সারাজীবনের জন্য একটি শিক্ষা লাভ হলো -বন্যেরা বনে সুন্দর।

আমার গাছে চড়ার ঝোঁক ছিল বেশী রকম। বাড়ির আশে পাশে এমন কোন গাছ নেই, যে গাছের শিরে আমি হাত দিয়ে আশীর্বাদ করিনি।  ঝড় বৃষ্টির দিনে যখন মৌলবী সাহেব ক্লাসে ঘুমিয়ে পড়তেন, তখন আমরা সেই ফাঁকে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যেতাম। আম, জাম, কুল, তেঁতুল ইত্যাদি নিয়ে ফিরে আসতাম। অন্য মেয়েরা মৌলবী সাহেবকে বলে দিত। কিন্তু মৌলবী সাহেব আমাদেরকে মৃদু তিরস্কার ছাড়া আর কিছুই করতেন না। আমরা তখন শান্তশিষ্ট অথচ লেজ বিশিষ্ট প্রাণী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। সেদিন বাড়ি ফিরে মায়ের বকুনিওঃ খেতে হতো নির্ঘাৎ। বৃষ্টির দিন ব্যতীত দোলনা তৈরী করে আমরা পালাক্রমে দোল খেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যেতাম। 

এই তো গেল স্কুলে আধিপত্যের বিবরণ। এবার এলাম জলে। জলের নীচে প্রাণীরাও আমাদের খেলার শিকার হতো। মাছ ধরতে আমি খুব ভালবাসতাম। আমার  বড়শিতে বেশী মাছ ধরে বলে আমার তখন খুব সুনাম। কারো বড়শিতে মাছ না ধরলেও আমার বড়শিতে একটি হলেও মাছ ধরা পড়তো। মৎস্য শিকারে ব্যক্তি বিশেষের কোন গুণ থাকতে পারে বলে আমি আজও বুঝতে  পারিনা। তবে মাছ ধরার আনন্দ আছে। 

সাঁতারেও আমি ছিলাম পটু। সন্তরণ প্রতিযোগিতায় আমি ছিলাম সকলের অগ্রভাগে। সেজন্য আমাদের মনের তৃপ্তি আর দর্শকদের হাত তালি মিলতো প্রচুর। ডুবের বেলায়ও আমি আগে। আমার সঙ্গে কেউ পেরে উঠতো না। প্রস্থের দিক দিয়ে এক ডুবেই পুকুর পার হতে পারতাম। কি যে রোমাঞ্চকর ছিল সেই সব ডুব সাঁতার খেলা। আজ তা কল্পনার অতীত মনে হয়।

অনেক সময়ে ব্যাঙ ধরে নিয়ে আসতাম। সেগুলোকে সিঁদুর পরিয়ে বিয়ে দিতাম। লোকে বলে ব্যাঙের বিয়ে দিলে বৃষ্টি হয়। আমরা সমস্বরে গান গাইতাম –আল্লা মেঘ দে, পানি দে, ছায়া দে রে তুই আল্লা মেঘ দে...। এই বিয়ের অনুষ্ঠানে গ্রামের লোকের জড়ো হয়ে আনন্দ উপভোগ করতো। একদিন হঠাৎ গুরু গুরু গরজনে আকাশ কালো করে বৃষ্টি নেমেছিল। সেদিন মনের আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েছিলাম সবাই। এ যেন ঝড়ে বক মরে, ফকিরের কেরামতি বাড়ে – আমাদেরও ঠিক তাই হয়েছিল।

এসব কর্মকান্ড ছাড়াও আমরা সুদক্ষ তীরন্দাজ ছিলাম। কিন্তু সুখের বিষয় কখনোও পাখি শিকার করিনি। কারণ ওসব হত্যা – চেষ্টা আমাদের ধাতে সইতো না। তীরের নিশানা ঠিক হলেই আনন্দ পেতাম। কলাপাতার ডাঁটা দিয়ে, দড়ি বেঁধে ঘোড়া তৈরী করে প্রতিযোগিতা চলতো। হার জিতের কোন ব্যাপার ছিল না। নিছক মজা কুড়ানোই উদ্দেশ্য ছিল।

বিকালে বাড়ী ফিরে পুকুরে হাত মুখ ধুয়ে পড়তে বসতে হতো। চিৎকার করে পড়তাম। ছড়া, কবিতা সুর করে পাঠ করতাম। খুব মজা করে মুখস্থ করে ফেলতাম। আনন্দের দিনটি শীঘ্র শেষ হয়ে যেত। রাত কখন শেষ হবে, কখন আবার সংগী–সাথীদের নিয়ে কর্মব্যস্ত হয়ে পড়বো সেই অপেক্ষায়, সেই আশায় ঘুমিয়ে পড়তাম।    

এমনি করে পৃথিবী নিজের কক্ষে ঘুরে ঘুরে সূর্যকে চার পাঁচবার প্রদক্ষিণ করে ফেললো। চেয়ে দেখি আমিও পৃথিবীর চক্রে পড়ে খানিকটা দূরে চলে এসেছি। সুতরাং সেই চিরমধুর সংগীদের ত্যাগ করে বেদনা বিধুর হৃদয় নিয়ে চলে এলাম শহরে,উচ্চশিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে। বান্ধবীরা পড়ে রইলো আমা হতে দূরে, বহু দূরে, সুদূর পল্লীতে। তাদের নেতা না থাকায় তারাও ক্রমে হয়ে পড়লো নিস্তেজ। তারা যে মণিহারা ফণী। ডানপিটে, দুরন্ত, গেছো মেয়ে ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ উপাধি স্বেচ্ছায় ত্যাগ করে বাংলাদেশের গৃহলক্ষী হিসাবে গৃহকোণে আশ্রয় নিল। এদিকে আমার অবস্থা হলো, ‘ফিশ আউট অব ওয়াটার।’ অথবা বলতে পারি রবীন্দ্রনাথের ছুটি গল্পের ফটিকের অবস্থা। 

এই দুর্দিন কেটে উঠতে আমার বেশ সময় লেগেছিল। স্কুলের এবং হস্টেলের মেয়েরা আমাকে খুব স্নেহ করতো। নতুন পরিবেশ। বলতে পারি উন্নত পরিবেশ তবুও আমার মন পড়ে রইলো সুদূর পল্লীতে। মায়ের কাছে, বান্ধবীদের কাছে। এই হস্টেলে এসে পড়লাম মাসীর হাতে। গ্রামের স্মৃতি পুরানো হয়ে এলো। কত সুখ –দুঃখের মধুর অতীত মনের মণিকোঠায় সঞ্চিত রইলো। আজ আমি উঁচু ক্লাসে পড়ি। পেছনে চেয়ে দেখি বাল্যসখীরা সব রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছে। তাদের শৈশবের আনন্দ, চাঞ্চল্য মরে গিয়েছে অলক্ষ্যে। তারা এখন পরের ঘর আলো করে সোনার বৌ। স্নেহময়ী জননী। সংসারের কর্ত্রী হিসাবে আঁচলে চাবির গোছা। অতীত তাদের হৃদয়ের কতখানি অংশ দখল করে আছে, তা আমার জানা নেই। আজিকার সাথে সেদিনের তুলনা করে দেখলাম মাঝে রয়েছে বিরাট ব্যবধান। কেবল কালের ব্যবধানই নয়, সবকিছু হতে ওদের থেকে  আমি অনেক দূরে চলে এসেছি। আর কোনদিন ফিরে গিয়ে বলা হবেনা, এইযে, আমি, আমি তোমাদের মাঝে ফিরে এসেছি, তোমাদের কেউ। ‘এ পথ যে চলার পথ, ফেরার পথ নয়!’

আমার অতীত ‘সব পেয়েছির দেশে।’ সেখানে ধন ধান্যে পূর্ণ ধরিত্রীর কোন কিছুরই অভাব নেই। অতীতকে কল্পনার রঙ্গিন তুলিতে রঞ্জিত করতে হয়না। সে আপনা হতেই রাঙা। আমার শৈশব স্মৃতির মনিমঞ্জুষা আমার হৃদয়ে। যদি কেউ আমার এ রঙিন স্বর্ণালী কাহিনী শুনতে চাও, তবে কোন এক গোধূলী লগ্নে আমার এই দ্বিতলের অলিন্দে আসার নিমন্ত্রণ রইল। 

..........

উৎসর্গ

 আমার পিতাকে যাঁর জীবনের পাথেয় ছিল আপোষহীন নীতি আর শৃঙ্খলা।   আমার মাতাকে ছেলেমেয়েদের মেধা ও মননশীলতায় যিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। আমার স্বামী...