Thursday, April 30, 2026

কথিকা -মহাকালের যাত্রায় একটি দিন

আজ ফেব্রুয়ারি মাসের ২ তারিখ। সাল ২০২২, অর্থাৎ দিনটি হলো ২.২.২০২২ তারিখ। আশ্চর্য্য বিন্যাসযুক্ত সংখ্যার সমাহারে তৈরী একটি দিন। মনে পড়ছে জীবনের বহু বছর এভাবে তারিখের সমাহার উপভোগ করেছি বন্ধুদেরকে চিঠি লিখে। প্রথম এই বোধটি আমার ভেতর জাগ্রত করে একটি মেয়ে তার নাম সেলিমা বেগম হেনা, বাড়ি দত্তের বাজার, গফরগাঁও। সেদিনটি ছিল ৬.৬.৬৬ মানে ৬.৬.১৯৬৬; খুব মজা পেয়েছিলাম। তারপর বহুবার এ চিঠি লেখার চর্চা ছিল। কিন্তু ‘মাঝে হলো ছাড়াছাড়ি, গেলেম কে কোথায়’, জীবনের শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ে গিয়ে আর তেমন লেখা হয়ে ওঠেনি। এবার জীবনের অস্তাচলের পথে এসে বারবার এরকম তৈরী দিনের কথা মনে পড়ে যায়। এখন তারা কে কোথায় কে জানে! আমার কথা তাদের মনে পড়ে কিনা কে জানে? দু’একজনকে মাঝে চিঠি দিয়ে সাড়া পাইনি।   

তখন মনে সন্দেহ জাগে– কেমন আছে তারা? সেই শান্ত দুরস্ত মেয়েরা। দাদী নানী হয়ে ঘর পাহাড়া দিচ্ছে নাকি ভবসাগর পাড়ি দিয়েছে কে জানে! আমারও অনেক বয়স। তবুও স্মৃতি অমলিন। ইচ্ছে করে আরেকটিবার কোথাও যদি ওদের সাথে দেখা হতো! সুখের দুখের কথা বলে প্রাণ জুড়াতে পারতাম। এমন সংখ্যার দিন তারিখ জীবনে আর আসবে কিনা জানিনা তবুও এই প্রচন্ড শীতের মাঝে  আমার লেখাটি আমার কথা ভবিষ্যতের মানুষের কাছে আমার কথা বলবে। আমি যে তাদের কেউ ছিলাম, সে কথাটি মনে পড়বে।

স্রষ্টার বাগান, এ পৃথিবী। ফুলে, ফলে, খাদ্যে, শস্যে, ধন রত্নে, বৃক্ষ লতায় পূর্ণ করে এই সব কিছু স্রষ্টা সৃষ্টি করেছেন মানবজাতি ও জীবজগতের জন্য। মানুষই হয়তো তা উপভোগ করে সবচাইতে বেশী। মানবজন্ম এক দুর্লভ জন্ম। এই জন্ম সকলের সার্থক হোক। সকলে আনন্দে বিষাদে এ জীবন পথ অতিক্রম করে সম্মুখ পানে এগিয়ে চলুক তার জয়রথ নিয়ে। মাঝে মাঝে এরকম সুন্দর তারিখ নিয়ে শুভদিন আসবে। তারা যেন দিনটিকে আনন্দের দিন হিসাবে উপভোগ করে। সময়ের স্রোতধারা আর ফিরে আসেনা। ‘চির স্থির কবে নীর, হায়রে জীবন নদে?’ 

আমার প্রিয় সব বন্ধুদেরকে আজকের দিনটিতে শুভেচ্ছা জানাই । যে, যে অবস্থায় আছেন আনন্দে থাকেন, সুখে থাকেন। ভবিষ্যত আমাদের ক্ষণস্থায়ী। অতীতের অর্জিত সুখ শান্তি নিয়ে ভবিষ্যতের পথে অগ্রসর হই। বিদায় বন্ধুরা। সকলে ভাল থেকো, সুস্থ থেকো। আবার যদি কোনদিন দেখা হয়, আনন্দ অশ্রু ফেলে কোলাকুলি করো। ভরসা করে বলো – আবার দেখা হবে, আবার কথা হবে। আবার শুভেচ্ছা জানাই সবাইকে – আজ ২রা ফেব্রুয়ারি, ২০২২ সাল। 

বিদায় – বিদায় বন্ধুরা। 

০২.০২.২০২২

Thursday, April 23, 2026

গল্প - বাদল বরিষণে

গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহে  যখন বিশ্ব চরাচর অগ্নিস্নানে দগ্ধিভুত হয়, বর্ষা নামে প্রকৃতির আশীর্বাদ হয়ে। তার শীতল জলধারা সকল তাপ-জ্বালা ধুয়ে মুছে শান্ত করে বিশ্ব চরাচর। বর্ষার শান্তির বারি সিঞ্চনে সিক্ত হয় প্রকৃতি, মানুষ এবং মানুষের চিত্ত। মেঘের ছায়ায় আশ্রয় পায় তৃষিত ধরণী আর তৃষ্ণার্ত মানুষের প্রাণ। এত সুখ আর এত শান্তি যেন কিছুতেই নেই। নবধারায় স্নাত মানুষের হৃদয় বাঙ্ময় হয়ে ওঠে। কবিত্বে ভর করে তার তনু-মন। ছন্দে, লয়ে আন্দোলিত হয় অন্তর। আনন্দে বিরহে সে হয় উদ্বেলিত। তার নম্রকন্ঠ বলে,

‘এমন দিনে তারে বলা যায়
এমন ঘনঘোর বরিষায়
এমন মেঘস্বরে-বাদল ঝরঝরে
তপনহীন ঘন তমসায়’

প্রিয় মানুষটির জন্য প্রাণ কেঁদে উঠে। বিরহে ব্যাকুল হয় অন্তর। মন বলে এখনি যদি তাকে কাছে পেতাম, খুলে  দিতাম অন্তরের ঝাঁপি; যে কথা কোনদিন তাকে বলতে পারিনি, আজ প্রাণ খুলে এই বর্ষণমুখর অন্ধকারে হৃদয়ের সকল দুয়ার খুলে প্রাণের সকল বারতা তাকে জানিয়ে দিতাম।

বর্ষণ মন্দ্রিত রাতে একা ঘরে, মেঘের গুরু গুরু গর্জনে নূপুর নামের মেয়েটি বারবার কেঁপে উঠে। সে বর্ষা ভালবাসে, মেঘ ভালবাসে। আজ তার বিরহি হৃদয় প্রিয় বিচ্ছেদের বেদনায় ব্যাকুল। বৃষ্টি ভেজা ছোটবেলার খেলার সংগী ছিল পাশের বাসার নিক্বণ। তার সংগে বৃষ্টিতে খেলা করতো। সে ছিল এক অন্তহীন সুখস্মৃতি। ধীরে ধীরে আরো সময় পেরুলো। নিক্বণ চলে এলো দেশের বাইরে।  আজকাল ফোন দূরত্বকে জয় করেছে। ফোনেই তারা দুজন দুজনকে কাছে পায়। আনন্দে সময় কেটে যায়। হঠাত একদিন নিক্বণের সাড়া পাওয়া গেল না। রাস্তায় একটি অ্যাকসিডেন্টে সে জ্ঞান হারায়। নূপুরের  বিশ্বাস হয়না এসব কথা। তারপর সত্যি সত্যি নিক্বণের ফোন এলো। খুব দুর্বল কন্ঠস্বর । নূপুর আশ্বস্ত হয়। কিন্তু কান্না আর থামেনা, বাদল ধারার সংগে পাল্লা দিয়ে চলে। বর্ষার কোন আনন্দের গানই এখন আর ভাল লাগেনা।  শুধু একটি গানই নিক্বণের উদ্দেশে গায়,

'এমনি বরষা ছিল সেদিন
শিয়রে প্রদীপ ছিল মলিন
তব হাতে ছিল অলস বীণ
মনে কি পড়ে প্রিয়! '

এমন সময় একদিন সাত সাগরের ওপার এক পরিষ্কার কন্ঠস্বর ভেসে আসে। শুভ জন্মদিন নূপুর। আজ তোমার জন্মদিন মনে আছে তো? তুমিও কাছে নেই বর্ষার কদমফুলও নেই। তবে একটি গান শোনাতে পারি। তোমার আপত্তি নেই তো?

নূপুর কেঁদে ফেলে। আবেগ জড়িত কন্ঠে বলে, গাও প্লিজ, গাও লক্ষীটি!

'এসো হে সজল শ্যাম ঘন দেয়া
এসো কুঞ্জ ছায়ায় এসো, তাল তমাল বনে
এসো শ্যামল
ফুটাইয়া যুথি কুন্দ নিপ কেয়া
এসো হে সজল শ্যাম ঘন দেয়া।।
বারিধারে এসো চারিধার ভাসায়ে
বিদ্যুত ইংগিতে দশদিক হাসায়ে
বিরিহিনী মেঘ জ্বালায়ে
আশার আলেয়া
ঘনদেয়া
মোহানীয়া
শ্যামপিয়া
এসো হে সজল শ্যাম ঘন দেয়া'

ইথারের তরংগে সুদুরের ওপার হতে ভেসে আসতে থাকে নিক্বণের ভরাট গলায় মায়া ভরা বর্ষার গান। বৃষ্টির জলে ভিজতে না পারলেও নূপুরের অধীর চিত্ত নিক্বণ ধ্বনিতে সিক্ত হতে থাকে।

জুন,২০১১


Sunday, April 12, 2026

গল্প - দুজন দুজনার

কাপ্তাই লেক দেখবো বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম। পথে একটি বড় বাসকে সাইড দিতে গিয়ে আমাদের ছোট বাহনটি উলটে যায়। অতর্কিতে টাল সামলাতে না পেরে পথপাশে কোথাও পড়ে যাই। তারপর আর খেয়াল নেই। যখন চোখ মেলি, দেখি একটি মুখ আমার মুখের উপর ঝুঁকে আমাকে ডাকছে। চোখ বন্ধ করে ফেলি। আবার তাকাই। দেখি স্বপ্ন নয় বাস্তব! ছেলেটি প্রাণপণে আমাকে ঝাঁকাচ্ছে। 

-এই যে, এই যে তাকান। তাকিয়ে দেখুন আপনার কিছুই হয়নি। আপনি ভাল আছেন। 

আমি চোখ মেলে এক ঝটকায় উঠে পড়তে চাইলাম। কিন্তু সে চেষ্টা ব্যর্থ। একটু শক্তি সঞ্চয় করে উঠে বসলাম। অপ্রস্তুত আমি। যার কোলে মাথা রেখে এতক্ষণ ছিলাম তাকে ধন্যবাদ জানালাম। সে বললো, 

- এমন কিছু করিনি। আপনি একা। সঙ্গে কাউকে দেখছি না। পথপাশে পড়ে আছেন। তাই এটা আমার দায়িত্ব আপনাকে দেখা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন কয়া। ভাগ্য ভাল আপনার তেমন কিছু হয়নি। প্রচন্ড শকে আপনি জ্ঞান হারিয়েছিলেন। আমি তবে যাই এখন? আপনার নামটা জানতে পারি কি?

- আমার নাম আন্না। 

- আন্না? আর কিছু না? অদ্ভুত বটে!

-কেন আগে শোনেন নি?

- নাহ! বিশ্বাস হচ্ছে না।

- এই তো আমি আন্না। টলস্টয়ের লেখা আনা কারেনিনার নাম শোনেননি?

-ও আচ্ছা! তবে ঠিক আছে।

- আপনার নামটি তো জানা হলো না।

- আমার নাম ক্রিস। কৃষ্ণা কানাইয়া।

-দুষ্টুমী করছেন?

-না । তবে একটা নাম আছে খাতায়। খুব জমকালো। তাই এই নামেই সবাই ডাকে। 

- কি নাম সেটা? অদৈত মল্ল বর্মন নয়তো? 

- হেসে বললো,না,মোহাম্মদ জাকারিয়া খান।

সেদিল আর কাপ্তাই যাওয়া হলো না। একটি অটোরিক্সায় উঠে বাসায় ফিরে এলাম। এরমধ্যে বেশ কিছুকাল কেটে গেল। আমি ঢাকায় গ্রামীন ফোনে কাজ করি। হঠাত একদিন দেখি সেই চেনা মুখ। একটি দেরি হলেও সে চিনলো। মৃদু হেসে বললাম, কি করতে পারি? 

তার সমস্যার কথা শুনে তাকে অন্য একজনের কাছে নিয়ে গেলাম। কাজ শেষে সে ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেল। আমার যেন কেমন সব ওলোট পালোট হয়ে গেল। বুকের ভেতর ঝড় উঠলো। কেবলই তার কথা মনে পড়ছে। 

বাসায় এলাম। নানা কাজে মন দিলাম। তবুও রেহাই নেই। কি যে করি, কোথায় যাই, কাকে বলি, কোথায় তার দেখা পাই! দিন দিন যেন অসুস্থ হয়ে পড়ছি। কিছুই ভাল লাগেনা।

হঠাত একদিন ও আবার অফিসে এসে হাজির । আনন্দে আমার ‘বক্ষ মাঝে চিত্ত আত্মহারা, নাচে রক্তধারা।‘ বললাম, 

-আবার কি সমস্যা। 

বললো, 

-এবার সমস্যা গুরুতর। ফোন নাম্বার মনে থাকছে না। তাই ভাবলাম কোথাও রেখে আসি। তার মানে এই ধরুন আপনার কাছে রেখে যাই। ভুলে গেলে আবার এসে নিয়ে যাব। 

বুঝলাম দুষ্টুমী করছে। বললাম, 

-আমি যদি ভুলে যাই। তখন কি হবে? 

-লিখে রাখেন তবেই আমার উপকার হবে। 

আমি সানন্দে ফোন নাম্বার লিখে নিলাম। সে চলে গেল। একটু পরেই ক্রিসকে ফোন করে জানতে চাইলাম, 

-আপনার নাম্বার ঠিক আছে তো? তাই পরখ করে দেখছি। বিরিক্ত বোধ করেন নি তো?

- করেছি বটে তবে বেশী নয়। মাঝে মাঝে এরকম বিরক্ত করলে খুশী হব।

এরকম ছোটখাট কথোপকথন হতে থাকে প্রায়ই। 

আমার কি হয়েছে? তাকে দেখার জন্য আমার আঁখি দুটি ব্যাকুল হয়ে ফেরে। ফোনে বললাম, অমুকদিন, সেইসময়, বাণিজ্য মেলার গেইটে থাকবেন। গিয়ে দেখি ঠিক অপেক্ষা করছে। ইচ্ছে করে জড়িয়ে ধরি পরম সুখে! কিন্তু তা তো হবার নয়।

-চলুন ভেতরে।

ঘুরে ঘুরে অনেক কিছু দেখলাম। খাবার খেলাম, গেইটের কাছে ফেরতও এলাম। সে বললো, 

-বাজার সে গুজারা, লেকিন কুছ খারিদা নেহি।

চমকে উঠে বললাম, 

-ওরে বাপরে আপনি তো দেখি মির্জা গালিব! অনেক গুণ আপনার!

হেসে বললো,

-আরো গুণ আছে!

প্রায়ই আমাদের অভিসার চলতে থাকে বিভিন্ন মার্কেটে,মেলায়,বোট্যানিকাল গার্ডেনে। আমরা যেন একজন আরেকজনের আত্মায় মিশে গেছি। কিন্তু একবারও বলা হলনা,‘ভালবাসি।’ 

এখন আমরা হাত ধরে হাঁটি। 

ক্রিস আমাকে একদিন বললো, 

- কাল ভ্যালেন্টাইন্স ডে, মনে আছে তো?

- বললাম, নাহ্‌ ! মনে নেই তো।

- মনে করিয়ে দিলাম। দেখ না চারিদিকে কেমন সাজ সাজ রব। যেন মহা মানবের মহা মিলনের মহেন্দ্রক্ষণ জাগ্রত দ্বারে। রঙ বেরং এর জুটিরা সব প্রজাপতির মতো হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে। সর্বত্র,বিশেষ করে এই রমনার উদ্যানে। আমরা আলোর পাখি। এই রমনার উদ্যানে, এই ইডেন গার্ডেনে বেড়াতে এসেছি গন্দম বৃক্ষের ফল টেস্ট করতে। আগামীকাল থেকে আমরা মানুষ হয়ে যাব। কাল তোমার জন্য লাল গোলাপ নিয়ে আসব।

আমি বললাম, 

- বাগানের গোলাপ, নাকি কাগজের?

- কাগজের। দিনের পর দিন কাগজ কেটে নিজের হাতে মনের মাধুরী মিশিয়ে পাপড়ি রেণু তৈরি করে,এক সাথে গেঁথে ফুল বানাবো। তারপর গোলাপের সুবাস মাখিয়ে তোমার জন্য নয়ে আসব। সে ফুলের পাপড়ি তাজা থাকবে শুকাবে না। ঝরে যাবে না। সুগন্ধ আমার কথা বলবে তোমার কানে কানে। সেটাই তো ভাল। 

- না ভাল নয়। আমি চাই তাজা গোলাপ। ভারি ভেলভেটের মত কালচে লাল পাপড়ি, সকালে ফুলদানির চারিপাশে পড়ে থাকবে। তার থেকে বড় বড় পাপড়ি তুলে আমার কৃষ্ণা কানাইয়ের নামটি যত্ন করে লিখে রেখে দেবা আমার মনের মন্দিরে, সঞ্চয়িতার পাতার ভেতরে আর ডিকশনারিতে।

- ডিকশনারিতে? কেন?

-সেখানে আমি যখন তখন তোমার নামের অর্থ খুঁজি, বানান দেখি!

-অবাক কান্ড! আচ্ছা দেখা যাবে কাল ভালবাসা দিবসে!

পরের দিন রমনা গার্ডেনে নির্দিষ্ট সময়ে আন্না আর ক্রিস হাজির। লাল গোলাপের বিরাট তোড়া দেখে আন্না বিস্ময়ে বলে উঠলো, এটাতো হাজার গোলাপের তোড়া! ভাবতে পারছি না কিছুই!

ক্রিস বললো,

-আজ পৃথিবীতে যত ফুল ফুটেছে সব তোমার জন্য, সব তোমাকে দিলাম আন্না, বলে নতজানু হয়ে ওকে অভিবাদন জানাবার সময় আন্না তাকে জড়িয়ে ধরে তুলে নিল। অনামিকায় ক্রিসকে দেবার জন্য একটি গোলাপের পাপড়ি যুক্ত সোনার আংটি এনেছিল। সেটি আর দেবার সুযোগ পেলনা। 

ততক্ষণে আন্না ক্রিসের আলিঙ্গন পাশে আবদ্ধ। আন্নার দুবাহু বেষ্টন করে রেখেছে ক্রিসকে স্বর্ণলতার মত। দুজনেই উচ্চারন করলো happy valentine's day!

ক্রিস বললো, you are my love. I love you my love. Happy Love day Anna, I love you, I love you today and forever.

আন্না যে কোন স্বপ্নের দেশের হারিয়ে গেছে তা সে জানে না। কেবল এক বিচিত্র অনুভূতি, আবেগে সে বারবার শিহরিত হচ্ছিল। এ এক অনির্বচনীয় আনন্দ। দুজনার ভালবাসার স্রোত এই ভ্যালেন্টাইন্স দিবসে এক হয়ে মিশে গেল। তাদের অন্তরঙ্গ আশ্লেষে গভীর প্রেম একজনের অন্তর থেকে অন্যজনের অন্তরাত্মায় সঞ্চারিত হল। নিবিড় বাহু বন্ধনে আন্নার ব্যাকুল কন্ঠ কি যেন বলতে চাইলো । 

ক্রিস বললো, Please hold your tongue and let me love.

.............

Monday, April 6, 2026

গল্প - নিয়তি

চম্পা আর বকুল। যমজ বোন। তিন ভাইয়ের পর তাদের একই সঙ্গে আগমন। একই রকম তাদের চেহারা, গায়ের রঙ, স্বভাবে চেতনায়, অসুখে – বিসুখে তারা সমানে সমান। তবে ভাগ্যের লিখনটি ছিল ভিন্ন।

গ্রামের স্কুলে পড়া শেষ করে চলে যায় শহরের হস্টেলে। কে যে চম্পা, কে যে বকুল আলাদা করে চেনা মুস্কিল। লেখাপড়ায়, খেলা ধুলায় দুজনেই ভাল। দুজনেই ফার্স্ট ডিভিশনে ম্যাট্রিক পাশ করে কলেজে চলে যায়। সেখানেও আই.এ., বি.এ. পাশ করে দুজনেই দ্বিতীয় বিভাগে। পিতামাতার চিন্তা তাদেরকে পাত্রস্থ করবার। যমজ হলেও বকুল ছোট। কারণ সে চম্পার কিছুক্ষণ পরে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল। বকুলের স্বাস্থ্য চম্পার চাইতে ভাল। সেজন্য কিনা, বকুলের বিয়ে স্থির হয় আগে। পাত্র বিলেতে ব্যারিস্টারি পড়তে যাবে। সেজন্য তার পরিবারের লোকেরা ছেলেকে বিয়ে দিয়ে ছাড়তে চায়। সুন্দরী ডিগ্রীধারী বকুলের বিয়ে হয়ে গেল তড়িঘড়ি। কিছুকালের মধ্যে বকুলকে সঙ্গে নিয়ে জামাতা চলে গেল সেই দূর দেশে বিলেতে। ভালই কাটতে  লাগলো তাদের জীবন।

এদিকে চম্পার বিয়ের ফুল কুঁড়িবদ্ধই থাকে। ফুটতে চায় না যেন। অনেক চেষ্টা তদবীর করে কলেজের লেকচারার রাশেদের সাথে তার বিয়ে হয়। দুজনেই চাকুরীজীবী। চম্পা স্কুলে আর রাশেদ কলেজে। আলাদা বাসা ভাড়া নিয়ে তারা সংসার যাত্রা শুরু করে। তাদের সংসারে দুই পুত্র, দুই কন্যা জন্মগ্রহণ করে। 

কালের চক্র ঘোরে। তারা বড় হয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিতও হয়। তারপর বিদেশে পাড়ি জমায় উন্নত জীবনের প্রত্যাশায়। ছোট ছেলেটি দেশে থেকে যায়। চম্পা আর রাশেদ চাকুরী শেষে কনিষ্ঠ পুত্রের সঙ্গে ধানমন্ডিতে নিজের বাড়িত বসবাস করে।

বিলেতে বকুলের স্বামী ব্যারিস্টারি পাশ করে ভাল চাকুরী গ্রহণ করে। সলিসিটরের চাকুরী। একটি মাত্র কন্যা তাদের বেশ ভাল্ভাবেই মানুষ হচ্ছে। মেয়ের যখন আঠারো বছর বয়স একদিন তার সুস্থ বাবা অকস্মাৎ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন। তাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। বিদেশ বিভূঁয়ে একা। তার চেয়ে দেশে আত্মীয়দের সঙ্গে থাকা ভাল। 

বকুলের দুই ভাই বহু পূর্বেই সুইডেনের অধিবাসী। এক ভাই ঢাকার বাড়িতে থাকে মাকে এবং তার নিজের পরিবারের দুই পুত্র আর এক কন্যাকে নিয়ে। বকুল আসাতে তাদের ড্রইংরুম, থাকার ঘরে পরিণত হয়। বকুলের মেয়ে এলিজা কলেজে ভর্তি হয়। কিন্তু খাপ খাওয়ানো তার জন্য বড় কষ্টকর হয়ে পড়ে। তবে ভাগ্য ভাল যে সেই সময় ইংলিশ মিডিয়ামে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেওয়ার রীতি প্রচলিত হয়েছিল। কিন্তু সে প্রাণ খুলে কারো সাথে মিশতে পারে না। ভর্তি হলো বি.এ. ক্লাশে। কিন্তু বাসায় বসার জায়গা নেই। সুতরাং পড়াশুনা শিকেয় তুলে রেখে তাকে বিয়ে দিতে বাধ্য হলেন তার পরিবার। সেখানেও তার অপরিচিত পরিবেশে বনিবনা বা মানিয়ে চলার ব্যাপারটি সামনে এসে দাঁড়ালো। তবুও তার চেষ্টার অন্ত নেই। স্বামী তার ভাল চাকুরী করে। কিন্তু কি করবে স্ত্রীর জন্য বুঝতে পারে না। দিন যায়। একদিন একটি পুত্র সন্তান জন্মদান কালে তার ভীত প্রাণপাখি খাঁচা ছেড়ে উড়ে যায়। নবজাতক অনাথ হয়, সঙ্গে অনাথ হয় এক অসহায় নারী –নাম তার বকুল। বকুল বাচ্চাটিকে লালন পালন করতে থাকে। অচিরেই তা সংঘাতে পরিণত হয়। বকুল বাধ্য হয়ে তাদের বাচ্চাটি ফেরৎ দিয়ে আসে। তারপর আর কোনদিন তার সন্ধান করেনি।

নিরুপায় বকুল বাসায় একজন অনাকাংখিত ব্যক্তি। সে চম্পার সহায়তায় একটি বেসরকারী স্কুলে চাকুরী গ্রহণ করে। শুরু হয় নতুন জীবন। বাসার কাজ আর স্কুলের কাজ সব তাকে সামলাতে হয়। বাসার সদস্য সংখ্যা বাড়তে থাকে। জায়গার সংকুলান হচ্ছে না। বকুল তার মাকে নিয়ে বারান্দার কোণে আশ্রয় পাতে। সাত সকালে সে প্রতিদিন শয্যা ত্যাগ করে। বাসার সকলের সব কাজ করে কোন প্রকারে নিজে একটু কিছু মুখে গুজে স্কুলে যায়। এদিকে ভাই ভাবী নেহায়েত দরকার না হলে একটি কথাও বলে না। এমনি সময়ে তার বৃদ্ধা মা ইহলোকে ত্যাগ করেন। বকুলের অসহায়ত্ব বৃদ্ধি পায়। সে তো এ বাড়ীর মেয়ে ছিল। এখন কারো কেউ নয়। কেউ তার সঙ্গে কথা বলে না। এভাবে সময়ের সিঁড়ি বেয়ে চাকুরী শেষ হলো একদিন। স্কুলের ছাত্রীরা ফুলের মালা দিল, ভালবাসা দিল, জায়নামাজ, তসবীহ্‌ , বুখারী শরীফ, মস্তক আবৃত করার জন্য একটি হিজাব দিল। মেয়েরা, কলিগরা কাঁদলো বিচ্ছেদের বেদনায়। বকুল কাঁদে তার অবলম্বন হারাবার বেদনায়। ভগ্ন হৃদয়ে বকুল বাড়ি এলো। বারান্দায় তার হাতের দ্রব্যাদি বিছানায় রেখে চোখের জল মুছতে লাগলো। তারই মাঝে শুনতে পাচ্ছে সে, সময়কার চা –নাস্তা সময়ে তৈরী হয়নি। তাই বিরক্তি প্রকাশ করছে সকলেই। উঠে দাঁড়ালো বকুল। দেয়ালে আটকানো আয়নায় চোখ পড়লো। দেখলো তার বৃদ্ধ মুখ, বিধ্বস্ত চেহারা। রান্নাঘরে গিয়ে দ্রুত হাত লাগালো। সকলের চাহিদা পূরণ করে হাত মুখ ধুয়ে মাগরিবের নামাজে দাঁড়ালো। এমন সময় এলো একদল মেহমান। তারা নব প্রজন্মের আত্মীয় –কুটুম। কোনদিন বকুলের সাথে তারা কুশল বিনিময় পর্যন্ত করেনি যদিও তার তৈরী খাবার তারা আনন্দের সাথে উপভোগ করে। প্রশংশা কোনদিন কেউ করেনি। এদেরই কেউ খবরের কাগজের ঠোঙ্গায় করে চিনা বাদাম নিয়ে এসেছিল। কাজ শেষ করে ঠোঙ্গাটি যখন ফেলতে যাবে এই সময়ে চোখ আটকে গেল একটি বিজ্ঞাপনে। গাজীপুরের হোতাপাড়ায় বৃদ্ধদের জন্য আশ্রম। কোন খরচ লাগবে না। ষাট বছর বয়স,নিরাশ্রয়, অসহায়, মস্তিষ্ক বিকৃত নয় এমন মহিলাদের থাকা খাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এতদিন পর বকুল যেন অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষে একটু আলোর আভাস দেখতে পেল। পরদিন সকালে কাজ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়লো। বাসে চড়ে গেল গাজীপুরের কুড়িবাড়ী হোতাপাড়ায়। গভীর গজারী বনের অভ্যন্তরে এক আশ্রম। নাম তার বয়স্ক ও শিশু পূনর্বাসন কেন্দ্র। সংক্ষেপে ‘বশিপুক’। প্রতিষ্ঠাতা এক মহান ব্যক্তি। নাম খতিব আব্দুল জাহিদ মুকুল। যিনি নিজের খরচে এই অসহায় বৃদ্ধ – বৃদ্ধাদের অতি আপনজন হয়ে আশ্রয় কেন্দ্র খুলেছেন এবং সবদিকে খেয়াল রাখছেন। বকুল মেয়েদের এলাকায় গেল। লম্বা টানা বারান্দাওয়ালা ব্যারাক। সুপ্রশস্ত কামরা। সঙ্গে প্রশস্ত বাথরুম। প্রতি রুমে দুই সারিতে পাঁচজন করে দশজন থাকে। ডাইনিং রুম, টিভি রুম, নামাজের ঘর, রান্না ঘরের বিরাট এলাকা, আর আছে অফিস রুম সমূহ।

বকুল ঘুরে ঘুরে সব দেখলো। প্রত্যেক রুমের সামনে বসার জন্য বেঞ্চ পাতা আছে। বকুলের মন চলে গেল অতীতে। তারা দুই বোন হস্টেলে থাকতো। দলবেঁধে গান গাইতো , নাচতো, ফাংশান করতো, কবিতা আবৃত্তি করতো।  বকুল একটা কবিতা খুব গাইতো –

Row row row your boat,Gently down the stream 

Merrily merrily merrily, Life is but a dream. 

সব মেয়েরা একসঙ্গে গেয়ে উঠতো। মেট্রন খালাম্মা কত বকা দিতেন। আজ কোথায় গেল সেসব সোনাঝরা দিন। আবার ফিরে এলো হস্টেলে।  ছোট বেলার স্বপ্ন ছিল সুখের স্বপ্ন। এখন আছে ফেলে আসা অতীতের ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন। দরজায় বসে আছে জরা ,ব্যাধি আর মৃত্যু। সামনে শেষ বিকেলের অন্ধকার, নিঃশব্দ রাত্রির সেই কবরস্থানের আহ্বান।  

আবার কান্না এলো বকুলের। বুক ভাঙ্গা কান্না! বাসায় তো কান্নার স্বাধীনতাটুকুও  ছিল না। এখানে সে কাঁদতে পারবে, হাসতে পারবে শান্তি না থাক স্বস্তি থাকবে। বকুলের মনে পড়ে গেল অদৃষ্টের কথা। হায়রে অদৃষ্ট। কি অনিষ্ট করেছিলাম আমি তোর? এত বড় বিশ্বে আমার কত বড় ঠাঁই এর প্রয়োজন ছিল। How much land does a man require? আমার যমজ বোন চম্পা, সে তো মহাসুখে আছে, আদরে, মমতায় সকলের মা হয়েছে। আমার গুণ তার চাইতে কম কিসের! সেও আমা হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আমার খোঁজ রাখে না। পাছে তার সুখে ভাগ বসাই। এক জোড়া কাপড় আর যত সামান্য জিনিসপত্র নিয়ে আমি এ আশ্রমে এসেছি। টাকা পয়সা যা কিছু ছিল সব ফেলে রেখে এসেছি।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে আনমনা হয়ে ভাবছিল বকুল। হঠাৎ দেখে বারান্দার নীচে অনেক শিউলি গাছে। শরতের সকালের ঝরা ফুলে ছেয়ে আছে চারিদিক। দেখবার কেউ নেই। মনে পড়ে গেল স্কুলের স্টেলের কথা। লুকিয়ে লুকিয়ে ভোর বেলায় ফুল কুড়িয়ে মালা গেঁথে বন্ধুদের দিত। অদূরে দেখা যাচ্ছে বাগানে একটা দোলনা। পুরানো সেই দিনের কথা স্মরণে এলো।

‘মোরা ভোরের বেলা ফুল তুলেছি, দুলেছি দোলায়-

বাজিয়ে বাঁশি গান গেয়েছি বকুলের তলায়।’

যমজ বোনের কথাই বকুলের মনে পড়ছে বেশী। সেই তাকে দেখেশুনে রাখতো। তার জ্বর হলে নিজের জ্বর উপেক্ষা করে চম্পার শুশ্রূষার দিকে ছিল তার সকল মনোযোগ। বোন ছিল তার প্রান প্রিয়। অথচ আজ মনে হচ্ছে মানুষ একাই জন্ম গ্রহণ করে। তার কী প্রয়োজন ছিল চম্পার সঙ্গে জন্মাবার।  কেন এসেছিল সে? কেন পেয়েছিল এত আদর, সোহাগ, মায়া মমতা, স্বামী সন্তান, সুখ সমৃদ্ধ –কি দরকার ছিল? কোনো মহাভারত কি অশুদ্ধ হতো তার জন্ম না হলে? কেন হারালো সব? কেন পরাশ্রিত হলো? নিজের উপার্জন, কর্মদক্ষতা থাকা সত্বেও কেন অন্যের  গলগ্রহ হয়েও অপমানিত হলো? কি দোষ ছিল তার? তবুও হয়েছে। এই তার নিয়তি। তার তকদীর । তার কপালের লিখন! 

বৃদ্ধাশ্রমে সব বুক ভাঙ্গা, মন ভাঙ্গা, দুঃখী মানুষের বসবাস। যারা জীবনের বৃন্ত হতে বিচ্ছিন হয়েছে, বাড়িতে থেকে পরিত্যক্ত হয়েছে, তারাই এখানে আশ্রয় পেয়েছে। জীবনের শেষ আশ্রয়। ঘাটের পাড়ে নিজের নৌকা খানির অপেক্ষায়। এখানকার সকলের সঙ্গে বকুল সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করে নেবে। সকলকে ভালবাসবে। দুঃখে যাদের জীবন গড়া তাদের আবার দুঃখ কিসের। কি পেয়েছি, কি পাইনি, সে হিসাব আর কোনদিন করবে না। আর ভবিষ্যত? সে তো সেই আলেমুল গায়েব –তারই হাতে ন্যস্ত। ভাগ্যবান, ভাগ্যহত সকলেই যার কাছে সমর্পিত।

........

উৎসর্গ

 আমার পিতাকে যাঁর জীবনের পাথেয় ছিল আপোষহীন নীতি আর শৃঙ্খলা।   আমার মাতাকে ছেলেমেয়েদের মেধা ও মননশীলতায় যিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। আমার স্বামী...