মানুষ ভাগ্য নিয়ে জন্মায়। জীবনের বাঁকে বাঁকে ঘটনার বিবর্তন ঘটে বটে, তবে ভাগ্য তার সঙ্গ ত্যাগ করে না। তিন ভাই বোনের মধ্যে জুবাইদা খাতুন সর্বকনিষ্ঠ। বড় দুজন ভাই। মাত্র দু’বছর বয়সে জুবাইদা খাতুন মাতৃহারা হন। এখান থেকেই তার জীবনের একাকীত্বের শুরু। মায়ের স্নেহ কি তার জানা নেই।
পিতা মোহাম্মদ হানিফ, সুফি দরবেশ। দেশ-দেশান্তর ঘুরে বেড়ান। শেষে আশ্রয় নেন মক্কা মদিনায়। মক্কায় ঘর সংসার পাতেন। দীর্ঘ এগার বছর আর দেশে ফেরেননি। সঙ্গে ছিল তার জ্যেষ্ঠ পুত্র বালক মোহাম্মদ সিদ্দিক। সেখানেই লেখাপড়া করতেন। পিতা বিদ্বান ছিলেন। নানা ভাষায় পারদর্শী। কঠোর ধার্মিক। কিন্তু কোমল, উদার মনোবৃত্তির অধিকারী ছিলেন। মানবতার দিকে দৃষ্টি ছিল। স্বল্প ভাষী। ভক্ত সংখা ছিল প্রচুর। তবে তিনি পীর ছিলেন না। ছিলেন না সংসারীও। বাড়ির অবস্থা ভাল। বিষয় সম্পত্তি যথেষ্ট। জমি বন্ধক দিয়ে টাকা পয়সা নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন।
বিরাট বাড়ি। সূর্য দীঘল নয়। উত্তর দক্ষিণে প্রসারিত। বহু শরীকের বসবাস – একই বংশোদ্ভূত। জুবাইদা খাতুন বাড়িতে বিরাট আট চালা ঘরের একা বাসিন্দা। বাড়িতে লোকের অভাব নেই। কেউ না কেউ তার সঙ্গে থাকতেন। তার উত্তরের ঘরের জেঠি, দক্ষিণের ঘরের জেঠি, পশ্চিমের ঘরের জেঠিরা খুবই স্নেহ করতেন। মাতৃহারা মেয়েটিকে স্নেহের ছায়া দিয়ে রাখতেন। খাবার দিতেন, নিরাপত্তার খেয়াল রাখতেন। বয়স তখন তাঁর পাঁচ বছর । ১৯১০ সালে তার জন্ম।
তখন ব্রিটিশ আমল। বাড়িতে লেখাপড়ার চর্চা ছিল। তবে মেয়েদের জন্য নয়। জুবাইদা খাতুন ঘুরে ঘুরে সব ঘরেই লেখাপড়ার আশে পাশেই থাকতেন। তাদের বাদ দেয়া বই নাড়া চাড়া করতেন। তাতে তার পড়াশুনা আয়ত্তে এসে যায়। পরীক্ষা পাশ করা ছাড়াই সরস্বতি তাকে অনেক কৃপা করেন। ধাপে ধাপে সব ক্লাসের বই পড়া শেষ হয়। এমনকি ইংলিশ কবিতাও তার শুনে শুনে মুখস্থ ছিল। আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণ তার অনেকখানি মুখস্থ ছিল।
সেই সময় আমার বড় মামা মোহাম্মদ সিদ্দিক বাড়িতে এসে আমার মা জুবাইদা খাতুনকে মাদ্রাসায় ভর্তি করে দিলেন। মাদ্রাসাটি অনেক প্রাচীন কালের। বড় মামা ঘোড়ায় চড়ে তার ছোট বোনটিকে মাদ্রাসায় দিয়ে যেতেন, আবার এসে নিয়ে যেতেন। তখন বাড়ি বাইরে গিয়ে বিদ্যার্জন মেয়েদের জন্য ছিল এক আশ্চর্য ঘটনা। এই ছিল তার প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনা। কোরান পাঠ, গুঁলিস্তা, বুস্তা, পুস্তা এসব বই পড়াশুনা কিছুদিন করেছিলেন। ঘোড়ায় চড়ে মাদ্রাসায় পড়তে আসা তখনকার দিনে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, বিশেষ করে অবরোধ বাসিনীদের কাছে। মামা লাখনৌ চলে যাওয়ার পর পড়াশুনাও বন্ধ।
তার কিছুদিন পর দূরদেশী দরবেশ পিতা বাড়িতে এলেন। তিনি ছিলেন উঁচা লম্বা গৌরবর্ণ এক সুন্দর সুঠাম দেহের অধিকারী। গ্রামের লোকেরা মজাক করে বলতেন “কাবুলিওয়ালা”। এক পুণ্যময় নুরানী আলো যেন তাকে ঘিরে রাখতো। দেশে ফিরে এসে তিনি জেষ্ঠ্য পুত্র মোহাম্মদ সিদ্দিকের বিবাহ দিলেন, আরেক পরিবারের সম্ভ্রান্ত সুশ্রী দির্ঘাঙ্গী তরুণীর সঙ্গে। তাদের ছিল সৌন্দর্যের খ্যাতি। বিশেষ করে গাত্রবর্ণ ছিল তাদের বিশেষ অহংকারের কারণ। চাকুরী নিয়ে মোহাম্মদ সিদ্দিক লক্ষ্ণৌতে পাড়ি জমালেন। সঙ্গে নিলেন ছোট ভাই মোহাম্মদ জাকারিয়াকে। সেখানকার মাদ্রাসায় তাকে ভর্তি করে দিলেন। তারও কিছুকাল পর ছোট বোন জুবাইদা খাতুনকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন।
এটা আমার মায়ের জীবনের আরেকটা বাঁক। এখানেও তিনি একা। ভাবী তার মাতৃহারা হৃদয়ে কোন স্নেহ মমতার বারি সিঞ্চন করতে পারেননি। এখানে জুবাইদা খাতুনের কাজ ছিল বাচ্চার পরিচর্যা করা, ঘর গেরস্থালীর কাজ করা। আরবী উর্দু পড়া এবং কথা বলা।
এই লখনৌ শহর ছিল ভারতের উত্তর প্রদেশের রাজধানী। অত্যন্ত অভিজাত শহর। তবে আজকের মত সুযোগ সুবিধা ছিলনা। যানবাহনের মধ্যে ছিল “ডুলি” পালকির সাধারণ সংস্করণ। সম্ভবত কাঠের তৈরি একটি বাক্সের মত। চারদিক কপড় দিয়ে ঘেরা। দুই বেহারা কাঁধে করে নিয়ে যেত গন্তব্যে। আমাদের রিক্সার মত তারা সর্বত্র ঘুরে বেড়াতো। যার যখন দরকার ডেকে নিত – “এ ডোলি ওয়ালা ইধার আও”। ডুলিতে চড়ে চলে যেতেন বেড়াতে, হাসপাতালে অর্থাৎ যেখানে ইচ্ছা সেখানে। জুবাইদা খাতুনের কাজ ছিল নিয়মিত তার ভাবী সাহেবার জন্য ডুলি ডেকে আনা।
সেই সময় সেই শহরে হাজী আমীর আলী নামে একজন বিখ্যাত পীর সাহেব বাস করতেন। তিনি অত্যান্ত নেক এবং পরহেজগার ব্যক্তি ছিলেন। আমার বড় মামা হাফেজ ক্বারী মৌলানা মুহাম্মদ সিদ্দিক সাহেব তাঁর একজন বিশেষ ভক্ত এবং বন্ধু ছিলেন। কথিত আছে পীর সাহেব বিছানার গদি উঠালেই অনেক টাকা বের হতো। তিনি দয়ালু ছিলেন। নির্ধনকে দান করতেন। তার বাড়িতে অন্দরে কোন রান্নাবান্না হতনা। পাক হত দহলিজে। সেখানে বহুত উমদাহ্ খানা তৈয়ার হত। বাড়ির ভেতরের জেনানাগণ এবং অন্য সকলে সেই খানা গ্রহন করতেন। আমার মাতা জুবাইদা খাতুন সেই সময় বালিকা ছিলেন। বড় মামি প্রায়ই সেই বাড়িতে তশরিফ নিতেন। ডুলিতে চড়েই যাতায়াত। সঙ্গে যেতেন জুবাইদা খাতুন বাচ্চা মেয়ে নূরীকে দেখভাল করবার জন্য।
বড় মামার পাশের বাসার একটি মেয়ের সঙ্গে জুবাইদা খাতুনের পরিচয় হয়। নাম তার রাসুলান। সম বয়সী হলেও একটু বড়। এই ছোট মেয়েটিকে এত কাজকর্ম করতে দেখে তার মায়া হয়। সে বলতো এত কাজ কর কেন? তোমার ভাবিতো সারাদিন ঘুরে বেড়ান। তুমি ছোট, এত কাজ কর, বাচ্চা সামলাও। তিনি যেমন তোমার ভাই সাহেবের বিবি, তুমিও তো তার বোন। কম কিসে? দেখ আমার কোন কাজ নেই। আমার মা-ই সব করেন। জুবাইদা খাতুনের চোখ ছল ছল করে ওঠে। বুকের ভিতরটা হাহাকার করে। মুখে বলতেন আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। তাছাড়া এ বাচ্চা মেয়েটিও আমার খুব প্রিয়। সে আমাকেই বেশি পছন্দ করে। আর ঘরের কাজ কর্ম তো করতেই হবে।
জুবাইদা খাতুন ঘর সংসার গুছিয়ে রাখতেন। নিজের পড়াশুনা করতেন। তাদের বাড়ির নীচের তলায় ছিল বাজার, দোকানপাট। উপর থেকেই বাজার করতেন। এক আনায় অনেক কিছুই ক্রয় করা যেত। তাছাড়া আসতো ফেরিওয়ালা। তাজা হারে আমরুদ, (পেয়ারা) তাজা হারে আমরুদ বলে হাঁক দিত। এক পয়সায় অনেক পেয়ারা দিয়ে যেত। হারা মিরিচ (কাচা মরিচ), শাক সবজি, আঙ্গু্র, সেভ (আপেল), কিসমিস, মনাক্কা, নানা প্রকার মসলা দিয়ে যেত। চার আনার বাজারে বাড়ি ভরে যেত এমনকি মিঠাই মন্ডা সহ।
আমার ছোট মামু মাদ্রাসা থেকে ফিরে এলে তার ছোট বোন জুবাইদা খাতুন নিচে গিয়ে দরজা খুলে দিয়ে আসতেন। একটি ঠিকা মেয়ে বাসার কাজ করে দিয়ে যেত। কোনদিন আসতে দেরি হলে এই জুবাইদা ছাদের উপরে গিয়ে তাকে চিৎকার করে ডেকে আনতেন। তার নাম ছিল মান্নু কি আম্মি। তিনি ডাকতেন, এ মান্নুকি আম্মি, জলদি আও। দের হো রাহা হ্যায়। সম্ভবতঃ তাদের বাসস্থান ইনাদের বাসস্থানের নিকটবর্তী ছিল। সেই মেয়েটি এসে ভারি ভারি কাজ করে দিয়ে যেত।
এক রাতে মহল্লায় চোর হানা দেয়। গভীর রাতে চোর আসে রাস্তার ওপারের বাসায়। তখন রাস্তার মোড়ে মোড়ে বাতিওয়ালা সন্ধ্যায় বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে যেত। সকালে এসে বন্ধ করে দিত। সে আলো কতই বা উজ্জ্বল ছিল। তবুও তো আলো। আজকের দিনের সাথে তার কোন তুলনা চলেনা। সেই বাড়ির গৃহকর্তা বাড়িতে ছিলেন কিনা জানিনা। তবে গৃহকর্ত্রী উচ্চস্বরে চিৎকার করে বললেন, মহল্লা ওয়ালা জাগো, হামারা ঘর মে চোর আয়া। কেউ এলোনা। শেষে ডাকলেন, ক্বারী সাহাব জাগো, ক্বারী সাহাব জাগো। হাম মুশকিল মে হ্যায়। তখন আমার বড় মামা সাড়া দিলেন। তিনি দু’নলা বন্দুকটি বারান্দা থেকে তাক করে চোরকে গর্জন কোরে ধমক দিলেন। চোর ততক্ষন পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলো। কোনো সাহায্যকারী না এলে সে ঘরের জিনিসপত্র নিয়ে যাবে। বড় মামুর ধমক খেয়ে এবং বন্দুক দেখে লোকটি লাফ দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়। মামা সেই মহিলাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, দরজা বন্ধ রাখেন। আবার যদি আসে তবে আমাকে ডাকবেন। এইভাবে তিনি তস্করের হাত থেকে সেই ভদ্রমহিলাকে রক্ষা করেন।
সেই সময় লখনৌকে আমার আম্মারা হিন্দুস্থান বলতেন। তখন বাংলাদেশও ভারতের অন্তর্গত ছিল। লখনৌ ছিল অনেক দূরের রাস্তা। আম্মার ভষায় তিন দিন তিন রাত থাকতে হতো ট্রেনে। আমার বড় মামা মোঃ সিদ্দিক একটি কামরা রিজার্ভ করে নিতেন। উনার নিজের পরিবার, ছোট মামা জাকারিয়া, আম্মা জুবাইদা খাতুন। আমাদের এলাকার আরো কয়েকজনকে লখনৌ মাদ্রাসাতে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে যাতায়াত করতেন। ট্রেনের কামরার চাবি বড় মামুর হাতেই থাকতো। ট্রেনে যেতে যেতে অনেক দৃশ্য অবলোকন করতেন। পাকশী ব্রিজ বিরাট রেল সেতু অতিক্রম করা, গুম গুম শব্দ অনুভব করা বড় রোমাঞ্চকর মনে হত। কোথাও ট্রেনটি একটি বিশাল মাছের পাজরের দুই পাশের কাঁটার ভিতর দিয়ে চলে যেত। এত বিরাট মাছের কাঁটা, না জানি কত বিরাট মাছ ছিল সেটি। এটিও পুলক অনুভব করবার মত ঘটনা। এখন আর সে সবের চিহ্নও নেই। কেউ জানেও না। ট্রেনে যেতে যেতে নানান প্রাকৃতিক দৃশ্য, নানান জনপদ , নানা প্রকার বেশ ভূষা, জীবন যাত্রার ধরণ, ভাষা চেহারা দেখতে দেখতে অবশেষে সবুজ শ্যামল বাংলা এলাকা ছেড়ে রুক্ষ ধূসর দেশে উত্তর প্রদেশে গিয়ে পৌঁছাতেন। গার্ড এসে চাবি নিয়ে যেতেন। মামারা অবতরণ করে গন্তব্যে পৌঁছে যেতেন। জুবাইদা খতুন ঘর সংসারের কাজ করতেন, পড়াশুনা করতেন এবং মামার মেয়েদের ছবক দিতেন। বড়মামার পড়াশুনার প্রতি খুব আগ্রহ ছিল। তিনি পড়াশুনার জন্য জুবাইদা খাতুন এবং তার মেয়েদের খুব উৎসাহ দিতেন। আমার আম্মা জুবাইদা খাতুন বিদুষী মহিলা ছিলেন। মজার বিষয় ছিল তিনি লিখতে জানতেন না। প্রচুর পড়াশুনা করতেন বাংলায় যেমন, উর্দুতে তেমন। আর হাদিস কোরান তো কথাই ছিলনা। আমরা ছোট বেলায় দেখেছি অবসর সময়ে মানচিত্র ছিল তার সঙ্গী। পৃথিবীর সব সাগর, মহাসাগর, মহাদেশ, দেশ, রেলপথ, নৌপথ, আকাশপথ, কোথা হতে কোন গন্তব্যে পৌঁছায় সব ছিল তার নখদর্পণে। কোন কিছু জানতে চাইলে পরম যত্নের সঙ্গে আমাদের তা বুঝিয়ে দিতেন। শিল্প সাহিত্য সম্বন্ধে তার জ্ঞান ছিল প্রচুর। নবী কাহিনী, আসমানী কিতাব, তাদের শানে নজুল তাঁর মুখস্থ ছিল। যত পুঁথি ছিল তাঁর কন্ঠস্থ এবং সুরেলা কন্ঠে তা পাঠ করতে পারতেন। ইংরেজী পড়তে পারতেন না তবে অনেক গল্প জানতেন শেক্সপীয়রের। প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যা না থাকলেও তিনি একজন স্বশিক্ষিত এবং সুশিক্ষিত মহিলা ছিলেন। আমাদের গ্রামে আজ পর্যন্ত তার সমকক্ষ আর কেউ নেই। যদিও মেয়েরা বি.এ. পাশ করছে। তবুও তাঁর তুলনা তিনি নিজেই।
লখনৌতে থাকতে থাকতে তার বয়স বেড়ে যায় ১৩/১৪ তে। তখনকার বিধান অনুযায়ী বিবাহের বয়স। সুতরাং কোন ছুটীতে মামারা বাড়ি এসে তার বিবাহের ব্যবস্থা করে ফেলেন। আমাদের গ্রামের এক গ্রাম পরেই দক্ষিণে নিঘুরকান্দা গ্রাম। দুই ক্রোশ হয়তবা হবে। আমাদের গ্রামের নাম হরিরামপুর। আমার পিতা আব্দুস সোবহান বিশ্বাস ১৯১৯ সালে এনট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি ছাত্র ছিলেন তুখোড়। তিনি গল্প করতেন, প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের পর যখন ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তখন ম্যাট্রিক পাশ করেছিলেন। তাদের সময় মিডিয়াম অব ইন্সট্রাকশন ছিল ইংলিশ। পরীক্ষায় ভালভাবে পাশ করার দরুণ দূর দূরান্ত হতে লোকেরা তাকে দেখতে আসেন। তিনি ছিলেন এক অদম্য এবং নির্ভিক পুরুষ। তাঁর শিশু কালেই পিতৃবিয়োগ হয়। তাঁর মায়ের সহায়তায়, নিজের অসম সাহসে এগিয়ে যান। আর্থিক অনটনে কলেজের লেখাপড়া ত্যাগ করতে বাধ্য হন। কারো পরামর্শ ছাড়াই, নিজের সাহসে ভর করে গিয়েছিলেন মুক্তাগাছা এলাকার প্রবল পরাক্রমশালী জমিদার রাজা জগৎ কিশোরের নিকট। তিনি তরুণের বক্তব্য শুনে মন্তব্য করলেন, Look, higher education is not for the poor. জমিজমা যা আছে দেখেশুনে চালাও, তাতেই চলে যাবে। বিফল মনোরথ হয়ে পিতা আমার ফিরে এলেন। ঘুষের চাকুরী করবেন না বলে দারোগার চাকুরী প্রত্যাখ্যান করলেন। সাব রেজিস্ট্রারের চাকুরিও নিলেন না। শেষে নান্দিনা স্কুলের টিচার হিসেবে যোগ দেন। তার বিষয় ছিল অংক আর ইংলিশ। এই স্কুল প্রতিষ্ঠায় নলিনী মোহন দাস (মাখন বাবু), রিয়াজ মাস্টার, জয়েন মৌলবি সাহেবদের সঙ্গে তারও অবদান ছিল। এই স্কুল অল্প সময়ের মধ্যেই একটি বিখ্যাত স্কুল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এর সব কৃতিত্ব শিক্ষকদের। এই নান্দিনা স্কুলেই আমাদের সব ভাইয়েরা লেখাপড়া করেন। তখনকার দিনে ১৯৪৩ সালে আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা নাজির আহমেদ undivided বেঙ্গলের শিক্ষা বোর্ডে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পঞ্চম স্থান অধিকার করেন। পরবর্তীতে কলকাতায় প্রেসিডেন্সি কলেজে, পরে কলকাতা ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারী পাশ করেন। পরে ইংল্যান্ড থেকে এফ এফ এ তার সি এস পাশ করেন, কম সময়ে কৃতিত্বের সঙ্গে।
বিবাহের সময় আমার আম্মা কিশোরী মাত্র। মা নেই। বাবা বিদেশে বসবাস করেন। একা একা আমাদের বাড়িতে একটি সংসারের দায়িত্ব গ্রহন করেন। শাশুড়ি রায় বাঘিনী। তবে ননদিনী অন্যান্যরা বড়ই স্নেহের চক্ষে দেখতেন। আমার মা বড়ই ধৈর্য্যশীলা সহিষ্ণু রমণী ছিলেন। তিনি বাড়িতেই থাকতেন বিরাট আটচালা ঘরে একাই থাকতেন। আমার এখন মনে আছে ঘরের উপরের কাঠের পাড়ে বড় করে খোদাই করে লেখা ছিল ১৩৩০ সাল। আম্মা ভয়ে ভয়ে একাই থাকতেন। তার কষ্টের কথা বলার জায়গা ছিলোনা। বাবা ছিলেন রাগী মানুষ, তাকেও কিছু বলার উপায় ছিলনা। যাই হোক। সংসার বড় হলো। এই প্রথম তিনি তাঁর প্রথম সন্তানকে নিজের মত করে পেলেন। সম্পূর্ণ নিজের কেউ। তাকে লালন পালন করা, শয়নে স্বপনে বুকের কাছে রাখা, অক্ষর জ্ঞান দান করা সব কিছুই নিজের মত করলেন। কয়েক বছর পর তাকে ছাড়তে হলো। ভর্তি করা হলো নন্দিনা স্কুলে। ছাড়তে খুব কষ্ট হতো। তিনিও তাকে ছেড়ে যেতে চাইতেন না। আম্মা লুকিয়ে তাকে একটি টাকা দিতেন। বুঝিয়ে সুঝিয়ে স্কুলে পাঠাতেন। তিনি ছিলেন দূরন্ত প্রকৃতির ছেলে। অত্যন্ত মেধাবী। নতুন বই কয়েক দিনে মুখস্থ করে ছিড়ে বাতাসে উড়িয়ে দিতেন। বলতেন আমার সব মুখস্থ। বই নিয়ে স্কুলে যাওয়ার প্রয়োজন কি? অংকও তার নখদর্পণে ছিল।
সে প্রসঙ্গ থাক এখন মায়ের প্রসঙ্গ বলি। মা তখন পরবর্তী সন্তানকে নিয়ে ব্যস্ত হতেন। এইভাবে তিনটি ভাইয়ের পর আমার জন্ম। বাড়িতে আনন্দের জোয়ার এলো। হাঁটি হাঁটি পা পা যখন আমার মা আমার হাতে শিশুতোষ বই তুলে দিলেন। বইটির নাম “কমল কলি”। শেখালেন অসংখ্য ছড়া, ছড়া গান, কবিতা। ভোর হল দোর খোলো, খুকু মণি উঠরে.....। গাছে বসে ডাকে পাখি উঠ, উঠ, উঠ বলে, নয়ন মেলরে শিশু জয় জগদীশ বলে। আরো অনেক কবিতা শুনিয়ে ঘুম ভাঙ্গাতেন। আমার বাবা আমার বড় ভাইদের জন্মের পর গ্রামে একটি মক্তব (প্রাইমারী স্কুল) প্রতিষ্ঠা করেন। সেটি আজও বর্তমান আছে। সেই স্কুলেই আমাদের সকলের হাতে খড়ি। সেখান থেকে আমরা একে একে বেরিয়ে এসে শহরের হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করে, প্রত্যেকে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করি। একদিন রাতে আমরা যখন ঘুমে, বাবা মাকে বললেন, ফিরোজার ভর্তির ব্যাবস্থা করে এসেছি। বিদ্যাময়ী গার্লস স্কুলে। আগামী সকালে তাকে নিয়ে যাবো। তাকে তৈরি করে দাও। ৬ টি ব্লাউজ, ৬ টি শাড়ি, ৬ টি পেটিকোট ইত্যাদি খুটিনাটি, সব কিছু লেখা একটি প্রোসপেক্টাস আম্মার হাতে দিলেন। আমার চোখের ঘুম উধাও। আমি মাকে ছেড়ে কি করে থাকবো? আমার প্রিয় বন্ধুরা, প্রিয় পেয়ারা গাছ, কুল গাছের আগডালে মগডালে চড়া, সারাদিন টো টো করে গ্রাম শুদ্ধ ঘুরে বেড়ানো, এসবের কি হবে? আমি সেখানে হোস্টেলে থাকতে পারবোনা। কিন্তু আমার প্রচন্ড রাগী বাবার সঙ্গে এমন কথা বলা অসম্ভব। সুতরাং এক বুক কান্না নিয়ে পরদিন প্রত্যুষে বাড়ি হতে বের হয়ে গেলাম। সব গুছিয়ে দিলেন আম্মা, হাতে দিলেন একটি টাকা।
তখনকার দিনে গ্রামাঞ্চলে যানবাহন ছিলনা। ছিল দুই বেহারার ডুলি। তাতে চড়ে ধলা রেল স্টেশনে পৌঁছালাম। কারণ ঐ বয়সে পদব্রজে ৫ মাইল পথ অতিক্রম করা সম্ভব ছিলনা। আম্মা এদিকে রিক্ত হলেন। সারাদিনের শতকাজের মধ্যেও তাঁর চোখের জল শুকায় না। কয়েক বছর পর আমার বাবা আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা আজিজ আহমেদকে নান্দিনা স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। আমার মা এবার সম্পুর্ণ শুন্যতার মধ্যে পড়ে গেলেন। তার শৈশবের একাকীত্ব আবার তার কাছে ফিরে এলো। সপ্তাহান্তে একটি চিঠির অপেক্ষায় থাকতেন তিনি। বড় ভাইয়েরা তখন স্কুল কলেজের গন্ডি পেরিয়ে অনেক দূরে। কেউ প্রেসিডেন্সি কলেজে, কলকাতা মেডিকেল কলেজে, কেউ অন্যান্য কলেজে ভর্তি হয়ে পুরোদমে লেখাপড়া করছে। ছুটিতে আমরা বাড়িতে এলে মায়ের খুব আনন্দ হত। খুব যত্ন করতেন আমাদেরকে, যেন অতিথি, মেহমান!
একবার শীতের সময় বার্ষিক পরীক্ষার পর বাড়ি এসে দেখি তিনি ভয়ানক অসুস্থ। তার শ্বাস কষ্ট অ্যাজমা হয়েছে। ব্রংকিয়াল অ্যাজমা। শ্বাস প্রশ্বাসের কষ্ট যে এত ভয়ংকর হতে পারে, তা কল্পনার বাইরে ছিল। একটি দম শেষ হতে না হতেই আরেকটি দম এসে শ্বাস টেনে ধরে। উপর্যুপরি শ্বাস টানার ফলে ব্যক্তিটি হাঁপিয়ে ওঠেন। সেজন্য হয়ত এর আরেক নাম হাঁপানি রোগ। আমার মায়ের এহেন কষ্ট দেখে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। এতই কষ্ট যে কথা বলারও সময় দেয় না। এই অ্যাজমা রোগ বাকি জীবনের সঙ্গী হয়ে রইল। তিনি কিছুটা সুস্থ হলেন। আমার ছুটীও শেষ হল। আমরা একে একে বাড়ি থেকে যার যার হোস্টেলে চলে গেলাম। উনার একাকীত্বের সঙ্গী হয়ে রয়ে গেল ঐ ভয়ানক ব্যাধি। জীবনের বাকি ত্রিশটি বছর তিনি এই নিষ্ঠুর ব্যাধির সঙ্গে লড়াই করে জীবন কাটিয়েছেন। আমরা কেউ তাকে সঙ্গ দিতে পারিনি। তিনি কাউকে তার সঙ্গে থাকার জন্য অনুরোধ বা জোর করেননি। কত ঝড় ঝঞ্ঝা, কত গ্রীষ্ম, কত বর্ষা একা ঘরে একাকী অবস্থায় দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী অতিক্রম করেছেন। যতক্ষণ ভাল থেকেছেন, ততক্ষণ সংসারের কাজে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন।
আমার মা জুবাইদা খাতুন পরম দয়ালু ছিলেন। মানুষের কষ্ট দূর করার চেষ্টা করতেন। বিশেষ করে খাবার দিয়ে খুব সাহায্য করতেন। কেউ অভুক্ত দরজায় এসেছে তাকে ফিরাতেন না। “মাফ কর” কখনও বলেননি। খাদ্য দিয়ে, চাউল দিয়ে, টাকা দিয়ে সাধ্যমত সাহায্য করতেন। তার হাতের রান্না ছিল উৎকৃষ্ট। অনেকেই অসুস্থ হলে উনার হাতের রান্না করা বিশেষ খাবারের আবদার করে পাঠাতেন। আমার মা সঙ্গে সঙ্গে তার ব্যাবস্থা করে পাঠিয়ে দিতেন। তারা বলতেন, তোমার মায়ের হাতের রান্না যে খেয়েছে তার জীবন সার্থক।
বাড়িতে মাহে নাও, সওগাত, মাসিক মোহাম্মদী ম্যাগাজিন আসতো। আমার বাবা, ভাইয়েরা বাড়িতে আসার সময় খবরের কাগজ নিয়ে আসতেন। সেগুলো তিনি পুংখানুপুংখ রূপে পড়তেন এবং সংরক্ষণ করতেন। সেজন্য সমসাময়িক পৃথিবীতে কোথায় কি ঘটছে সব জানতেন। তিনি প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ দেখেছেন, খবর রেখেছেন। উনার নিকট থেকে পরবর্তী কালে আমরা এসব যুদ্ধের অনেক তথ্য জানতে পারি। জাপানীদের রেঙ্গুন আক্রমনের পুরো ঘটনা তার কাছ থেকেই শুনেছি। ইতিহাসে যা পড়েছি তার চেয়েও বেশী। কারণ আমার ছোট মামু মোহাম্মদ জাকারিয়া তখন রেঙ্গুনে চাকুরী করতেন। আক্রমনের সময় বাংকারে চলে যান। পরে সেখান থেকে বের হয়ে ৯ দিন ৯ রাত আসামের জঙ্গলের ভিতরে হেঁটে সিলেটের সীমান্তে এসে পৌঁছান।
জুবাইদা খাতুন মুগলদের ইতিহাস পড়তেন। নবাব সিরাজুদ্দৌলার কথা, পলাশীর প্রান্তরে মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কথা সব যুদ্ধের গল্প আমাদেরকে বলতেন। ধর্মের সকল পুস্তক তার কন্ঠস্থ ছিল। কোরান হাদিসের কথা মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন। পুঁথি সাহিত্যে তার দখল ছিল। সুন্দর সুললিত কণ্ঠে পুঁথি পাঠ করতেন। গ্রামে তাকে সকলেই ভালবাসতো। মেয়েরা যে কোন সমস্যা নিয়ে সর্বদা তার কাছে আসতেন। ধর্মীয় পরামর্শ ও শিক্ষা তার কাছ হতেই নিতেন। আমার মায়ের রাগ ছিলনা। ছিলনা কারো বিরুদ্ধে বিদ্বেষ। তিনি ছিলেন সহনশীলতার প্রতীক। একটি আলোর প্রদীপ। যে আলো মানুষকে পথ দেখায়, দহন করেনা। পরবর্তীতে রেডিও আসার পর নিয়মিত খবর শুনতেন। তিনি গ্রামের মেয়েদের পথ প্রদর্শক ছিলেন।
আমার পিতা অত্যন্ত প্রতাপশালী এবং দাপটের লোক ছিলেন। সমাজ সেবা তার জীবনের আদর্শ। আজকালকার যুগে যেমন স্বামী স্ত্রীরা একসঙ্গে পরামর্শ করে ঘর-সংসার পরিচালনা করেন, সে যুগে তেমনটি ছিলনা। তখন গৃহকর্তা ছিলেন সকলেরই গার্জিয়ান। তার নাম হুকুম আর বাকীদের নাম তামিল। এই হুকুমের নড়চড় নেই। সেই কারণেই আমার পরিশিলিত হৃদয়বান, সংস্কৃতিবান মাতা জুবাইদা খাতুন নিঃসঙ্গ ছিলেন। বই –পত্র পত্রিকা, কবিতা, ছড়া, গজল, এসবকে সঙ্গী করে নিমগ্ন থাকতেন। অবসর সময়ে আলস্যে ব্যয় করতেন না। তবে তার কোন আফসোস ছিলনা। একাকীত্বের মাঝেও তিনি পূর্ণতা লাভ করেছেন বইয়ের মধ্যে। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই। অনুযোগ নেই। পিতা আব্দুস সোবহান বিশ্বাস রাগী হলেও আমার মায়ের উপর ছিল অগাধ বিশ্বাস আর পরম নির্ভরতা। কোন সিদ্ধান্ত নেবার আগে মাকে জানাতেন। লেখাপড়া শেষে আমরা দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়লাম। পিতা অবসর নিলেন। বাড়িতে এলেন। ধর্ম-কর্ম, সমাজসেবায় আরো মনোযোগী হলেন। মাতা ঘর-সংসার আর শ্বাস কষ্টকে সঙ্গী করে চলতে লাগলেন। সবকিছুই একদিন শেষ হয়। তাই তিনিও ১৯৮২ সালের ২৬ শে জুলাই সকল মমতার বন্ধন ছিন্ন করে জান্নাতবাসী হলেন।
মা শব্দটি কত না মধুর। কতই না সুন্দর। অনেক ভাষায় আমার জানামতে, মা শব্দের সঙ্গে ‘ম’ শব্দটি জড়িত এবং ‘ম’ তেই মধু। মাতা একটি পরিবারের পত্তন। পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু। সন্তানের জননী। সন্তানের চাইতে প্রিয় ধনসম্পদ মায়ের কাছে আর কিছুই নেই। দিবা রাত্রি অষ্টপ্রহর মা বক্ষে জড়িয়ে তার সন্তানের সেবা –যত্ন আর নিরাপত্তা রক্ষা করে থাকেন। তার লেখাপড়ার হাতেখড়ি থেকে শুরু করে মানুষের মত মানুষ করবার প্রয়াসে নিয়োজিত থাকেন। আমাদের মা আমাদেরকে সৎ এবং সুশীল মানুষ হবার দীক্ষা দিয়েছেন। পরম সতর্কতার সঙ্গে আমাদের মানসিক বিকাশের পথ সুগম করে দিয়েছেন। তাই তাঁর সন্তানেরা আজ নিজের নিজের জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত। পরের জন্য তাদের হৃদয় কুসুমকে প্রস্ফুটিত করেছেন। এমন মায়ের সন্তান হয়ে আমরা গর্বিত। সার্থক জনম মাগো জন্মেছি তোমার কোলে। তোমার আত্মা পরম শান্তি লাভ করুক অনন্তকাল – এই প্রার্থনা আমার।

No comments:
Post a Comment