Showing posts with label স্মৃতিচারণমূলক - নিভে গেল আলোর শিখা. Show all posts
Showing posts with label স্মৃতিচারণমূলক - নিভে গেল আলোর শিখা. Show all posts

Tuesday, March 24, 2026

স্মৃতিচারণমূলক - নিভে গেল আলোর শিখা


তিনি ছিলেন আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। সেই শিশুকাল হতে যার কোলে পিঠে আমি মানুষ হয়েছি। অক্ষর চিনেছি, কলম ধরতে শিখেছি। সেই অন্ধকার যুগে যিনি আমাকে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পথ চিনিয়েছেন। পাঠ্য পুস্তকের বাইরে প্রতিটি ক্ষেত্রে যিনি আমাকে জ্ঞান দান করেছেন, অজানাকে জানবার দরজা খুলে দিয়েছেন। নিজে চাকুরী গ্রহন করবার পর থেকে আমার লেখাপড়ার খরচ বহন করেছেন – তিনি আমার এই ভাই – লে. কর্নেল ডাঃ হাফিজ আহমেদ –আমার দাদু। মেধা ও মননে তুলনাহীন একজন ব্যাক্তি। তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, ক্ষুরধার প্রতিভা, অপরিসীম জ্ঞান মানুষকে অভিভূত করেছে। তাঁর সংস্পর্শে যারা এসেছেন তারা তাঁর কাছে ঋণী। ক্ষণিকের উপস্থিতিতেও তারা জ্ঞান বা সদুপদেশ লাভ করেছেন। তাঁর ক্ষমাশীল অন্তর নিরন্তর মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত ছিল।

তিনি পেশায় ছিলেন চিকিৎসক। আর্মি মেডিকেল কোরের একজন দক্ষ অফিসার। প্রথমে  আজাদ কাশ্মীরে, পরে পাকিস্তানে, পরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে তিনি লে. কর্নেল হিসেবে চাকুরী থেকে অবসর গ্রহন করেন। মানুষের সেবা করাই ছিল তার ব্রত। অসুস্থ  ব্যাক্তির চিকিৎসার বন্দোবস্ত করা, কারো অর্থকষ্ট দূর করা, ক্ষুধার্ত লোকের অন্ন সংস্থান করা, চাকুরী দেওয়া –এইসব ছিল তার নিত্যদিনের কাজ। তার উপকার পায়নি এরকম কেউ নেই। 

শিশুদের ভালবাসতেন তিনি। খেলাচ্ছ্বলে তাদেরকে জ্ঞান দান করতেন। মজার মজার কথা বলে তাদের বুদ্ধির সলতে উসকে দিতেন। তাদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন প্রাইমারি স্কুল নিজের বাড়ির আঙ্গিনায়। শিশুরা তাকে খুব পছন্দ করত। সবসময় তার পিছনে ঘুরতো। আমরা বলতাম, ‘দাদু, তুমি হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। তোমার কাছে জাদু আছে।’

আজাদ কাশ্মীর ও ভারত সীমান্তে একবার প্রচন্ড যুদ্ধ হয়। চারিদিকে বোমা বৃষ্টি। যত্রতত্র মানুষের লাশ পড়ে আছে। এক যুদ্ধাহত সহকর্মীর আর্তনাদ তার অন্তরকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। তিনি নিজের বিপদ তুচ্ছ করে তাকে কাঁধে তুলে বিপদ মুক্ত এলাকায় নিয়ে আসেন।

 


সাহিত্য এবং কাব্যচর্চা ছিল তার সহজাত বৃত্তি। ‘বনফুলের’ মত ডাক্তার হয়ে তিনিও একজন সাহিত্য প্রেমিক ছিলেন । যে কোন বিষয়ে তার কলম থেকে বের হয়ে আসতো সুন্দর এবং সুখ পাঠ্য একটি রচনা। যাযাবরের দৃষ্টিপাত ছিল তার মুখস্থ। রবীন্দ্রনাথ ছিল তার আত্মস্থ। বাংলা বানানের উপর তিনি গবেষণা করেছেন। শুদ্ধ বানান এবং শুদ্ধ উচ্চারণের রীতির তিনি এদেশে একজন পথিকৃত। সহজ পদ্ধতিতে বাংলা বানান কিভাবে লেখা যায়, তার উপায় তিনি বহু রচনায় প্রকাশ করেছেন। শিক্ষিত সমাজকে সচেতন করবার জন্য বানান রীতির উপর প্রচুর সহজ নিয়ম বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় দীর্ঘদিন চিঠিপত্র কলামে এইচ. আহমেদ নামে প্রচার করে গিয়েছেন। রম্য রচনায় তিনি ছিলেন সিদ্ধ হস্ত। প্রচার বিমুখ ছিলেন বলে তার লেখাসমূহ বই আকারে প্রকাশ করেন নি।          

বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে আমার পিতা একটি আলোর শিখা স্বরূপ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বহু সংগ্রাম করে তিনি এলাকায় আলোর সন্ধান দিলেন। তাঁরই ফেলে যাওয়া শিখাটি লে. কর্নেল. হাফিজ আহমেদ মশাল হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি আমার পিতার প্রতিষ্ঠিত স্কুলটিকে বহু সংগ্রাম করে সরকারীকরণ করেন। সেটিকে নিজের উঠানে সরকারি সহায়তায় দালান নির্মাণের ব্যবস্থা করেন। বর্তমানে সেখানে দুটি দালানে ছেলেমেয়েদের ক্লাস চলে। স্কুলটি তিনি তার মায়ের নাম অনুসারে নামকরণ করেছেন। স্কুলটির নাম ‘জুবাইদা ফিরোজা সরকারী প্রাইমারি স্কুল –হরিরামপুর।’

ছাত্র ছাত্রীরা এই স্কুল থেকে প্রাইমারি পাশ করে অন্যান্য হাইস্কুলে যাচ্ছে। কেউ কেউ উচ্চশিক্ষার পথে আগ্রসর হচ্ছে। গ্রামের অনেক ছেলেমেয়ে এখন অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন। শহরে বন্দরে আজ তাদের পদচারণা। সভ্যতা এবং প্রযুক্তির সঙ্গে তাদের পরিচয় ঘটছে। ডা. হাফিজ আহমেদ গ্রামে পাকা রাস্তা ঘাট নির্মাণ করে দিয়েছেন। তারও বহু বছর পূর্বে আমার পিতা আব্দুস সোবহান বিশ্বাস সেই ব্রিটিশ আমলে বর্তমান রাস্তার নকশা তৈরী করে কাঁচা রাস্তা বানিয়ে গিয়েছিলেন। আমার দাদু আমাদের অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবররাহের ব্যবস্থা করেছেন। এখন ঘরে ঘরে বৈদ্যুতিক আলো জ্বলে। কেরোসিনের কুপি আর নাই। গ্রামে যান্ত্রিক যানবাহন অনবরত চলছে। মানুষ সর্ব পর্যায়ে একটু উন্নত জীবনের সন্ধান পেয়েছে। 

আমার ভ্রাতা একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ। রাস্তা, ঘাট, স্কুল, মাদ্রাসা এবং অনেক সমাজ হিতৈষী কাজ তিনি করেছেন। তার মত নম্র ভদ্র বিনয়ী সুশিক্ষিত মানুষ একটি দৃষ্টান্ত স্বরূপ। তার মত আদর্শ মানুষ বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে জন্মগ্রহণ করুক এই আমার প্রার্থনা। 

তিনি তার পিতা মাতার খুব খেয়াল রাখতেন। তাঁদের যত্ন, তাঁদের চিকিৎসার কোন ত্রুটি করেননি। তার ন্যায় এরকম সুপুত্র ভাগ্যবান পিতার ঘরেই জন্মায়। তার মানবতা বোধ ছিল সীমাহীন। যেখানেই মানুষের দুঃখ কষ্ট সমস্যা সেখানেই তিনি। তিনি সকলের আপনজন। সেই মানুষটি নিরলস পরিশ্রম করে গিয়েছেন সারাটি জীবন। নিজের জন্য কোন সময় রাখেন নি।তার ফুসফুস যে তিলে তিলে আক্রান্ত হয়েছে,সে খবরও তিনি পাননি। শারীরিক সমস্যাগুলোকে উপেক্ষা করে দিব্যি পরের কাজ করে, চলে ফিরে বেড়াতেন।ফুসফুসের ক্যান্সার তার সম্পূর্ণ সুস্থ শরীরে চুপিসারে বাসা বাঁধলো। যখন রোগ ধরা পড়লো তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে।চার মাস মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ঢাকা সি. এম. এইচ. -এ ৯ই জুন, ২০১২ শনিবার ঠিক দুপুর বারোটায় অচীনপুরে চলে গেলেন। এই কয়েকটি মাস ক্রমাগত চিকিৎসার সময় তার শরীরে অন্য  কোন অসুখ ছিল না, যন্ত্রণা ছিল না। জ্ঞান বুদ্ধি ছিল আগের মত প্রখর ও অটুট। নিজে ডাক্তার ছিলেন। নিশ্চিত মৃত্যুর পরোয়ানা হাতে পেয়েও নির্ভিক চিত্তে মৃত্যুকে বরণ করে নিলেন।

তিনি আমাদের খুব প্রিয় ছিলেন। মারা যাবেন সে কথা কখনও বলতেন না। পাছে আমাদের হৃদয় যমুনা উথলে উঠে। একদিন বললেন, ‘মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে।’ চুপ করে রইলাম আমি। মনে হলো তাঁর খুব কষ্ট হচ্ছে। বললেন, ‘আমার মা নেই। যদি থাকতেন তবে তোমরা তার কাছে জানতে চাইতে আমার কথা।’ 

তারপর বললেন, 

‘বাঁশ বাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ঐ / মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই?/ 

ওঘর থেকে কেন মা আর দিদি আসে না কো / দিদির কথায় আঁচল দিয়ে মুখটি কেন ঢাকো?’

এইটুকু বলে চুপ করে চোখ বন্ধ করে রইলেন –যেন ক্লান্তি বোধ করছেন। আমারও গলা ধরে আসছিল, আমিও চুপ করে থাকলাম। বললাম, ‘আর কথা বলো না।’  তিনি বললেন, ‘আর কবে কথা বলবো।’ 

.........

উৎসর্গ

 আমার পিতাকে যাঁর জীবনের পাথেয় ছিল আপোষহীন নীতি আর শৃঙ্খলা।   আমার মাতাকে ছেলেমেয়েদের মেধা ও মননশীলতায় যিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। আমার স্বামী...