বিশ শতকের গোড়ার কথা। গ্রাম বাংলা গভীর তমশায় আচ্ছন্ন। বিশেষ করে ত্রিশাল থানার হরিরামপুর এলাকা। বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এক প্রত্যন্ত পল্লী অঞ্চল। শিক্ষা দীক্ষার অভাব, এক নিরক্ষর জনপদ। সাদা পুস্তকের ভিতর কালো অক্ষর কি বলে, তা তাদের চিন্তার বাইরে। তবে কেউ কেউ আরবী অক্ষর চেনেন। মসজিদে ইমামতি করেন।
আমাদের এ অঞ্চল যখন গভীর আঁধারে ঢাকা, কালো অন্ধকার চাদরে জনপদ আবৃত, কোথাও কোন আলোর চিহ্ন নেই, সেই সময় হয়তো দূর দিগন্তের ওপার হতে একটি নক্ষত্রের আলো ভেসে আসে। এবং সেটি উজ্জ্বলতর হতে হতে আমাদের হরিরামপুর গ্রামে এসে পতিত হয়। আমার পিতা জন্ম লাভ করেন। সেই নক্ষত্রের দেশ থেকে অবতরণ করে, এই মাটির পৃথিবীর এক কোণে দীপ্তিমান আলোর বিচ্ছুরণ ঘটান। সেটি ছিল ১৮৯৯ সাল। তিনি ছিলেন ‘স্টার চাইল্ড’ –বিধাতার বর প্রাপ্ত। যিনি সুদূর আকাশ থেকে একটি আলোর প্রদীপ এনে পরবর্তীকালে আমাদের অঞ্চলকে আলোয় উদ্ভাসিত করেছেন।
জন্মের তৃতীয় বছরেই তিনি পিতাকে হারান। তাই পিতার ছত্রচ্ছায়া কি, অভিভাবক কি তা তার জানা ছিল না। একমাত্র মা তার সবকিছু। মাতা ছিলেন অত্যন্ত প্রখর বুদ্ধিমতী এবং দৃঢ় চিত্তের মহিলা। তিনি একাই তার পথপ্রদর্শক। চার পুত্র আর দুই কন্যা নিয়ে তার জীবন পরিক্রমা।
আমার বাবার শিশুকাল। শৈশবের আনন্দ তার ধরা ছোঁয়ার বাইরে ছিল। বাড়ির আঙ্গিনায় অন্য শিশুদের সঙ্গে বিকেলে একটু খেলাধুলা করতেন। বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে হিন্দু ছেলেরা যাতায়াত করতো। বালক অবাক হয়ে মা কে শুধায়,
- এরা ধুতী ফতোয়া পরে হাতে স্লেট পেন্সিল নিয়ে কোথায় যায় মা?
মা বলেন, ওরা পাঠশালায় যায়।
- পাঠশালা কি, মা?
- পাঠশালায় ওরা লেখাপড়া করে।
- আমিও যাব। আমিও লেখাপড়া করবো।
- না, ওরা হিন্দু। ওদের পড়া আমাদের পড়া এক নয়। আমাদের পড়া মক্তবে। ঐ যে জুমার ঘরের পাশে ছনের ছাউনি দেওয়া ঘরখানি, ওটাতে তুমি পড়তে যাবে, আরেকটু বড় হয়ে।
বালক বলে, না মা, ওখানে আমি যাব না। হিন্দুদের পাঠশালায় যাব। মা বললেন, তোমার নাম আব্দুস সোবাহান, তোমাকে ওরা নেবে না। ওদের পড়া বাঙলা। ছেলের পীড়াপীড়িতে মা অতিষ্ঠ হয়ে তাকে মক্তবে নিয়ে যান। মৌলবী সাহেব নাম লিখে নিলেন। শুরু হলো পাঠ দান। প্রথম পুস্তকের নাম ‘কায়েদা’। আরবী অক্ষর পরিচয় এবং পাঠ শিক্ষা। অল্প দিনেই তার কায়দা পড়া শেষ। তারপর শুরু হলো, শিক্ষা কোরান তেলাওয়াৎ। তাও শেখা শেষ। তখনকার দিনে একটি ঘরে সব বিষয় পড়ানো হতো। লেখার রীতি ছিল না। ক্লাশরুম ছিল না।
এবার কি পড়বে? অস্থির মতি বালককে নিয়ে মা পড়লেন বিপাকে। তিনি তার জ্যেষ্ঠ পুত্রদের পরামর্শ চাইলেন। তারা একবাক্যে সব উড়িয়ে দিয়ে বাস্তবে পদার্পণ করার উপদেশ দিলেন। ওসব ঝামেলা বাড়িয়ে কাজ নেই। বাংলা পড়ার প্রয়োজন কি। আমরা তো লেখাপড়া শিখি নাই। তাতে তো ক্ষতি দেখি না। তোমার ছোট ছেলের অদ্ভুত চিন্তা ভাবনা মাথা থেকে নামাও। ওকে সময় মতো কাজে লাগাও। নয়তো উচ্ছন্নে যাবে। ওর মতিগতি বড়ই অস্থির। আমাদের মতো নয়। সত্যিই তিনি অস্থির চিত্তের অধিকারী ছিলেন। ছিলেন নির্ভীক প্রকৃতির। একাই শিশুকালে বড় চিন্তা করতে পারতেন। ছোট হলেও তার সিদ্ধান্ত তিনি নিজেই নিতেন। তাকে সাহস দেবার, পথ দেখাবার কেউ ছিল না। মা শিরে হাত দিয়ে ভাবতে থাকেন। একদিকে মাতৃস্নেহ, অন্যদিকে বাস্তবতা। বড় কঠিন সমস্যা। একদিন ছেলের হাত ধরে একটি শাড়ি চাদরের মতো ভাঁজ করে গায়ে জড়িয়ে ছোট্ট নদীটির সাঁকো পার হয়ে চলে গেলেন ওপারের পাঠশালায়। শিক্ষক গিরিশ বাবু। ভ্রু কুঁচকে অবাক চোখে তাকালেন,
- কি চাই বিবি?
তখনকার দিনের সম্ভ্রান্ত মুসলমান মহিলাদেরকে বিবি বলে সম্বোধন করা হতো। তিনি তার পুত্রের পড়ালেখার প্রতি আগ্রহের কথা ব্যক্ত করলেন। গিরিশ বাবু বিস্মিত হলেন। বললেন, পারবে?
তিনি বললেন, পারবে না কেন? মক্তবের পড়া শেষ করতে তার একবছরও লাগেনি। যেখানে অন্য ছেলেরা বছরের পর বছর ধরে পড়ছে।
মাস্টার মশাই বললেন, ঠিক আছে কাল নিয়ে আসেন। পরের দিন আমার সাহসী দাদী তার দুঃসাহসী পুত্রকে নিয়ে স্কুলে গেলেন। মাস্টার মশাই বললেন, ধুতি, ফতোয়া লাগবে। আর লাগবে শ্লেট পেন্সিল, বাংলা আদর্শ লিপি বই। এতসব জিনিসপত্র জোগাড় করা সহজ ছিল না সেই সময়ে। আমার বাবার সেই থেকেই শুরু হলো সংগ্রাম। উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে তিনি ঘোড়ার গতিতে এগিয়ে যেতে লাগলেন। কিন্তু বাধ সাধলো পাঠশলার ছেলেরা। একমাত্র মুসলমান ছেলে তাদের মাঝে পেয়ে কৌতুক বোধ করতে লাগলো। তাকে তারা উত্যক্ত করতে লাগলো। একদিন তিনি সতীর্থদের বাক্যবাণ সহ্য করতে না পেরে একজনকে চড় মেরে বসলেন। গিরিশ বাবু রেগে গিয়ে অগ্নিমূর্তি ধারণ করলেন। তিনি নতুন ছাত্রকে হাতের কঞ্চি দিয়ে আঘাত করলেন। ছোট হলেও নতুন ছাত্রের ছিল প্রচন্ড রাগ। তিনি অপমানিত বোধ করলেন। কাঁদতে কাঁদতে গড়াগড়ি খেতে খেতে বাড়ির দিকে আসতে লাগলেন। গাঁয়ের লোকেরা খবর পৌঁছালো আমার দাদীর কাছে। তিনি ছুটে গেলেন। সাঁকোর ওপার হতে পুত্রকে কোলে তুলে নিয়ে বাড়িতে এলেন। তার খুব জ্বর হলো। কবিরাজ ডাকা হলো। সে সময়ে কবিরাজের ফি ছিল সোয়া পাঁচ আনা। এরমধ্যে গিরিশ বাবু বাড়িতে এলেন। জানতে চাইলেন ছাত্র স্কুলে যায় না কেন। আমার দাদী গিরিশ বাবুর ব্যবহারে মর্মাহত ছিলেন। বললেন,
- আপনি শিক্ষিত বয়স্ক মানুষ। আমার এতটুকু ছেলের গায়ে হাত তুললেন? স্কুলের একটিমাত্র ঘরের ভেতরে গত একমাসে প্রতিদিন আমার ছেলেকে অপমান করা হচ্ছে। আপনি তা লক্ষ্য করেন নি। লক্ষ্য করেছেন যখন আমার ছেলে মাত্র একদিন কাউকে প্রতিহত করবার জন্য থাপ্পড় মেরেছে। আপনিও ভেদাভেদ করছেন। কেন? মুসলমান হওয়া কি অপরাধ? তাদের কি লেখাপড়া করার অধিকার নেই? এটা কি একটা অন্যায় ? আমরা কি কোম্পানীর (East India Company) খাজনা দিই না? সেরে উঠুক, তাকে মাদ্রাসাতে ভর্তি করে দিয়ে আসবো। আপনাদের মতো এত বড় লেখাপড়ার দরকার নেই।
মাস্টার বাবু সেদিনকার ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন। বললেন, ওকে পাঠশালায় পাঠিয়ে দেবেন, আমি দৃষ্টি রাখবো। বার্ষিক পরীক্ষার মাত্র একমাস বাকী, দেখি সে কেমন করে। সে লেখাপড়ায় মনোযোগী। তার দুই দিন পর আমার দাদী তার পুত্রকে পাঠশালায় রেখে এলেন। আমার বাবা ছিলেন তুখোড় ছাত্র। লেখাপড়ায় মন দিলেন। বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে দ্বিতীয় শ্রেনীতে উত্তীর্ণ হলেন। ছেলেরা চমকে উঠলো। তারপর থেকে সতীর্থরা তাকে সমীহ করতো।
ব্রিটিশ আমলে চতুর্থ শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষা হাইস্কুলে গিয়ে দিতে হতো। অনেকটা বোর্ডের পরীক্ষার মতো এবং সেটার একটা বিশেষ কদর ছিল। আমার বাবা ভাল রেজাল্ট করে প্রাইমারি অতিক্রম করে এলেন। গিরিশ বাবু নিজে বাড়িতে এসে বললেন, বিবি, আপনার ছেলে উচ্চশিক্ষার উপযুক্ত। তাকে হাইস্কুলে পাঠাবার ব্যবস্থা করেন।
দাদীর মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। তিনি তার ছেলেদেরকে ডাকলেন। সব শুনে তারা বললেন, আমাদের পিতা নেই। কেবল জমিজমা থাকলেই হবে না। তার থেকে ফসল ঘরে তোলা চারটি খানি কথা নয়। বর্গা দেওয়া সব জমি। অর্ধেক ফসল ঘরে আসে। সংসারে মুখ বেড়েছে। সুতরাং আমরা এসবের মধ্যে নেই। পুস্তক কেনার জন্য কাঁচা টাকা বের করা সম্ভব নয়। আপনি আমাদেরকে জুদা করে দেন। যার যার সংসার সে নিজে দেখেশুনে রাখুক। দাদী বিষন্ন হলেন। পরবর্তীতে শুনেছি, তিনি বলতেন, দু’পয়সার পুস্তকের জন্য আমার পুত্রেরা পৃথক হাড়ি চড়ালো। কনিষ্ঠ পুত্রের দৃঢ় ইচ্ছার ফলে আমার দাদীর পরিবার খন্ড খন্ড হয়ে গেল। আমার পিতা এক ঐশ্বরিক শক্তির বলে এগিয়ে চললেন।
আমার পিতা গফরগাঁও হাইস্কুলে ভর্তি হলেন। বিদ্যালয়ের দূরত্ব বাড়ি থেকে ছয় মাইল। প্রতিদিন পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতে হতো। আজকের দিনে যা কল্পনা করে দুরূহ। যেতে আসতে সব সময় ব্যয় হয়ে যেত। সেজন্য আমার বাবা জায়গীর থাকার ব্যাবস্থা করলেন। তখনকার দিনে এটি একটি প্রচলিত প্রথা ছিল। এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তিনি লজিং থাকলেন। মেধাবী ছাত্র আদর্শ ছাত্র যাকে বলে তিনি ছিলেন তাই। সেই বাড়ীতে থেকে তিনি তাদের ছোট ছেলেদের পড়াতেন। তার পরিবর্তে তাদের স্নেহ মমতাও পেয়েছেন খুব। তারা তাকে বাড়ির ছেলের মতোই গণ্য করতেন।
যথাসময়ে আমার বাবা এন্ট্রান্স (Entrance) পরীক্ষায় ভাল ভাবে উত্তীর্ণ হন। সেটা ছিল ইংরেজী ১৯১৯ সাল। তিনি বলতেন সেই সময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
এখানে আমার পরম শ্রদ্ধেয় পিতার চরিত্রের একটি উল্লেখযোগ্য দিক বর্ণনা করতে হয়। স্কুলের নিয়ম কানুন তিনি মেনে চলতেন। শিষ্টাচার বজায় রাখতেন। ভাল ছাত্র এবং আদর্শ ছেলে হিসাবে তিনি সকলের কাছে পরিচিত ছিলেন। সেজন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে অনুষ্ঠান করে ‘বিশ্বাস’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এটি একটি অসাধারণ পুরস্কার। এরপর থকে তিনি আবদুস সোবাহান বিশ্বাস নামে পরিচিতি লাভ করেন।
তিনি বাড়িতে ফিরে এলেন। গ্রামের লোকেরা খুব খুশী হলো। একজন শিক্ষিত লোকের স্বভাব চরিত্র আচার আচরণ কেমন হয় তা দেখবার সুযোগ পেল। তারপর শুরু হলো তার প্রকৃত জীবন সংগ্রাম। কলেজে ভর্তি হতে চাইলেন। টাকার প্রয়োজন। বইখাতা, বেতন, শহরে থাকার অন্যান্য খরচ জোগাড় করা এক অসম্ভব ব্যাপার । গ্রামের জমিজমা থাকলেও হাতে টাকা থাকে না। কারণ ধান বিক্রির টাকা দিয়ে সংসারের যাবতীয় খরচ চালাতে হয়। আমার বাবা ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ পাড়ি দেবার জন্য দুর্দমণীয় সাহস নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চললেন।
আমার দাদী, ছোট ফুফু, আমার বাবা – এই তিনজনের সংসার। হাতে টাকা নেই। আমার বাবা তাদের পরগণার জমিদারের সাক্ষাৎকার প্রার্থনা করে দরখাস্ত করেন। তখন তাদের জমিদার ছিলেন রাজা জগৎকিশোর। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় ছিল তাদের বিরাট প্রাসাদ। ময়মনসিংহের টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, মহিলা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ (শশী লজ) – এসব স্থাপনা তদেরই কীর্তি। যথাসময়ে সাক্ষাৎকারের জন্য জমিদার বাড়িতে গেলেন আমার পিতা। সাদা ধুতি, সাদা শার্ট, কালো জুতা পরিধান করে হাজির হলেন জমিদার বাড়িতে। দর্শনও মিললো তার। আমার পিতা তার বক্তব্য পেশ করলেনঃ তিনি পিতৃহীন, লেখাপড়ায় খুব আগ্রহ, রেজাল্ট ভাল কিন্তু আর্থিক আনুকুল্য নেই। সেজন্য কলেজে ভর্তি হতে পারছেন না। একটা বৃত্তির ব্যবস্থা হলে তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহন করতে পারতেন। বিবরণ শুনে জমিদার বাবু বললেন, ‘Listen, higher education is not for the poor. গ্রামে যে জমিজমা আছে তাই দেখাশুনা কর। চলে যাবে।’
জমিদার বাবুর সঙ্গে আর কথা বলার উপায় নেই। ভগ্ন মনোরথে ফিরে এলেন বাড়িতে। শুনে দাদী আঁচল দিয়ে নিজের চোখ মুছলেন। ছেলের মুখের ঘাম মুছে দিলেন।
আমার বাবা খুব সাহসী ছিলেন। ঐটুকু বয়সেই কারো পরামর্শ ছাড়াই নিজে সাহস করে প্রচন্ড প্রতাপশালী জমিদারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন। এটা কম কথা নয়। মিশন ব্যর্থ হলেও তার সাহসের তারিফ করতে হয়। পরে তিনি মুক্তারী পড়েছিলেন। কিন্তু সে পেশা জীবনে গ্রহন করেননি।
তারপর শুরু চাকুরীর অনুসন্ধান। দারোগার চাকুরী পাওয়া গেল। ভাবনায় পড়ে গেলেন। মনস্থির করলেন পুলিশের চাকরী করবেন না। পরে পেলেন সাব রেজিস্ট্রারের চাকরী। এটাও মনপুতঃ হলো না। এখানেও সততা বজায় রাখা কঠিন। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলেন শিক্ষকতাই সর্বোত্তম পেশা। সৎ ও সুন্দর জীবন যাপন শিক্ষকতাতেই সম্ভব। হয়তো আর্থিক অনটন থাকবে। তিনি জামালপুর এলাকায় সিংজানী স্কুলে প্রথম শিক্ষকের চাকুরী গ্রহন করেন। একবছর চাকুরী করার পর তিনি নলিনী মোহন দাস (মাখন দাস), মৌলবী জয়েন উদ্দিন, রিয়াজ মাস্টার, এস কে বসু এবং আরো অনেক উচ্চ শিক্ষিত জ্ঞানী ও গুনী ব্যাক্তিদের প্রচেষ্টায় নান্দিনা মহারাণী হেমন্তকুমারী উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয় স্থাপনে উদ্যোগী হন। স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। শিক্ষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে ধীরে ধীরে এটি একটি অনন্য সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্থান অধিকার করে। শিক্ষকরা ছিলেন নিবেদিত প্রাণ ও বিদ্যোৎসাহী। ছাত্ররাও তেমনি ছিলেন তুখোড় ও শৃংখলাবদ্ধ।

শ্রী শৈলেন্দ্রনাথ চৌধুরী, বঙ্কিম রাও, সুরেন্দ্রনাথ রক্ষিত, বিধুবাবু এবং অনেকের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে এই স্কুলের ছাত্ররা দেশের সেরা মানুষ হিসাবে বেরিয়ে আসে। এটি আদর্শ বিদ্যাপীঠ হিসাবে দেশে সুনাম অর্জন করে। শিক্ষকের সততাই ছাত্রের পথপ্রদর্শক। আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা নাজির আহমেদ নান্দিনা স্কুলের ছাত্র ছিলেন। তিনি ভারত বিভাগের পূর্বে Undivided Bengal –এ ক্যালকাটা শিক্ষাবোর্ডের এন্ট্রান্স (SSC) পরীক্ষায় পঞ্চম স্থান অধিকার করে বিশেষ কৃতিত্বের অধিকারী হয়েছিলেন। তিনি পাঁচ বিষয়ে লেটার মার্কস অর্জন করেছিলেন। বৃত্তি পেয়েছিলেন। উল্লেখ্য তখনকার দিনে সেই ১৯৪৩ সালে লেটার মার্কস লাভ করা খুব দুরূহ ব্যাপার ছিল। লেখাপড়ার মাধ্যম ছিল সেই ব্রিটিশ আমলে ইংরেজী। স্কুল প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অনেক কাঠ খড় পোড়াতে হয়েছে। কঠোর পরিশ্রমের দ্বারা তারা এই স্কুলকে এতো উন্নত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
সেই সময়ে আজকের দিনের মতো এতো হস্টেল ছিল না। আমার বাবা আবদুস সোবাহান বিশ্বাস, রিয়াজ উদ্দিন মাস্টার সাহেবের বাড়িতে জায়গীর থাকতেন। আমার বড় ভাই নাজির আহমেদ, খলিলুর রহমান (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) সাহেবের পিতা জয়েন উদ্দিন মৌলবী সাহেবের বাড়িতে জায়গীর থাকতেন। পরে আমার পিতা একখন্ড জমি ক্রয় করে সেখানে একটি বাড়ি নির্মাণ করেন। তখন তিনি আমার ছোট ভাই আজিজ আহমেদকে নিয়ে ওই বাড়িতে বসবাস করতেন।
আমার ভাইয়েরা নান্দিনা স্কুলের ছাত্র। বড় ভাই নাজির আহমেদ ক্যালকাটা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে কৃতিত্বে সঙ্গে আই. এস. সি. পাশ করেন। সব বিষয়ে তার সমান দক্ষতা। শেষ পর্যন্ত মেডিক্যাল লাইনে বিদ্যাঅর্জন করবার সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। ভর্তি হন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে। সেখানে তিনি তুখোড় এবং ভাল ছাত্র হিসাবে পড়াশুনা করছিলেন। ছাত্র রাজনীতিতেও ছিলেন অগ্রগামী। এই সময়ে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া নানান ঘাত প্রতিঘাত, যুদ্ধ বিগ্রহ, সিপাহী বিদ্রোহ, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তুংগে অবস্থান করছিল। ‘বন্দে মাহতরম’ শ্লোগানে প্রকম্পিত ভারত। শেষ পর্যন্ত বড়বড় নেত্রীবৃন্দ ব্রিটিশ শাসকদেরকে ভারত ত্যাগ করতে বাধ্য করলো। ব্রিটিশের ভারত ত্যাগ এবং ভারত বিভাজন পৃথিবীর ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। ভারত বিভক্তির ফলে পাকিস্তান ও হিন্দুস্থানের জন্ম হয়। পাকিস্তান পায় দুটি ভূখন্ড - একটি ভারতের পশ্চিম অংশে পশ্চিম পাকিস্তান, অন্যটি পূর্ব বংগ অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান। এই পূর্ব পাকিস্তানই আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। ব্রিটিশগণ ভারত ছাড়ার সময়ে হিন্দু মুসলিম দাংগা লাগিয়ে দিয়ে যায়। ফলে বহু মানুষ নিহত হচ্ছিল। তখন আমার ভাই নাজির আহমেদ অনন্যোপায় হয়ে অতি কষ্টে নিজের মুসলমান পরিচয় গোপন রেখে এক কাপড়ে শিয়ালদহ স্টেশনে রওনা হন। ট্রেনের বাইরে ও ভিতরে বাঙ্গালী মুসলমান বোঝাই। তিল ধারণের ঠাঁই নাই। দুই জন কুলিকে চার আনা, চারা আনা করে পয়সা দিয়ে ট্রেনের কামরার জানালা দিয়ে তাকে ঢুকিয়ে দেবার ব্যবস্থা করেন। অনেক কষ্টে তারা তাকে ঠেলে ঠুলে ভিতরে ঢুকিয়ে দিল। গাদাগাদি অবস্থায় তিনি ময়মনসিংহ রেল স্টেশনে অবতরণ করেন। তারপর অন্য ট্রেন ধরে ধলা স্টেশনে পৌঁছেন। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে বাড়ি পৌঁছান।
কয়েকদিন বিশ্রাম নেবার পর পিতার আদেশে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন। এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ছাত্র হিসাবে যোগদান করেন। এখানেও তার খ্যাতি ও কৃতিত্ব প্রকাশ পায়। তিনি কলেজ ছাত্র ইউনিয়নে ভিপি নির্বাচিত হন। তার ব্যক্তিত্ব বিদ্যা এবং জ্ঞানের জন্য তিনি সকলের প্রিয়ভাজন হন। পরবর্তীতে ঢাকা মেডিক্যালে কলেজের ছাত্র হিসাবে বিশেষ ভাল রেজাল্ট করে এম. বি. বি. এস. পাশ করেন।
পরবর্তীতে পাকিস্তান আর্মির মেডিক্যাল কোরের অফিসার হিসাবে বিলেতে পড়তে যান। সেখানে দুই বছরের কোর্স দেড় বছরে সম্পন্ন শেষে এফ. এফ. এ. আর. সি. এস. ডিগ্রী অর্জন করেন। আমার পরের ভাই ডাক্তার হাফিজ আহমেদ আর্মি মেডিক্যাল কোরের অফিসার হিসাবে আজাদ কাশ্মীরে চাকুরী গ্রহন করেন। আমার ছোট ভাই আজিজ আহমেদ ব্যাংকার হিসাবে উচ্চপদে আসীন হয়ে বর্তমানে অবসর গ্রহন করেছেন। এদিকে আমাদের হরিরামপুরের গ্রামের বাড়িতে আমার পিতার সংসার। তার মাতা তখন জীবিত ছিলেন। তিনি মাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। ঘোরতর অন্ধকার গ্রাম্য জীবনে এই মা –ই তাকে আলোর মশাল হাতে, বৈরী পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে তার কনিষ্ঠ পুত্রের পথ চলার সঙ্গী ছিলেন।
আমার মা আরবী, উর্দু এবং বাঙ্লা অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন মহিলা ছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও তিনি একজন স্বশিক্ষিত এবং সুশিক্ষিত মানুষ ছিলেন। পুত্র কন্যাদের শিক্ষা দীক্ষায় তাঁর অবদান কোন অংশে কম ছিল না। ছোটবেলায় আমাদের লেখাপড়ার হাতে খড়ি তাঁর হাতেই। ছড়া, কবিতা, রূপকথার হাজার গল্প বলতেন। তাঁর ছোটবেলা কেটেছিল হিন্দুস্থানের লখনৌতে। তিনি তার বড়ভাইয়ে সঙ্গে লখনৌতে থাকতেন। উর্দুতে তিনি ছিলেন পারদর্শী। আমাদের আরবী পড়াও তাঁর কাছেই শুরু।
আর্থিক অনটনের পাহাড় অতিক্রম করার সংগ্রামে আমার বাবার সঙ্গে মায়েরও ত্যাগ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি অসংখ্য গ্রন্থ পাঠ করেছেন। অবসর সময়ে বসতেন মানচিত্র নিয়ে। সারা বিশ্বের ভৌগলিক অবস্থান, মহাদেশ, মহাসাগর, রেলপথ, নদীপথ, আকাশপথ –সব ছিল তার নখদর্পণে। রাশিয়ার বলশেভিক রেভোলিউশান, মহাযুদ্ধ সমূহ, অ্যাটমিক বোমা বিস্ফোরণ, হিরোশিমা নাগাসাকি –এসব গল্প তার কাছ থেকে শুনে শুনে শেখা।
সেই ঘোরতর দুর্দিনে যখন আমাদের এলাকায় নারীশিক্ষার প্রচলন ছিল না, আমার বাবা আমাকে ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। ১৯৫৩ সাল। সেই সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল খুব অনুন্নত। বাড়ি হতে পাঁচ মাইল দূরে ধলা স্টেশনে রেলে চড়ে ময়মনসিংহ শহরে যেতে হতো। ছোট ছিলাম। দীর্ঘ পথ। হাঁটতে অসমর্থ। আমার পিতা ধৈর্য্য সহকারে উৎসাহ দিয়ে দিয়ে সেই দুর্গম পথ অতিক্রম করাতেন। তিনি ছিলেন রাগী এবং দাপটের মানুষ। কিন্তু ঐ রাস্তায় অত্যন্ত নরম ও স্নেহ পরায়ণ থাকতেন। পথে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিতেন, পানি খাওয়ার ব্যবস্থা করতেন। এভাবে শীত, গ্রীষ্ম,বর্ষায়, ঝড় বাদল মাথায় করে বছরের পর বছর তিনি আমাদেরকে মানুষ করবার কাজে ব্রতী ছিলেন। তার যে কত ক্লেশ, কত কষ্ট হয়েছে, আমরা হয়তো তার পুরোপুরি খোঁজ রাখিনি। বড় হয়ে বুঝেছি তিনি কি কঠোর পরিশ্রম করে আমাদেরকে কোথায় কিভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি ছিলেন বিরাট বটবৃক্ষের মতো। বজ্রপাত হলেও তিনি আমাদেরকে রক্ষা করে ছায়া দিয়ে গেছেন।
তৎকালীন বিদ্যাময়ী স্কুল ছিল দেশের সেরা স্কুল। আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবন শুরু হয় এইস্কুলে। ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে যাত্রারম্ভ। বাড়ির বাইরে এই প্রথম। মন খুব খারাপ থাকতো গ্রামের জন্য। প্রতিদিন রাতে ও সকালে ভীষণ কান্না আসতো। সেজন্য বাবার চিঠির অপেক্ষায় থাকতাম প্রতি সপ্তাহে। আমার বাবার চিঠি লেখার ধরণ ছিল এই রকম –
My dear Firoza
দোয়া বহুত বহুত পর সমাচার এই যে, অদ্য তোমার একখানা পত্র পাইয়া সম্যক বিবরণ অবগত হইয়া অত্যন্ত সুখী হইলাম। ... মনোযোগ দিয়া লেখাপড়া করিও। বাড়ির জন্য চিন্তা করিও না। বাটিস্থ আমরা সকলে খোদার ফজলে ভাল আছি। তোমার সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করি।
ইতি –
তোমার আশীর্বাদক পিতা,
আব্দুস সোবাহান বিশ্বাস
বাবার পত্র শান্তির বারি বহন করে আনতো। পরের বছর যখন ক্লাস সেভেনে উত্তীর্ণ হলাম, তখন থেকে English এ চিঠি লিখতেন। এবং আমাকেও English -এ চিঠি লিখতে বাধ্য করতেন।
সেসময়ে তিনি চিঠির শুরুতে লিখতেন,
Glad to receive your letter dated 4.4.54. Happy to know that you are going on well with your studies regularly. Try to write correct sentences and consult dictionary for the spelling of the words.
তারপর চিঠি লেখা শেষ করতেন। আমার চিঠিতে যদি কোন বানান ভুল থাকতো তবে তা উল্লেখ করে শুদ্ধ বানানটি লিখে পাঠাতেন। ছুটিতে বাড়ি আসার পর পরীক্ষায় কোন প্রশ্নের উত্তর কিভাবে লিখেছি সব জিজ্ঞেস করতেন এবং কিভাবে উত্তরটি আরম্ভ করা উচিৎ ছিল তাও বলে দিতেন।।
আমার পরম প্রিয় পিতা নিজে বুদ্ধিমান ছিলেন। বুদ্ধিদীপ্ত ছেলেমেয়ে খুব পছন্দ করতেন। ছেলেদেরকে বিশেষ করে যারা ছাত্র, তাদেরকে মানুষ তৈরী করবার তার ছিল আপ্রাণ প্রয়াস। তার আশেপাশে থাকলে বোকা থাকবার কোন উপায় ছিলনা। বুদ্ধিকে কিভাবে জাগ্রত করতে হয়, এ কৌশল তিনি জানতেন।
তিনি প্রতি সপ্তাহে বাড়ি আসতেন। গ্রামের জমিজমা, সংসার, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া সব ঠিকমতো চলছে কিনা দেখতেন। আবার নান্দিনায় তার স্কুলের দায়িত্বও তিনি সততা ও কঠোর শৃঙ্খলার সঙ্গে পালন করতেন। একটি ছাত্রের সর্বাংগীন উন্নতি সাধন করাই যেন ছিল তার ধ্যান জ্ঞান। এভাবেই তিনি নিজের ছেলেমেয়েদেরকে আদর্শ ছেলেমেয়ে হিসেবে গড়ে তোলেন। আমরা আজও তার আদর্শের অনুসারী। কোন অন্যায় অনৈতিক কাজ কোনদিন করতে পারিনি। তিনি যেন আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তার আদর্শের ছড়িখানি হাতে নিয়ে।
নান্দিনা স্কুলের ছাত্ররা দেশের বড় বড় পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। বিদেশে নানাকাজে নিয়োজিত থেকেছেন। আজও অনেকেই সেই পুরানো দিনের ঐতিহ্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। এ সব কিছুই সেই সময়কার নিবেদিত প্রাণ শিক্ষকদের অবদান। তারা নিজের স্বার্থ দেখেননি। দেখেছিলেন ছাত্রদের স্বার্থ, স্কুলের উন্নতি, দেশের অগ্রগতি।
আমার বাবা আমাদের গ্রামে, বাড়ির পাশে একটি প্রাইমারি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই স্কুল থেকেই আমরা এবং আমাদের গ্রামের ছেলেমেয়েরা শিক্ষা লাভ করতে শুরু করে। তিনি নিজের বাড়িতে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেটি ছিল ১৩৩৯ সাল। নামকরণ করেছিলেন তার জ্যেষ্ঠ কন্যার নামে – আমিনা লাইব্রেরী। গ্রন্থাগারটি আকারে ছোট হলেও প্রচুর দুর্লভ গ্রন্থে পূর্ণ ছিল। আমার অক্ষর জ্ঞান লাভ করার পরই তাঁর হাতে যে বইটি দেখেছি সেটির নাম ছিল ‘প্রতিভা।’

আরেকটি বইয়ের ভেতর একটি মানুষের ছবি দেখেছিলাম। ছবিটি যথেষ্ট লম্বা। পা দু’খানি টানটান, হাতও তাই। মাথাটিও ঠিক জায়গায় গোলাকার। পরবর্তীতে একদিন আমার ভাইয়ের নিকট থেকে জানতে পারলাম এটি মানুষের ‘ফসিল।’ দীর্ঘকাল মাটি চাপা পড়ে থাকলে যা পাথরে পরিণত হয় তাকেই জীবাশ্ম বা ফসিল বলে। তখন আমি মলাটের ওপর বইটির নাম দেখলাম। বইটির নাম The Last Days of Pompeii - ইটালীতে ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির সেই ভয়াবহ উত্তপ্ত লাভা উদগীরণের কাহিনী। ছোট আকারে পাঠ করেছিলাম যখন ছোট ছিলাম। ৭৯ খ্রীস্টাব্দে ছাই ভস্ম লাভা মাথায় নিয়ে এই পম্পেই নগরী তার আশ পাশের নগর সহ মৃত্তিকার গভীর অভ্যন্তরে অগ্নি সমাধিতে হারিয়ে যায়। পুনরায় ১৬৫০ সালের দিকে মানুষ তার সন্ধান পায়। এই ঘটনার উপর লিখিত গ্রন্থটিই The Last Days of Pompeii, দীর্ঘকাল মানুষের চৈতন্যে দারুণ ভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেই বিখ্যাত পুস্তকটি আমার বাবার টেবিলে দেখেছিলাম কয়েকবার।
তিনি খুব পড়ুয়া ছিলেন এবং আমাদেরকে ভাল ভাল বই পড়ার জন্য উৎসাহ দিতেন। মাঝে মাঝে প্রশ্ন করতেন গল্পের সারমর্ম কি। মাসিক মোহাম্মদী, সওগাত ইত্যাদি ম্যাগাজিন বাড়িতে রাখতেন। মাঝে মাঝে নান্দিনা স্কুলের বার্ষিক ম্যাগাজিনও দেখেছি। তার নাম ছিল The Cosmopolitan. তখনকার দিনের তুখোড় শিক্ষকদের মূল্যবান লেখা এবং মেধাবী ছাত্রদের ভাল ভাল গল্প, প্রবন্ধ ও কবিতা ছাপা হতো সেই বার্ষিকীতে। আমি যখন উচ্চ শিক্ষায় ব্রতী তখন নান্দিনা স্কুলের ছাত্রদের ইংরেজী লেখার স্টাইল এবং স্ট্যান্ডার্ড দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছি।
লেখা এবং পড়ার অভ্যাস আমাদের বাড়িতেই গড়ে উঠে। আমার মাতাও সময় পেলেই সেসব বইপত্র পড়তেন এবং তিনি একজন বিদূষী মহিলায় পরিণত হন।
আমার পিতা একজন দূরদর্শী এবং কর্মঠ ব্যক্তি ছিলেন। তখনকার দিনে আমাদের পোস্ট অফিস ছিল কাশীগঞ্জে। আমাদের ইউনিয়নের একেবারে শেষ সীমানায় ক্ষীরু নদীর তীরে। সেটি ছিল আমাদের এলাকা থেকে অনেক দূরে, দক্ষিণে। চিঠিপত্র বিলি করা ছিল পিয়নের জন্য এক দুরূহ কাজ । সেজন্য আমার পিতা নিজের বৈঠকখানার বারান্দায় একটি পোস্ট অফিস স্থাপন করেন। সেটিকে বলা হতো Donor’s post office. তার নামকরণ করা হলো হরিরামপুর ডাকঘর। সরকারী অনুমোদনের প্রেক্ষিতে সেটি স্থাপিত হয়েছিল। শিক্ষার আলো বিস্তারের জন্য একটি হাইস্কুল স্থাপন করেন নিজ গ্রামে। যেহেতু তিনি ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ছিলেন সেজন্য বিদ্যালয়টির নাম করেন আমাদের প্রিয় নবীজীর নামে – মোহাম্মদপুর হাইস্কুল, হরিরামপুর। সেই সময়ে ছেলেরাই এই স্কুলে পড়াশুনা করতো। পরবর্তীতে বিদ্যা শিক্ষা প্রসারের ফলে মেয়েরাও এই স্কুলে ভর্তি হতে শুরু করে। আজও এই বিদ্যালয় থেকে ছাত্র ছাত্রীরা এস.এস.সি. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হচ্ছে। এই হাইস্কুলকে ঘিরে তিনি একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। তার নাম নয়া বাজার। এর পূর্বে অত্র এলাকায় কোন হাট বাজার ছিল না।
স্কুল কমপ্লেক্সের ভিতরেই গ্রামের উন্নতির জন্য Multi purpose Co–operative Society গঠন করেন। চাষীদের উন্নতির জন্য seed স্টোর (বীজ কেন্দ্র) স্থাপন করেন। নিজের বাড়ি হতে সেই পোস্ট অফিসটিও এই কমপ্লেক্সে স্থানান্তর করেন। তার সরকারী নাম হরিরামপুর পোস্ট অফিস –কভায়া ত্রিশাল। এটি আবার পাকা ঘর পায় এবং পায় উপযুক্ত স্থান -সকলের সুবিধামতো জায়গায়।
আমার পিতার আরেকটি উল্লেখযোগ্য কীর্তি হচ্ছে ইউনিয়ন বোর্ড স্থাপন। এ কাজটি স্থাপন করতে গিয়ে তাকে বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। কারণ ইউনিয়ন বোর্ডের নাম ছিল ৭নং সাখুয়া ইউনিয়ন বোর্ড। এটিও অত্র এলাকার একেবারে উত্তর সীমানায় অবস্থিত। এই ইউনিয়ন বোর্ডে যাতায়াত করা বহুলোকের জন্য কষ্টকর ও দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার ছিল। রাস্তাঘাট মোটেই ভাল ছিল না। বিদ্যুতের তো প্রশ্নই নেই। সাখুয়া ইউনিয়ন দ্বিধাবিভক্ত করে বর্তমান ৭ নং হরিরামপুর ইউনিয়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি দীর্ঘকাল বারবার এই ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসাবে নির্বাচিত হয়ে এলাকার প্রভুত উন্নতি সাধন করেছিলেন।
ঐ এলাকায় সেই ব্রিটিশ আমলেই রাস্তাঘাট নির্মাণ করিয়েছিলেন। আইন অনুসারে রাস্তার পাশে বৃক্ষ রোপন করে সীমানা নির্ধারণ এবং শ্রীবৃদ্ধি করেছিলেন। মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য বাড়ির পাশেই নিজের জমিতে একটি মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন। ছোট ছোট ছেলেরাও ঐ মক্তবে পড়তে যেত। এই মক্তবের চেয়ার–টেবিল, বেঞ্চ, ব্ল্যাক বোর্ড সবই তিনি নিজের উপার্জনের পয়সায় নির্মাণ করেছিলেন। বাড়ি বাড়ি ঘুরে অভিভাবকদের অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে মেয়েদেরকে স্কুলে আসার ব্যবস্থা করেছিলেন। একজন মৌলবী সাহেব আরবী পড়াতেন এবং ধর্ম শিক্ষা দিতেন। তার নাম ছিল মৌলবী মহর আলী। আরেকজন বাংলা মাস্টার সব বিষয়ে পাঠদান করতেন। আমার ভাই বোনদের এবং অন্যান্য কৃতি ছাত্রদের ঐ মক্তবেই হাতে খড়ি। এই মক্তব আজ থেকে প্রায় ৮০ বৎসর পূর্বে স্থাপিত হয়েছিল। সেটা সম্ভবত ১৯৩৩ সাল হবে। ঐ স্কুল এবং তার স্মৃতি আজও ঐ অঞ্চলে একটি আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলছে। স্কুলটি বর্তমানে আমার মায়ের নামে সরকারি করণ করা হয়েছে। স্কুলটির নাম জুবাইদা ফিরোজা সরকারি প্রাইমারি স্কুল - হরিরামপুর, ত্রিশাল। এটি এখন আমাদের বাড়িতে অবস্থিত। সরকারি প্ল্যান অনুযায়ী দুটি পাকা দালানে ক্লাস চলছে।
আমার পিতা সারাজীবন মানুষের উপকার করে গেছেন। কুসংস্কারাচ্ছন্ন, পশ্চাতপদ মানুষদেরকে আলোকিত পথে আনার কাজে ব্রতী ছিলেন। এলাকার ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, চাকুরী, প্রমোশান, অসুখ – বিসুখে বা যেকোন প্রকার ঘটনায় দুর্ঘটনায় তিনিই তাদের পথ প্রদর্শক ছিলেন। বাধা বিপত্তি যে তাঁর ছিল না তা নয়। ইর্ষাপরায়ণ ব্যক্তিরা তাঁর বিরুদ্ধাচারণ করতো। কিন্তু তিনি ছিলেন নির্ভিক চরিত্রের অধিকারী। তিনি বলতেন, ‘আল্লাহ্ ব্যাতীত আর কোন শক্তির নিকট আমি মাথানত করিনা।’
তিনি কখনও অন্যায়ের নিকট মাথানত করেননি। সৎ, কর্মঠ, সাহসী এবং ধর্মপরায়ণ এই ব্যক্তিটি সমাজের কল্যাণে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত নিজেকে উৎসর্গ করে গিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন কেবল নিজের মঙ্গল হলেই চলবে না, সকলকে নিয়ে সৎ পথে, শিক্ষার পথে, শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে চলতে হবে।
তিনি যেহেতু শৈশবেই পিতৃহীন ছিলেন, তাঁকে পথ প্রদর্শন করবার মতো কেউ ছিল না। তিনি একাই আলোকিত পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেন। এলাকায় আজও তিনি একটি প্রদীপ শিখার মতো। একাই সংগ্রাম করে শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছেন এবং তা বিতরণ করেছেন। পশ্চাতপদ সমাজে সকল বাধা অতিক্রম করে তিনি মানুষের কল্যাণে দৃপ্ত পদভরে এগিয়ে গিয়েছেন। তাই তাঁর জনপ্রিয়তাও ছিল অসাধারণ। এই নির্ভিক, সৎ এবং প্রচন্ড দাপটের মানুষটির প্রজ্জ্বলিত বাতিঘরটি আজও মানুষকে পথ দেখাচ্ছে।
আমরা ভাইবোনেরা এমন একজন মানুষের সন্তান হিসাবে গর্ব বোধ করি। শেষ জীবনে তিনি গ্রামের বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। ১৯৮৫ সালের ২৩শে জুন তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। গ্রামের মসজিদের পাশেই ‘শতাব্দীর অগ্নিপুরুষ অনন্ত শয়ানে’ তাঁর পারিবারিক কবরস্থানে শায়িত আছেন। আমরা তাঁর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করে চলি। মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে তাঁর আত্মার শান্তির জন্য প্রতিদিন প্রার্থনা করি। তিনি নেই। কিন্তু তাঁর কীর্তি, স্থাপনা, আদর্শ আজও আলোর শিখার মতো আজকের প্রজন্মকে পথ দেখাচ্ছে।
.........
১১.১১.২০১০
No comments:
Post a Comment