Friday, January 16, 2026

প্রবন্ধ - মধ্যরাতের কড়চা

লেখার খুব ইচ্ছা। কিন্তু কি লিখবো বুঝে উঠতে পারছি না। একবার ভাবি কবিতা লিখি। আবার ভাবি গল্প লেখাই শ্রেয়। তাতে মনের ভাবটি যথাযথ প্রকাশ করা সম্ভব। কিন্তু কোনোটি হয়ে উঠে না। কবিতার ছন্দ মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাই। একটি শব্দ ধরে এনে আরেকটির পাশে বসাই। যেন জোর করে বিয়ের পিড়িতে বসানো। কনের মুখ অধোবদন। বরের উচ্চশীর। কারণ বাহাদুর সে। বৌ নিয়ে বাড়ি যাবে। যেমন আলেকজান্ডার দিগবিজয় করে দেশে ফিরে যেতেন।  কিন্তু কনের সে বাহাদুরি নেই। কারণ আজ প্রাপ্তির চাইতে হারাবার দিন। এত আনন্দ উৎসবের ভিতর দিয়ে তার আজন্মের আশ্রয় থেকে উচ্ছেদ করা হলো। সে হতে যাচ্ছে পরবাসী, পরাশ্রয়ী – যে আশ্রয়ের কোন নিশ্চয়তা নেই। 

যে কোন ঝড়ে বুলবুলির বাসার ন্যায় তার আশ্রয়টি দমকা হাওয়ায় কোথায় উড়ে যাবে সে তা জানে না। তার একূল ওকূল – দুকূলই অস্থায়ী হল। সেজন্য কাব্যচর্চা একটি সাধনারই বিষয়। অন্ত মিলের শব্দটি পছন্দসই না হলে তাকে বাদ দিয়ে আরেকটি শব্দ চয়ন করতে হয়। সেটি জুতসই না হলে আরেকটি। মন মতো পেয়ে গেলে তবে সে শব্দটি টিকে থাকে। সুতরাং কাব্য সাধনা সরস্বতির দান। কসরত করেই তবে সাধনায় সিদ্ধি লাভ করা । পরক্ষণে মনে করি প্রবন্ধ রচনাই উত্তম। কোন কিছু হারাবার ভয় নেই। যা বাস্তব তাই ব্যক্ত করা। তার ভাল ভাল দিক , মন্দ দিক, ক্ষতিকর দিক, শোধরানোর দিক সব ব্যাখ্যা করা যায়। তাতে কারো না কারো জ্ঞান পিপাসিত হৃদয়ে কিছু না কিছু বারিসিঞ্চন করা সম্ভব হয়। এতে জোর করে ধরে এনে বরকনের পদ্য লেখার প্রয়োজন পড়েনা। আর গদ্য কাব্যের মত বেসুরো তানপুরার তাল – লয়হীন ধ্বনির আঘাতে কানেরও বারোটা বাজাতে হয় না।গদ্য কবিতা সত্যিকার অর্থে রচনা করা খুবই কঠিন। যদিও মনে হয় পত্রিকার বিজ্ঞাপন অথবা যে কোন মজার খবর হ্রস্ব – দীর্ঘ  লাইনে খাড়া করে দিলেই কবিতা হয়ে গেল। আসলে তা মোটেই না। তাল, লয়, ছন্দ, অর্থ ঠিক রেখে তবেই গদ্য কবিতায় হাত দিতে হয়। নচেৎ নির্ঘাত তার মরুপথে যাত্রা করতে হয়। সে আর গতি খুঁজে পায় না। যথেষ্ট দক্ষতার এবং মুন্সিয়ানার প্রয়োজন হয় গদ্য কাব্য রচনায়। আর আমরা যারা পাঠক, তাদের ঠকারই সম্ভবনা বেশী। খুঁজে খুঁজে পথ হারাই। ক্ষ্যাপার মত। ‘যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দিবে তাই।’ ছাই উড়াতে গিয়ে জীবনের অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়। তবুও একটি স্বরবৃত্ত বা মাত্রাবৃত্তের ছন্দোবদ্ধ সুখপাঠ্য গদ্য কবিতা খুঁজে পেতে সময় চলে যায় অনেক।

এখন বাকী রইলো গল্প বলা। গল্প বলাতো সহজ কাজ। মনের যত কথা গড়গড় করে বলে বলে যাওয়াই তো গল্প। সে কথা আংশিক সত্য। তবে প্রকৃত পক্ষে গল্প পরিপক্ক হাতের লেখা বটে। একটি মনোমুগ্ধকর গল্প লেখার জন্য প্রয়োজন হয় উচ্চ শ্রেণীর সৃজনী শক্তি। অনেকটা প্রকৃতি প্রদত্ত, অনেকটা চর্চা। পড়াশুনা করে জ্ঞান অর্জন, স্বতঃস্ফুর্ত আগ্রহ, প্রখর দৃষ্টি , সর্বোপরি মানবতা বোধ। এসব গুণাবলীর সমন্বয়ে একটি হৃদয়গ্রাহী গল্প রচনা সম্ভব।

নানা আকারের গল্প পড়ি আমরা। অনেক সময় একটি ছোট গল্পও হৃদয়, মন, আত্মাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়ে যায়। কয়েকদিন তা ভুলতে পারিনা। অনেক সময় শ্বাস রুদ্ধকর অবস্থায় পড়া শেষ করি। অবাক হয়ে ভাবি, কি করে লেখক এমন একটি বিষয় চয়ন করলেন? কি করে এমন চমৎকার ভাবে বর্ণনা করলেন। উপমা, উপস্থাপনার সৌন্দর্য্য স্টাইল কেমন করে পেলেন। যেমন মার্ক টোয়াইনের গল্পগুলো এমন দমবন্ধকর অবস্থায় পড়ে শেষ করতে হয়। সে এক অপূর্ব অনুভূতির সঞ্চার করে। আমি এখানে খুব উচ্চ  শ্রেণীর লেখক কবিদের কথা বলছি না। যারা কাব্য সাহিত্য চর্চায় নিয়োজিত রাখেন নিজেদেরকে, তাদের কথাই বলছি। গল্প মানুষের উর্বর মস্তিষ্কের ফসল। চর্চা করতে করতে একদিন তা ‘সোনালী ধানের শীষে ফলিয়া উঠিবে’ – সন্দেহ নেই।

যদি অর্ধেক পরিমাণে গল্প পঠন, কবিতা আবৃত্তি, প্রবন্ধ পর্যালোচনা করি, তবেই আমরা –সাধারণ পাঠকরা, অনেক মানিক–রতন  কুড়াইয়া পাইতে পারি। লিখতে না পারি, পড়তে তো পারি। পাঠ করে যদি মধু মক্ষীকার মতো মধুরস আহরণ করতে পারি, তবে অতৃপ্তি কোথায়? তৃপ্তিই তো জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ আনন্দ।
‘ছোট প্রাণ ছোট কথা,
ছোট ছোট দুঃখ ব্যথা, 
নিতান্তই সজহ সরল
অজস্র বিস্মৃতি রাশি
প্রত্যহ যেতেছে ভাসি,
তারই দু’চারটি অশ্রুজল!’

এই উপলব্ধিই তো আমাদের বড় প্রাপ্তি।    


***


No comments:

Post a Comment

উৎসর্গ

 আমার পিতাকে যাঁর জীবনের পাথেয় ছিল আপোষহীন নীতি আর শৃঙ্খলা।   আমার মাতাকে ছেলেমেয়েদের মেধা ও মননশীলতায় যিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। আমার স্বামী...