Wednesday, February 4, 2026

ভ্রমন কাহিনী - মক্কা মদীনায় ১৫ দিন

পবিত্র মক্কা মদিনায় কোনদিন যেতে পারবো কল্পনা করতে পারিনি। হঠাৎ করে সুযোগ এসে গেল। আমাদের নিকট আত্মীয় ডা. মোহাম্মদ আবু তাহের মক্কায় বসবাস করেন। তিনি সৌদি সরকারের কিং ফয়সল হাসপাতালে সার্জন হিসাবে কর্মরত। তিনি বললেন, উমরাহ ভিসা দেওয়া শুরু হয়েছে, আপনারা একবার আসেন। আমার স্বামী লে. কর্নেল ডা. মোহাম্মদ হারুন রাজী হয়ে বললেন ‘চল ঘুরে আসি।’ এরপর হয়তো যাওয়া হবে না বয়সের ভারে। প্রস্তুতি নিলাম সেই সুদূর মক্কা মদিনার পূণ্যভূমি স্বচক্ষে দেখব বলে। আমার পূর্ব পুরুষেরা, আমার মাতামহ, আজ থেকে প্রায় ১২৫ বৎসর পূর্বে এই পবিত্র ভূমিতে নগ্ন পদে কা’বা ঘর প্রদক্ষিণ করেছিলেন বহুবার। নানাজান মো. হানিফ সেখানে একটানা বসবাস করেছিলেন ১১ বছর। সঙ্গে ছিলেন তাঁর বালক পুত্র মো. সিদ্দিক। এর আগে ও পরেও তিনি কয়েকবার গিয়েছেন মক্কায়।

সতেরই এপ্রিল বিকালের  ফ্লাইটে ঢাকা এয়ারপোর্ট ত্যাগ করলাম। সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের বিশাল প্লেন ডানা মেলে দিল মুক্ত বিহঙ্গের মতো। সাড়ে পাঁচ ঘন্টা উড্ডয়নের পর জেদ্দা বিমান বন্দরের ভূমি স্পর্শ করলো আমাদের বাহন। ঢাকার সূর্য আমাদের সাথে সাথে ভ্রমণ করছিল। ঘড়ি অনুযায়ী যখন বাংলাদেশে মাগরিবের আযান হচ্ছিল তখনও প্লেনের বাইরে রৌদ্র ঝলমল উজ্জ্বল দিন। ঢাকার রাত নয়টার পর প্লেনে সূর্যাস্তের সময় হলো। ঘটনাটি খুব মজার। জেদ্দা বিমান বন্দর বিরাট এলাকা। কত যে প্লেন দাঁড়িয়ে আছে, মনে হয় কিছুই না ! বারো মিনিট বাস চলার পর আমরা বন্দর টার্মিনালে পৌঁছালাম। সেখানে দিবালোকের মত ড্যাজলিং লাইট। রাত মনেই হয় না।

এখানে বাসের  কথা একটু বলতে হয়। আমাদের দেশের বাসের মতো নয়। বাসের ভেতরে কিছু কিছু সীট, কিছু চেয়ার টেবিল, কিছু জায়গা খালি – ব্যাগ,ছোট খাটো মালপত্র রাখার জন্য। স্টিলের রড যাত্রীদের ধরে রাখবার জন্য। বাস থামলে যাত্রীরা সব হুড়মুড় করে নেমে পড়লো। আমরা ইহরাম বাঁধা উমরাহ’র যাত্রীরা নির্দিষ্ট লাইনে দাঁড়ালাম। লম্বা লাইন অনেক। আমি আমার স্বামীর পাশে দাঁড়ালাম। আমার সামনে আরেকজন মহিলা তার সঙ্গীর পাশে দাঁড়িয়ে। হাসিমুখে তাকাচ্ছেন আমার দিকে। জানতে চাইলাম , ‘হোয়্যার ডু ইউ কাম ফ্রম?’ বললেন, ‘সাউথ আফ্রিকা।’ আমি নিজের দেশের নাম বললাম, বাংলাদেশ। চিনতে পারলেন। আগে তিনি পাকিস্তানে ছিলেন। এবার উমরাহ করতে এসেছেন। ইতিপূর্বে হজ্ব করেছেন। বললাম , ‘এবার আমাদের প্রথম উমরাহ্‌ করতে আসা।’ দু’চার কথা বলার পর দেখি মহিলাদের একটি নাতিদীর্ঘ লাইন। সেখানে আমার কাগজপত্র নিয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম। সেই মহিলাকে আমার সঙ্গে ডেকে নিলাম। খানিকক্ষণ পর আমার পাসপোর্ট চেক করে একটি কাগজ দিয়ে ছেড়ে দিল। সেই ভদ্রমহিলাও পাসপোর্ট চেক করতে দিলেন। আমি আমার লাগেজ- পত্র ট্রলিতে তুলে নিয়ে একটু দূরে হারুন সাহেবের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। ওনার ছাড়পত্র পেতে বেশ সময় লাগলো। এদিকে ডা. আবু তাহের আমাদের জন্য আপেক্ষা করছিলেন। তার সহায়তায় আরো ঘন্টাখানেক পাসপোর্ট পরীক্ষা নিরীক্ষা করিয়ে এয়ারপোর্টের বাইরে পার্কিং লটে এসে পৌঁছালাম। এমন সময় কে যেন আমা হাতখানি ধরে ফেললো। চমকে চেয়ে দেখি সেই ভদ্রমহিলা –যিনি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে এসেছেন । খুশীতে আনন্দে আমার ‘বক্ষমাঝে চিত্ত আত্মহারা নাচে রক্তধারা।’বললেন, যাচ্ছেন?

- হ্যা মক্কায় যাচ্ছি। আগামীকাল উমরাহ করে পরশু বিশ্রাম। তার পরদিন বুধবারে মদীনা শরীফের উদ্দেশ্যে রওনা হব। 

- আমরাও বুধবারে মদীনায় যাব। দেখা হবে আবার।

- দেখা হবে ইনশাল্লাহ বলে তার হাতে মৃদু আন্তরিকতার চাপ দিয়ে হাতখানি ছেড়ে দিলাম। 

তাঁর হাতখানি ছেড়ে দিয়ে কেন জানিনা, চিত্ত চঞ্চল হল। হৃদয় হল বেদনায় ভারাক্রান্ত। ‘আরো কিছুক্ষণ না হয় রহিতে কাছে।’ সময়ের স্বল্পতা হেতু চলে আসতে হল। এই হয়তো মানুষের মন। স্বল্প সাক্ষাতে কত আপন হয়ে যায়!

মক্কা শহরে এসে পৌঁছালাম দেড় ঘন্টা পর। ১২০ মেইল স্পীডে গাড়ি চালানো যেন কোন ব্যাপারই নয়। মক্কা শহরের সীসায় ডা. আবু তাহের সাহেবের বাসা। সেখানেই আমরা উঠলাম। পরেরদিন সকালের দিকে ক্বাবা শরীফে উপস্থিত হয়ে উমরাহ্‌ পালন করলাম। সাতবার বাইতুল্লাহ শরীফ (কা’বা ঘর) প্রদক্ষিণ করে, সাতবার সাফা – মারওয়া সায়ী করতে হলো। সাফা –মারওয়া এখন আর পূর্বের ন্যায় বিপদ সংকুল পাহাড় পর্বত নয়। সেগুলো কেটে অত্যন্ত সুন্দর মসৃণ সুদৃশ্য রাস্তা তৈরী করা হয়েছে। বিল্ডিং এর ভেতর দিয়ে অনায়াসে সাতবার সায়ী করা যায়। নিয়ম মাফিক সব কাজ সম্পন্ন করে বাসায় চলে এলাম। মিসেস আবু তাহের আমাদের প্রিয় ভাবী –ডা. রওশন আরা, আমাদের খুব দেখাশুনা করেছেন। সবসময় সঙ্গ দিয়েছেন। 

বুধবার উনারা আমাদের সঙ্গে মদীনা শরীফে রওনা হলেন। পৌঁছাতে রাত হলো। হোটেল পেতে সময় লাগলো। কারণ সব হোটেল বুকড। এই কষ্টের কাজগুলো ডা. তাহের করলেন। চারশয্যা বিশিষ্ট কক্ষ পেলাম। দুই কামড়া ভাড়া নিলাম। রাত তিনটায় মদীনায় মসজিদে– নব্বীতে ফজরের নামাজ আদায় করবার জন্য রওনা হলাম। মসজিদের চত্বরে জায়গা পেলাম তাও গেটের কাছাকাছি। এত রাতে এত লোকের সমাগম দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হলাম। কিন্তু এ লোকের সমাবেশে কোন কোলাহল নেই। সকলেই বসে যার যার মত এবাদত বন্দেগী করছেন। মেয়েদের দিকটি পৃথক করা। তবুও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। কোনরকম জায়গা করে বসে পড়লাম। কোরান তেলাওয়াত, নফল নামাজ পড়তে পড়তে ফজরের ওয়াক্ত এসে গেল। জামাতের সংগে ফজরের নামাজ আদায় করলাম। আশ্চর্য্য হয়ে লক্ষ্য করলাম ভোরের পাখির কিচির মিচির আওয়াজ। ভোরের আলো ফুটে উঠলো। সময়টা বড়ই মৌন, শান্ত, পবিত্র। বড়ই স্বর্গীয় সুষমায় মন্ডিত। 

হাজার হাজার লোকের ভীড় ঠেলে দীর্ঘ সময় ধরে বাইরে এলাম। এরকম ভীড় এখনে প্রতিদিন হয়। অধিকাংশই আমাদের মতন নবীন তীর্থ যাত্রী। সেখান হতে বেরিয়ে এসে বাঙ্গালী রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার সংগ্রহ করে হোটেলের রুমে এসে ব্রেকফাস্ট করে নিলাম। বেলা দশটার দিকে আবার বের হলাম। প্রথমে জান্নাতুল বা’কী। দ্বারবান ভিতরে ঢুকতে বাধা দিল। বললো ঢোকার সময় শেষ। বিফল মনোরথ হয়ে পাশের গ্রিলের দেয়াল ঘেঁষে সমাধিক্ষেত্রের ভিতরে দৃষ্টিপাত করলাম। মৃত্তিকা, কাঁকড় পাথরের মাঠ বিস্তীর্ণ। এটিই কবরস্থান। বিখ্যাত জান্নাতুল বা’কী। আমরা বাইরে থেকেই কবরস্থান জিয়ারত করলাম। হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ), হজরতা ফাতেমা (রাঃ), হজরত হাসান (রাঃ) এবং আরো অসংখ্য সাহাবী বুজুর্গানে দ্বীন এখানে শেষ শয্যায় শায়িত আছেন। 

মদীনা শরীফে আমরা বেশ কয়েকটি মসজিদ পরিদর্শনে গেলাম। সেখানে প্রত্যেক মসজিদে দুই রা’কাত করে  নামাজ আদায় করে মসজিদগুলো ঘুরে ঘুরে দেখলাম। তারমধ্যে দেখেছি মসজিদ –এ কুবা। হজরত মোহাম্মদ (সাঃ) যখন হিজরত করে মদীনায় আসেন তখন তিনি এই মসজিদটির বুনিয়াদ স্থাপন করেন। আরেকটি মসজিদে নামাজ পড়েছি। তার নাম মসজিদ –এ  ক্বিবলাতাইন। পূর্বে জেরুজালেমের মসজিদ আল আকসা কে কিবলা ধরে নিয়ে সেদিকে মুখ করে নামাজ আদায় করা হতো। কিন্তু নবীজীর অন্তর চাইতো মক্কার হারাম শরীফকে কিবলা করে নামাজ পড়তে। অবশেষে মহান আল্লাহ তা’য়ালা তার অন্তরের বাসনা পূর্ণ করলেন। একদিন জোহরের নামাজ পড়ার সময় সেই নির্দেশ তিনি অন্তরে অনুভব করলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি জামাতসহ ঘুরে বাইতুল্লাহ শরীফের (মক্কা শরীফ) দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে নামাজ শেষ করলেন। এই মসজিদের দক্ষিণ দেয়ালে স্থাপিত হলো কিবলার চিহ্ন।  সেই সময় থেকে নবীজীর প্রিয় কা’বা ঘর সারা পৃথিবীর কিবলায় পরিণত হলো। 

তারপর গেলাম ওহোদের ঐতিহাসিক যুদ্ধক্ষেত্রে। এখানে অবিশ্বাসীদের সঙ্গে যুদ্ধ করে বহু সাহাবী, বীর যোদ্ধা শহীদ হন। তাদের সকলের সমাধিক্ষেত্র এই ওহোদের প্রান্তরে গ্রিলের বেষ্টনী দ্বারা সুরক্ষিত আছে। এবার মসজিদে নব্বীর দিকে রওনা হই জোহরের নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে। এবার ভাগ্য ভাল। মসজিদের অভ্যন্তরে যেতে সমর্থ হই। মসজিদে নব্বী এক বিরাট মসজিদ। এই মসজিদ তুর্কী নির্মাণ প্রকৌশলীদের কারুশিল্প এবং চারুশিল্পের সমন্বয়ে নির্মিত এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্য্যের নিদর্শন। যারা এর সৌন্দর্য্য দর্শন করেছেন তারাই কেবল এর বর্ণনা বুঝতে সক্ষম হবেন। এর কারুকাজ মন্ডিত খিলান চারিদিকে বিস্তৃত। সবুজ এবং ক্রিম কালারের সমন্বয়ে এই ডিজাইন তৈরী। বিস্তীর্ণ ফ্লোর কারুকাজ খচিত মখমলে আবৃত। বিরাট পিলার সমূহ যার নীচের দিকটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ করে। শুনেছি এর উপর দিকে অনেক ডোম আকৃতির ছাতার মত স্থান আছে। ভোরের দিকে সেগুলো সরে যায়। তাতে ভোরের প্রথম নরম আলো মসজিদে প্রবেশ করে। তখন এক অনুপম সৌন্দর্য্যের সৃষ্টি হয়। মুসল্লিদের অন্তরে এক  স্বর্গীয় সুখের অনুভূতির  সঞ্চার হয়। আল্লাহর অশেষ কৃপা লাভের আশায় তারা ব্যাকুল হন। কিছুক্ষণ পর সেই ছাতা আপনি আপনি বন্ধ হয়ে যায়। বাইরে তখন ঊষার কোলে রাঙ্গা রবি প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। 


আমরা মসজিদের ভিতরে নফল নামাজ পড়ে কোরান তেলাওয়াত করে সময় কাটালাম। জোহরের আজান হলো। ফরজ নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করলাম। প্রচন্ড ভীড় । দাঁড়ানোর স্থান নেই। নামাজ শেষ হলো। মসজিদে নব্বীর ভিতরে একদিকে মেয়েরা। কারুকাজ করা শক্ত কাঠের দরজার ওপারে পুরুষদের জন্য স্থান। নামাজ অন্তে সেখানকার পুরুষ মুসল্লিদের সরিয়ে দিয়ে একটি বিশাল লম্বা চাকাওয়ালা পার্টিশান টেনে মহিলাদের জন্য এদিককার দরজা খুলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে মহিলাগণ এমন দৌড় প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলেন যে, সে এক বিস্ময়কর দৃশ্যও বটে। 
আমার পায়ে ব্যথা। সেজন্য আমি এবং রওশন – আরা ভাবী একপাশে একটু ধীরে চলতে লাগলাম। কারণ সামনে নবীজীর রওজা মোবারক। সবুজ রঙের রওজা মোবারক গ্রিল দিয়ে ঘেরা। সেই কক্ষে প্রবেশ করে বুঝতে পারলাম কি ভয়ংকর চাপ। মনুষ্য স্রোতের চাপ। সেই চাপ সহ্য করে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি কোন মানুষের নেই। কয়েক নজর রওজা মোবারকের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নিজের প্রাণ রক্ষায় ব্যস্ত হলাম। শুনেছি আমাদের সামনে রয়েছে তিনটি কবর। একটি হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ), অন্যটি হজরত ওসমান (রাঃ)- এর কবর। তৃতীয় কবরটি খালি। সেটিতে ভবিষ্যতের কোন এক সময়ে হজরত ঈসা (আঃ) অথবা ইমাম মেহেদীকে  সমাহিত করা হবে। সেখানেও দু’রাকাত নফল নামাজ পড়তে হয়। অনেকে এরই মধ্যে সেজদায় রত। ছোট কামরায় প্রচন্ড ভীড়ে সব মেয়েরা কালো বোরখায় আবৃত। নীচে দেখবার বা ঠাহর করবার কোন উপায় নেই। পেছনের প্রচন্ড ধাক্কায় সামনের মহিলাগণ সিজদারত মহিলাদের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। ক্রমাগত চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমি সম্ভবত দু’জন মহিলার উপরে পড়েছি। প্রাণ সংশয়ের সম্ভবনা চিন্তা করে ‘হোয়্যার ইজ দ্যা এক্সিট’ বলে চিৎকার করলাম। কেউ সাড়া দিল না। পুনরায় বললাম, ‘এক্সিট কিধার হ্যায়?’ কেউ একজন প্রতি উত্তরে চিৎকার করে বললো, ‘ইছ তরফ হ্যায়, ইধার।’ আমি জানি না কেমন করে মানুষের উপর দিয়ে ভাসতে ভাসতে বহির্গমনের  নিকট পৌঁছালাম। পায়ের নীচে মাটি পেলাম। বেরিয়ে এলাম। প্রাণভরে শ্বাস নিলাম। অপেক্ষা করলাম মনুষ্য স্রোতের একপাশে দাঁড়িয়ে। আরেকটু পরে আরেকটু দূরে দাঁড়িয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করলাম। 
দুইবার ফিরে গেলাম বাইরে আসার দরজার কাছে, রওশন আরা ভাবীর খোঁজে। সেই যে আমার হাত থেকে ছুটে গিয়েছিলেন, আর খুঁজে পাচ্ছিনা। আবার গেলাম ভীড় ঠেলে  সেই দরজার  কাছাকাছি। দেখি তিনি তাঁর হাত ব্যাগ উঁচু করে তুলে ধরেছেন। হাত তুলে আমিও জানান দিলাম। আরো কাছে গিয়ে উনাকে নিয়ে বেরিয়ে এলাম। এ যাত্রায় প্রাণে বেঁচে গেলাম। আল্লাহ্‌কে ধন্যবাদ দিলাম এই জন্য যে তিনি এক বিষাদময় পরিণতির হাত থেকে আমাদেরকে রক্ষা করেছেন। ধীরে ধীরে হেঁটে  মসজিদের ভিতর দিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালাম। দেখি ডা. তাহের  আর ডা. হারুন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। 
পরদিন শুক্রবার। সেদিনও সকালের দিকে তৈরী হয়ে মসজিদে নব্বীতে চলে এলাম। ভেতরে জায়গা নেই। বাইরের চত্বরে বেশ দূরে মাঝামাঝি স্থানে বসার জায়গা করে নিলাম। সেখানে তাল গাছে মতো বিরাট ছাতা ভাঁজ করা আছে – অসংখ্য। রৌদ্রের হাত থেকে মুসুল্লিদের ছায়া দান করবার জন্য সে সব ছাতা যান্ত্রিক কৌশলে খুলে দেওয়া হয়। তাতে পুরো এলাকা ছায়াময় হয়ে পড়ে। দুর্ভাগ্যবশতঃ এসব যান্ত্রিক বিরাট বিরাট ছাতা খোলা এবং বন্ধ করবার দৃশ্য দেখতে পাইনি। মসজিদে নব্বীর মাঠে টাইলস্‌ বিছানো ঝকঝকে পরিষ্কার জায়গা। সকলেরই খালি পা অথবা মোজা পরা। সেখানে বসে নফল নামাজ, দোয়া কালাম পড়তে থাকলাম। দেশদেশান্তর থেকে মহিলারা এসেছেন। বিভিন্ন জাতের মানুষ তারা। সাদা কালো, উঁচু লম্বা, মোটা চিকন, বিরাটাকায় বপুর নানা ভাষার মানুষ। কিন্তু সকলেরই উদ্দেশ্যে এক, নিয়ত অভিন্ন। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা  বোরখা পরা অথবা লম্বা সাদা ড্রেস পরা। খুব ভাল লাগছিল দেখে। যেন বেহেস্তের দূত। খুব ছোট বাচ্চাও অনেকে নিয়ে এসেছেন। প্যারাম্বুলেটরে রেখে পাশে নামাজ, এবাদত করছেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নামাজের আযান পড়লো। আমরা নামাজে শরীক হলাম। খুব শান্তি পেলাম। লক্ষণীয় বিষয় যে প্রতিটি নামাযের অন্তে জানাজার নামায থাকে। মদীনা শরিফেও দেখলাম প্রতিটি ওয়াক্তেই সম্ভবত নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। মনটা বিষন্ন হয়। এইভাবে প্রতিটি মানুষকে দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হয় একদিন।  কিন্তু আমরা সে কথাটি ভুলে বসে থাকি।
মসজিদে নব্বীতে জুমার নামায আদায় করে আমরা দ্রুত হোটেলে চলে আসি। আরো দ্রুত আমাদের ব্যাগ পত্র নিয়ে, কামরার চাবি জমা দিয়ে বাস ধরবার জন্য বেরিয়ে পড়ি । তড়িঘড়ি ট্যাক্সি ধরে বাসে এসে সিট নিলাম। যাত্রা হলো শুরু মক্কার উদ্দেশ্যে। বাসে খুব মজাদার খাবার পরিবেশন করলো। বাসমতি চাউলের ভাত, চারটি নাগেট, দুটি জয়তুন আর কোমল পানীয়, যাত্রাপথের জন্য যথেষ্ট এবং আরামদায়ক খাবারও বটে।
পথিমধ্যে আমাদের বাস মীকাতে এসে পৌঁছালো। মীকাত হছে একটি নির্দিষ্ট স্থান, যেখানে পৌঁছাবার পূর্বেই উমরাহ্‌ যাত্রীদেরকে ইহরাম বাঁধতে হয়। বাংলাদেশিগণ জেদ্দা বিমান বন্দরে পৌঁছাবার পূর্বেই মীকাত (ইয়া – লামলাম) অতিক্রম করে। সেজন্য ঢাকা থেকেই ইহ্‌রাম পরিধান করে উমরাহ্‌ পালনের লক্ষ্যে যাত্রা করেছিলাম। 
মদীনা শরীফ থেকে নবীজীর রওজা মোবারক জিয়ারত করে যখন মক্কা মদিনায় ফিরে আসি তখন এই মীকাতে আমাদের বাসটি থামে। বহু যাত্রী যারা উমরাহ্‌ পালনের জন্য মক্কায় এসেছিলেন তারা অবতরণ করেন। এখানে একটি সুন্দর মসজিদ আছে, পানি আছে। ফুলের বাগান এবং যথেষ্ট গাছগাছালি দৃষ্টিগোচর হলো। এই মীকাতে তীর্থ যাত্রীগণ ইহ্‌রামের শুভ্র সূতি বস্ত্র পরিধান করে, মসজিদে দুই রাকাত নফল নামায পড়ে, পুনরায় মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন। এখান থেকে শুরু হয় তাদের উমরাহ্‌ পালনের আচার আচরণ। 
একটি লক্ষ্যনীয় বিষয়, বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় প্রতি মিনিটে বাস এসে থামছে। অবতরণ করছে হাজার হাজার তীর্থ যাত্রীর দল। কত জাতের, কত বর্ণের, কত ভাষার, কত উচ্চতার, কত মোটা মানুষ আছে এ পৃথিবীতে তা এই এক জায়গায় বসে অবাক হয়ে দেখলাম। আশ্চর্য্য ব্যাপার হল বিভিন্ন জাতের মানুষ হওইয়া সত্ত্বেও ইহ্‌রাম বাঁধার পর সকলের চলাফেরা এবং ব্যবহার অভিন্ন। শতশত বাস দাঁড়ানো। হাজার হাজার মানুষ। দোকান আছে অসংখ্য। ইহ্‌রামের নানা কাপড়, সাদার মধ্যে সাদা ডিজাইন করা, ভারী রকমারি কাপড়, তসবিহ্‌, টুপি, আতর, খাদ্যদ্রব্য, প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি প্রচুর বিক্রি হচ্ছে। একসময়ে আমাদের বাস ছাড়লো। ঊমরাহ্‌ পালনকারীরা মৃদু স্বরে তালবিয়া – লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক – পাঠ শুরু করলেন। পরিবেশ এমন হলো যেন আমরা বেহেশতের উদ্যানে বেড়াতে এসেছি। এটা পৃথিবীর কোন স্থান নয়।
মক্কা শহরে পৌঁছাতে রাত হয়ে গেল। নৈশকালীন বিশ্রাম নিয়ে পরের দিন বাজারে ঘুরতে গেলাম। বিরাট মার্কেট একই বিল্ডিং এর ভিতর – বিচিত্র সম্ভারে পূর্ণ। ক্রেতার সংখ্যা প্রচুর, বিক্রেতার সংখ্যা একেবারেই কম। এখানে কেউ চুরি করে না, জালিয়াতি করে না। সিসিটিভি ক্যামেরা তো লাগানোই আছে। পরের দিন রোববার আমরা দ্বিতীয়বার উমরাহ্‌ করতে গেলাম। এবারের উমরাহ্‌র সংগী হলেন সুলাইমান। ডাক্তার তাহের সাহেবের পরিচিত বাঙ্গালী ছেলে। অতিশয় ভদ্র। ছোট বেলা থেকে মক্কায় থাকে তার বোনের সঙ্গে। লেখাপড়া আরবীতেই করেছে। ট্যাক্সি চালায়। নিজের গাড়ি। সেই ছেলেটি আমাদের সঙ্গে গেল। এবারও উমরাহ্‌ করবার জন্য ইহরাম বাঁধার প্রয়োজন পড়ে।  যেহেতু আমরা এখন মক্কা শহরের ভেতরেই অবস্থান করছি, সেহেতু আমরা তানাইম নামক মসজিদে প্রবেশ করি। সেখানে দুই রাকাত নফল নামায পড়ে উমরাহ্‌ পালনের নিয়ত করি। এই মসজিদটির আরেকটি নাম আছে। তা হচ্ছে আয়েশা মসজিদ। তারও একটি ইতিহাস আছে। এখান থেকে আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে মক্কা শরীফে  প্রবেশ করি। বিধি মোতাবেক সব কাজ সমাধান করে বের হয়ে আসি। 
বায়তুল্লাহ শরীফ (কা’বা শরীফ) হতে ফিরে এসে বাসায় বিশ্রাম করে বিকেলে বাজার দেখতে গেলাম। বাজারগুলো আজান পড়ার সংগে সংগে বন্ধ হয়ে যায়। প্রত্যেকে তখন নামাজ পড়ে যে যেখানে থাকে। এর কোন ব্যতিক্রম নাই। নামাজ শেষে পুনরায় মার্কেটের দরজা খুলে যায়।
পরের দিন দেখা হলো আরাফাতের ময়দান। বিরাট প্রন্তর। সারি সারি তাঁবু – শত শত। পাহাড়ের কোল ঘেঁষেও অনেক তাঁবু। গাছপালা আছে যথেষ্ট। তবে বিরাট বৃক্ষ নজরে পড়ে নাই। নিম গাছের প্রাচুর্য্য আছে। একস্থানে গাড়ি দাঁড় করিয়ে আরাফাতের ময়পদানে পা রাখলাম। বাঁদিকে মুজদালেফা –কাঁকড় পাথরে পূর্ণ। এই পাথরই শয়তানের উদ্দেশ্যে নিক্ষিপ্ত হয়। একুশটি করে পাথর এক একজন হাজী সাহেব সংগ্রহ করেন। সেগুলো সাতটি করে তিন শয়তানের উদ্দেশ্যে নিক্ষেপ করেন। বিরাট আকারের তিনটি শয়তানের প্রতিকৃতি (জামারা) নির্মাণ করা আছে। বড় শয়তান, মাঝারি ও ছোট শয়তান। এবং তিনদিন এই কঙ্কর মারতে হয়। হজ্জ্বের সময় প্রচন্ড ভিড় হয়। আমরা যখন গিয়েছিলাম, তখন একটি মানুষও দৃষ্টিগোচর হলো না।
কবরস্থান দেখার আগ্রহ আমার সবসময়ই। ফেরার পথে একটি কবরস্থানে যাত্রা বিরতি হলো। এই কবরস্থানের নাম জান্নাতুল মওয়া। তৃণ পল্লবহীন মাটির সমতল  প্রান্তর যেন শস্য বপনের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। এখানে হজরত খাদিজা (রাঃ) এবং আরো বড় বড় ব্যক্তি এবং বীরদের দেহ সমাহিত রয়েছে। কিন্তু কোন চিহ্ন নেই। সবই সমান, নীরব নিস্তব্ধ। অথচ এর নীচে কত পূণ্যবান মানুষ শায়িত আছেন অন্তহীন শয্যায়। সেখান হতে চলে গেলাম হেরা পর্বতের পাদদেশে। নাম তার জবলে নূর। এই হেরার গুহায় বসে আমাদের প্রিয় নবী হজরত মোহাম্মদ মোস্তফা (দঃ) আল্লাহ্‌র ধ্যানে মশগুল থাকতেন। বিবি খাদিজা এই বিপদসংকুল উচ্চ পাহাড়ে আরোহণ করে নবীজীকে আহার –সামগ্রী পৌঁছে দিতেন প্রতিদিন। এখানে দীর্ঘ সাধনার পর তাঁর ওপর ওহী নাজিল হয় –
“ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাজি খালাকা, খালাকাল ইনসানা মিন আলাক। ... পড়, পাঠ কর তোমার প্রভুর নামে, যিনি মানুষকে রক্তপিণ্ড থেকে সৃষ্টি করেছেন। যিনি মানুষকে কলমের সাহায্যে শিক্ষাদান করেছেন।”     
হেরা পর্বতের একদম গোঁড়ায় দাঁড়িয়ে দেখলাম কত নর নারী ধীরে ধীরে উপরে উঠে যাচ্ছে। সেই গুহা দর্শন করবার মানসে। মানুষগুলোকে এত ক্ষুদ্র দেখাচ্ছিল যে পোষাকের রঙ দেখে মানুষকে সনাক্ত করা হচ্ছিল। আমার আফসোস! আরো কম বয়সে আসলে আমরা হেরা পর্বতের গুহা দর্শন করবার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারতাম। এই হেরা পর্বতের পাদদেশের অদূরেই রয়েছে হজরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) এর জন্মস্থান। ছোট্ট একটি বাড়ি। প্রাচীর ঘেরা। জন্মস্থানের কক্ষটি বন্ধ থাকে। পাশে একটি লাইব্রেরী সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। বাইরে থেকে দেখে চলে এলাম। সরু পাহাড়ি রাস্তা। দু’পাশে ছোট ছোট দোকানপাট। পাশে, পেছনে, উপরে বিরাট বিরাট পাথরের চাঁই শাখা মেলে আছে। সূর্য অস্ত যায় যায়। রাস্তায় লোকজন নেই বললে চলে। প্রকৃতি শব্দহীন মৌন। বাসায় ফিরে এলাম। সাথে করে নিয়ে এলাম স্মৃতি যা চিরকাল অন্তরে মুদ্রিত থাকবে।  
উমরাহ্‌ করবার পর বিদায়ী তাওয়াফ করতে হয়। সূর্যের কিরণ প্রখর থাকায় সকালের দিকেই যেতে হলো। সেদিনও সুলাইমান সাথে। সুলাইমান বললেন, আজ পায়ে হেঁটে তাওয়াফ করবার চেষ্টা করেন। তেমন ভীড় নেই। আর যদি নাই-ই পারেন, তখন হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা করা যাবে। সেদিন সেই লোকটির সাহস দানের দরুণ কা’বা ঘর তাওয়াফ করলাম। যাবতীয় নিয়ম মেনে সাত বার প্রদক্ষিণ সমাপ্ত করে কা’বা ঘর সংলগ্ন খালি জায়গায় দুই রাকাত নামাজ পড়বার খুব ইচ্ছে হয়। প্রচন্ড ভীড়ের জন্য সেখানে ঢোকা সম্ভব হচ্ছিল না। দ্বিধায় পড়ে গেলাম। হঠাৎ জনতার চাপে আমরা সেখানে ঢুকে গেলাম। দাঁড়িয়ে দু’রাকাত নফল নামাজ আদায় করলাম। এখানে নামাজ পড়লে লক্ষগুণ সোয়াব বেশী পাওয়া যায়। মাত্র দুই তিন ফিট দূরে সামনে এগিয়ে গিয়ে কা’বা ঘরের গায়ে হাত দিয়ে স্পর্শ করি। দেহমনে এক অপূর্ব পূণ্যময় অনুভূতির সৃষ্টি হয়। অন্য সকলের মত আমারও চোখের কোল বেয়ে অশ্রুধারা নামতে থাকে। 
কা’বা  শরীফ ধরে মনপ্রাণ খুলে পরম করুণাময়ের নিকট ক্ষমা চাইলাম। নিজের, পরিবারের, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু বান্ধব সকলের  জন্য সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করলাম। মন হলো আমরা এই জনসমুদ্রে থেকেও যেন পৃথিবীতে ছিলাম না। অন্য কোথাও, অন্য কোনখানে, যেন সৃষ্টিকর্তার নিকটবর্তী হয়েছিলাম। যদিও তিনি সর্বদা আমাদের সাথেই আছেন। কি অপূর্ব আকর্ষণ কা’বা  শরীফের। ছেড়ে আসতে ইচ্ছা করে না। মনে হয় আরো ধরে থাকি কিছুক্ষণ। ভীড়ের চাপে সরে আসতে হলো। কত ভাষাভাষীর নারী পুরুষ। কিন্তু তাদের হৃদয়ের ভাষা এক রকম। যখন উচ্চারণ করে লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক – আমি হাজির আছি তোমার দরবারে – তখন এক স্বর্গীয় অনুভূতি প্রতিটি মানুষকে অন্য এক অপার্থিব জগতে নিয়ে যায়।
 তাওয়াফ শেষ করে সিঁড়িতে গিয়ে বসলাম। সেখানে জমজমের সুশীতল পানি পান করে প্রাণ জুড়ালো। বসে বসে দীর্ঘক্ষণ কা’বা  ঘরের দৃশ্য অবলোকন করলাম। চোখ ফেরানো যায় না। সেই ছোটবেলা থেকে যে ছবি দেখে এসেছি আজ তা চোখের সামনে। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে যে কা’বা  শরীফের দিকে মুখ করে নামাজ পড়ি – তা মাত্র কয়েক গজ দূরে। এইমাত্র ছুঁয়ে এলাম। কি এক চৌম্বক শক্তির বলে কেবলই  দেখতে ইচ্ছা করে। ভাল লাগায় হৃদয় মন আপ্লুত, তৃপ্ত। পরের শুক্রবারে আবার জুমার নামাযের সময়  দেখতে পাব এই আশা নিয়ে ঘরে ফিরে এলাম।
সেদিন বিকেলে গাজা এলাকায় বাজার করতে গেলাম। জায়নামাজ, তসবীহ, আতর –এসব জিনিসপত্র ক্রয় করে বাসায় ফিরে আসি। পরের দিন বৃহস্পতিবার বিকেলে মক্কা শরীফে এশার নামাজ আদায় করলাম। বেশী ভেতরে প্রবেশ সম্ভব ছিল না। প্রচন্ড ভীড়।  নামাজের  পর হোটেল হিলটনে ঘুরতে গেলাম। বিরাট বাজার! । বহুসংখ্যক এসকেলেটর বেশ দ্রুত গতিতে সারাক্ষণ উঠানামা করছে। আমার কন্যা হুমায়রার বলা মতো ‘গাজাজ’ নামক মার্কেটে প্রবেশ করলাম। নীচের তলায় বিরাট দোকান। চোখ ধাঁধানো আলো। তৈজস – পত্র মনকাড়া – তবে অগ্নিমূল্য।
আমার হাঁটার সমস্যা ছিল বলে বহু কষ্টে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে পৌঁছালাম। ট্যাক্সি পেতে একটু দেরি হলো। কারণ সকলেরই তখন নীড়ে ফেরার তাড়া। পরদিন শুক্রবার। জুমার নামাজ পড়তে হবে। আগে ভাগেই রওনা হতে হলো। কিন্তু যে ভীড়, সেই ভীড়। কোন কম নেই। বাইতুল্লাহ্‌ শরীফের পাশেই মসজিদের অভ্যন্তরে অবস্থান গ্রহন করলাম। দলে দলে মহিলা মুসুল্লিগণ এসে কাতারে দাঁড়ালেন। মুহূর্তে ভরে গেল সুদৃশ্য কার্পেট বিছানো নামাজের স্থান। মহিলাদের একদিক, পুরুষদের অন্যদিক। তবে সকলেই কা’বামুখী। সুদূর বাংলাদেশ থেকে আমরা যে কেবলামুখ হয়ে নামাজের জন্য দাঁড়াই –সেখানেও তাই। পার্থক্য এই যে কা’বাঘর বা কিবলা মাত্র কয়েক গজ দূরে –চোখের সামনে। কালো আচ্ছাদনের উপর সোনার সূতায় কোরানের আয়াত লিপিবদ্ধ করা আছে। তাও হাতের কারুকাজ মন্ডিত –ছাপার অক্ষর নয়। বিশেষ পরিবার কেবল এই কাজেই নিয়োজিত থাকে। সারা বৎসর ধরে এই কালো আচ্ছাদনের উপর অত্যন্ত তমিজের সাথে এই সূক্ষ্ম চারুশিল্পের চর্চা করেন তারা, সুন্দর আকর্ষণীয় রূপে তৈরী করেন। দেখতে দেখতে চোখ জুড়িয়ে যায়। অন্তর আত্মা এক আধ্যাত্মিক অনুভূতিতে পূর্ণ হয়। ক্লান্তি আসে না। মনে হয় আরো দেখি, আরো চেয়ে থাকি। এত কি জাদু আছে জানি না, তবে আছে এক অনির্বচনীয় আকর্ষণ ও সন্তুষ্টি।
জুমার নামাজের জন্য আমরা অপেক্ষা করছি সবাই। এরই মাঝে যে যার মতো নামাজ পড়ছেন, কোরান পাঠ করছেন। ওখানে মসজিদের ভেতর বিরাট বিরাট পিলারের গায়ে শেলফ আছে। তাতে রক্ষিত আছে অনেক কোরান শরীফ। যে যার যার মত গিয়ে পাঠ করছেন আবার সুন্দর ভাবে সঠিক স্থানে রেখে দিচ্ছেন। অগণিত মানুষ। সকলের উদ্দেশ্য এক! চিত্ত মহান আল্লাহ্‌র উদ্দেশ্যে নিবেদিত। বিনয়ী, নম্র, ভদ্র, কারো কোন অহংকার নেই। জুমার নামাজ শুরু হলো। নামাজ শেষে মন প্রাণ ঢেলে প্রার্থনা করলাম। সুখে দুঃখে চিত্ত ভারাক্রান্ত। এগিয়ে গেলাম আরো সামনের দিকে যেন কা’বা ঘর ভালোমত দেখতে পাই। এমন সময়ে সামনের কাতারের একজন ইরানী মহিলা আমাকে একটি রুটির বড় টুকরা দিলেন। আমি কিছুতেই নেব না। তবুও তিনি ও তারা আমাকে সেটি জোর করেই দিয়ে দিলেন। শুকরিয়া জানিয়ে সম্মুখপানে এগিয়ে গেলাম। ইংরেজী জানেন বলে মনে হলো না। সামনে অগ্রসর হয়ে রওশন আরা ভাবীর সঙ্গে দাঁড়ালাম। নির্নিমেষ নয়নে কা’বা ঘর দেখতে থাকলাম। ততক্ষণে আমার স্বামী মোহাম্মদ হারুন এবং ডাক্তার তাহের ভাই আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। স্বচক্ষে কা’বাঘর দেখার সৌভাগ্য আর কোনদিন হবে না। তাই দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বাইতুল্লাহ্‌ শরীফের অপরূপ শোভা পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম। ফেরার পথে একটি তুর্কী রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করি। অনেক বাঙ্গালী কর্মচারী। আরবী বলছে অনর্গল। খাবারও আমাদের পছন্দের সঙ্গে মেলে। অনেকটা মোগলদের স্টাইল। মজাদার খাবার সংগ্রহ করে বাসায় ফিরে এলাম।
সেদিন রাতে মোটামুটি এবং পরেরদিন শনিবার সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলাম। শনিবার মধ্যরাতে আমাদেরকে জেদ্দা বিমান বন্দরের উদ্দেশ্যে বের হতে হবে। সময় মতো সুলাইমান ট্যাক্সি নিয়ে হাজির। তাহের ভাই আমাদের সঙ্গে। তিনি এত পরিশ্রম ও এবং সহযোগিতা করেছেন যা কল্পনার অতীত। তার সহযোগিতা পেয়ে আমরা যেন সত্যি স্বর্গরাজ্য ভ্রমণ করে এসেছি।  জেদ্দা বিমান বন্দরে ভি.আই.পি., লাউঞ্জে খুব সুন্দর ব্যবস্থা। বসার ব্যবস্থার পাশেই টিভি স্ক্রিন, খাবার, ফলমূল, চা, কফি অঢেল। একটুক্ষণ পর ভোর হলো। দোর খোলার প্রশ্ন নেই যদিও। কারণ দরজা সব খোলাই। টিভি স্ক্রিনে আমাদের বিমানের ফ্লাইট নাম্বার এবং ছেড়ে যাওয়ার সময় দেখাচ্ছে। আমরা বাসে উঠে বিমান বন্দরের ভেতর দিয়ে সাউদিয়া এয়ার লাইন্সের বিমানের সিঁড়ির নকটবর্তী হলাম। ধীরে ধীরে এক পা, এক পা করে মক্কার মাটি পেছনে ফেলে জাহাজে আরোহণ করে বরাদ্দকৃত সীটে গিয়ে উপবেশন করলাম। উল্লেখযোগ্য যে, এই সীটেই বসেই আমরা জেদ্দা গিয়েছিলাম। আমাদের সামনে আর কোন সীট ছিলনা।
এবার বিমান উড্ডইয়নের পালা। উচ্চতা ভীতি আমার আগেও ছিল, এখনো আছে। যথারীতি সীট বেল্ট বেঁধে আল্লাহ্‌র নাম স্মরণ করে , দোয়া দরূদ পড়তে পড়তে উর্ধ্বাকাশে উঠে গেলাম। বিমানে খুব যত্ন করেছে এয়ার হোস্টেসগণ। সুস্বাদু খাদ্য পানীয় সরবরাহ করেছেন প্রচুর। আপ্যায়নের অন্ত নেই। অপরাহ্নে ঢাকা এয়ারপোর্টে অবতরণ করলো আমাদের বিমান। ক্রুদের ধন্যবাদ জানিয়ে বিমান থেকে বেরিয়ে এলাম বোর্ডিং ব্রিজের মধ্য দিয়ে। দাঁড়ালাম কনভেয়ার বেল্টের পাশে। মালপত্র এসে পৌঁছাল হাতের কাছে। দুটি ট্রলিতে সেগুলো তুলে নিয়ে আমরা দু’জন অগ্রসর হলাম নির্গমনের পথ ধরে। হঠাৎ দেখি আমাদের নাতনী ছোট্ট ফারহিন আর তার বাবা ববি হাস্যমুখে দডায়মান।  ছোট্ট ফারহিনকে তার বাবা, বারের ওপর দিয়ে এপাশে ছেড়ে দিল। সে ছোট্ট হাতে আমাদের ট্রলি ঠেলতে সাহায্য করলো। পুত্র কায়সার হারুন ববি নিয়ে এলো আমাদেরকে বাইরে। গাড়ি ডাকলো। বাক্স পেট্‌রা গাড়িতে তুলে আমরা মহাখালী ডি ও এইচ এস (DOHS)এর বাসার দিকে রওনা হলাম। বাসায় অপেক্ষা করছিল পুত্রবধূ তানিয়া ও অন্যান্যরা । সবাইকে দেখে প্রাণ জুড়িয়ে গেল। শান্তির নীড়ে আপনার জনের মাঝে ফিরে এলাম।।                               
............
অগাস্ট ২০১১, ঢাকা 

3 comments:

  1. shorter version: মক্কা মদিনায় ১৫ দিন
    পবিত্র মক্কা মদিনায় কোনদিন যেতে পারবো কল্পনা করতে পারিনি। হঠাৎ করে সুযোগ এসে গেল। আমাদের নিকট আত্মীয় ডা. মোহাম্মদ আবু তাহের মক্কায় বসবাস করেন। তিনি আমার পুত্রের শ্বশুর, যিনি একজন সার্জন, সৌদি সরকারের কিং ফয়সল হাসপাতালে চাকুরী করেন। তিনি বললেন, উমরাহ ভিসা দেওয়া শুরু হয়েছে, আপনারা একবার আসেন। আমার স্বামী লে. কর্নেল ডা. মোহাম্মদ হারুন রাজী হয়ে বললেন ‘চল ঘুরে আসি।’ এরপর হয়তো যাওয়া হবে না বয়সের ভারে। প্রস্তুতি নিলাম সেই সুদূর মক্কা মদিনার পূণ্যভূমি স্বচক্ষে দেখব বলে। আমার পূর্ব পুরুষেরা , আমার মাতামহ, আজ থেকে প্রায় ১২৫ বৎসর পূর্বে এই পবিত্র ভূমিতে নগ্ন পদে কা’বা ঘর প্রদক্ষিণ করেছিলেন বহুবার। নানাজান মো. হানিফ সেখানে একটানা বসবাস করেছিলেন ১১ বছর। সঙ্গে ছিলেন তাঁর বালক পুত্র মো. সিদ্দিক। এর আগে ও পরেও তিনি কয়েকবার গিয়েছেন মক্কায়।
    সতেরই এপ্রিল বিকালের ফ্লাইটে ঢাকা এয়ারপোর্ট ত্যাগ করলাম। সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের বিশাল প্লেই ডানা মেলে দিল মুক্ত বিহঙ্গের মতো। সাড়ে পাঁচ ঘন্টা উড্ডয়নের পর জেদ্দা বিমান বন্দরের ভূমি স্পর্শ করলো আমাদের বাহন। ঢাকার সূর্য আমাদের সাথে সাথে ভ্রমণ করছিল। ঘড়ি অনুযায়ী যখন বাংলাদেশে মাগরিবের আযান হচ্ছিল তখনও প্লেনের বাইরে রৌদ্র ঝলমল উজ্জ্বল দিন। ঢাকার রাত নয়টার পর প্লেনে সূর্যাস্তের সময় হলো। ঘটনাটি খুব মজার। জেদ্দা বিমান বন্দর বিরাট এলাকা। কত যে প্লেন দাঁড়িয়ে আছে ! বারো মিনিট বাস চলার পর আমরা বন্দর টার্মিনালে পৌঁছালাম। সেখানে দিবালোকের মত ড্যাজলিং লাইট। এখানে বাসের কথা একটু বলতে হয়। বাসের ভেতরে কিছু কিছু সীট, কিছু চেয়ার টেবিল, কিছু খালি জায়গা – ছোট খাটো মালপত্র রাখার জন্য। বাস থামলে যাত্রীরা সব হুড়মুড় করে নেমে পড়লো। আমরা ইহরাম বাঁধা উমরাহ’র যাত্রীরা নির্দিষ্ট লাইনে দাঁড়ালাম। লম্বা লাইন অনেক। আমি আমার স্বামীর পাশে দাঁড়ালাম। আমার সামনে আরেকজন মহিলা তার সঙ্গীর পাশে দাঁড়িয়ে। হাসিমুখে তাকাচ্ছেন আমার দিকে। জানতে চাইলাম , ‘হোয়্যার ডু ইউ কাম ফ্রম?’ বলেন সাউথ আফ্রিকা। আমি নিজের দেশের নাম বললাম, বাংলাদেশ। চিনতে অয়ারলেন। আগে তিনি পাকিস্তানে ছিলেন। এবার উমরাহ করতে এসেছে, ইতিপূর্বে হজ্ব করেছেন। দু’চার কথা বলার পর দেখি মহিলাদের একটি নাতিদীর্ঘ লাইন। সেখানে আমার কাগজপত্র নিয়ে দাঁড়ালাম। সেই মহিলাকে আমার সঙ্গে ডেকে নিলাম। খানিকক্ষণ পর আমার পাসপোর্ট চেক করে একটি কাগজ দিয়ে ছেড়ে দিল। সেই ভদ্রমহিলাও পাসপোর্ট চেক করতে দিলেন। আমি আমার লাগেজপত্র ট্রলিতে তুলে নিয়ে একটু দূরে হারুন সাহেবের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। ওনার ছাড়পত্র পেতে বেশ সময় লাগলো। এদিকে ডা. আবু তাহের আমাদের জন্য আপেক্ষা করছিলেন। তার সহায়তায় আরো ঘন্টা খানেক পাসপোর্ট পরীক্ষা নীরিক্ষা করিয়ে এয়ারপোর্টের বাইরে পার্কিং লটে এসে পৌঁছালাম। এসময়ে কে যেন আমা হাতখানি ধরে ফেললো। চমকে চেয়ে দেখি দক্ষিণ আফ্রিকার সেই ভদ্রমহিলা। খুশীতে আনন্দে আমার ‘বক্ষমাঝে চিত্ত আত্মহারা নাচে রক্তধারা’, বললেন যাচ্ছেন?
    - হ্যা মক্কাএ যাচ্ছি। আগামীকাল উমরাহ করে পরশু বিশ্রাম। তার পরদিন বুধবার মদীনা শরীফের উদ্দেশ্যে
    রওনা হব।
    - আমরাও বুধবারে মদীনায় যাব। দেখা হবে আবার।
    - দেখা হবে ইনশাল্লাহ বলে তার হাতে মৃদু আন্তরিকতার চাপ দিয়ে হাতখানি ছেড়ে দিলাম। তাঁর হাতখানি
    ছেড়ে দিয়ে কেন জানিনা, চিত্ত চঞ্চল হল। হৃদয় হল বেদনায় ভারাক্রান্ত। ‘আরো কিছুক্ষণ না হয় রহিতে কাছে।’ সময়ের স্বল্পতা হেতু চলে আসতে হল। এই অয়তো মানুষের মন। স্বল্প সাক্ষাতে কত আপন হয়ে যায়।

    ReplyDelete
  2. মক্কা শহরে এসে পৌঁছালাম দেড় ঘন্টা পর। ১২০ মেইল স্পীডে গাড়ি চালানো কোন ব্যাপারই নয়। মক্কা শহরের খীসায় ডা. আবু তাহেরে বাসা। সেখানেই আমরা উঠলাম। পরেরদিন সকালের দিকে ক্বাবা শরীফে উপস্থিত হয়ে উমরাহ পালন করলাম। সাতবার বাইতুল্লাহ শরীফ (কা’বা ঘর) প্রদক্ষিণ করে সেগুলো কেটে অত্যন্ত সুন্দর মসৃণ সুদৃশ্য রাস্তা তৈরী করা হয়েছে। বিল্ডিং এর ভেতর দিয়ে অনায়াসে সাতবার সায়ী করা যায়। নিয়ম মাফিক সব কাজ সম্পন্ন করে বাসায় চলে এলাম। মিসেস আবু তাহের আমাদের প্রিয় ভাবী ডা. রওশন আরা আমাদের খুব দেখাশুনা করেছেন। সব সময় সঙ্গ দিয়েছেন। বুধবার উনি আমাদের সঙ্গে মদীনা শরীফে রওনা হলেন। পৌঁছাতে রাত হলো। হোটেল পেতে সময় লাগলো। কারণ সব হোটেল বুকড। এই কষ্টের কাজগুলো ডা. তাহের করলেন। চারশয্যা বিশিষ্ট কক্ষ পেলাম। দুই কামড়া ভাড়া নিলাম। রাত তিনটায় মদীনায় মসজিদে – নব্বীতে ফজরের নামাজ আদায় করবার জন্য রওনা হলাম। মসজিদের চত্বরে জায়গা পেলাম তাও গেটের কাছাকাছি। এত রাতে এত লোকের সমাগম দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হলাম। কিন্তু এ লোকের সমাবেশে কোন কোলাহল নেই। সকলেই বসে যার যার মত এবাদত বন্দেগী করছেন। মেয়েদের দিকটি পৃথক করা। তবুও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। কোনরকম জায়গা করে বসে পড়লাম। কোরান তেলাওয়াত, নফল নামাজ পড়তে পড়তে যোহরের ওয়াক্ত এসে গেল। জামাতের সংগে যহরের নামাজ আদায় করলাম। আশ্চর্য্য হয়ে লক্ষ করলাম ভোরের পাখির কিচির মিচির আওয়াজ। ভোরের আলো ফুটে উঠলো। সময়টা বড়ই মৌন শান্ত, পবিত্র। বড়ই স্বর্গীয় সুষমায় মন্ডিত। হাজার হাজার লোকের ভীড় ঠেলে দীর্ঘ সময় ধরে বাইরে এলাম। এরকম ভীড় এখনে প্রতিদিন হয়। অধিকাংশই আমাদের মতন নবীন তীর্থ যাত্রী। সেখান হতে বেরিয়ে বাঙ্গালী রেস্টুরেন্ট থেকে খাদ্য সংগ্রহ করে হোটেলের রুমে এসে ব্রেকফাস্ট করে নিলাম। বেলা দশটার দিকে আবার বের হলাম। প্রথমে জান্নাতুল বা’কী। দারোয়ান ভিতরে ঢুকতে বাধা দিল। বললো ঢোকার সময় শেষ। বিফল মনোরথ হয়ে পাশের গ্রিলের দেয়াল ঘেঁষে সমাধিক্ষেত্রের ভিতরে দৃষ্টিপাত করলাম। মৃত্তিকা, কাঁকড় পাথরের মাঠ বিস্তীর্ণ। এটিই কবরস্থান। বিখ্যাত জান্নাতুল বা’কী। আমরা বাইরে থেকেই কবরস্থান জিয়ারত করলাম। হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ), হজরতা ফাতেমা (রাঃ), হজরত হাসান (রাঃ) আরো অসংখ্য সাহাবী বুজুর্গানেদ্বীন এখানে শেষ শয্যায় শায়িত আছেন।
    মদীনা শরীফে আমরা বেশ কয়েকটি মসজিদ পরিদর্শনে গেলাম। সেখানে প্রত্যেক মসজিদে দুই রা’কাত করে নামাজ আদায় করে মসজিদগুলো ঘুরে ঘুরে দেখলাম। তারমধ্যে দেখেছি মসজিদ –এ কুবা। হজরত মোহাম্মদ (সাঃ) যখন হিজরত করে মদীনায় আসেন তখন তিনি এই মসজিদটির বুনিয়াদ স্থাপন করেন। আরেকটি মসজিদে নামাজ পড়েছি তার নাম মসজিদে ক্বিবলাতাইন। পূর্বে জেরুজালেমের মসজিদ আল আকসা কে কিবলা ধরে নিয়ে সেদিকে মুখ করে নামাজ আদায় করা হতো।

    ReplyDelete
  3. কিন্তু নবীজীর অন্তর চাইতো মক্কার হারাম শরীফকে কিবলা করে নামাজ পড়তে। অবশেষে মহান আল্লাহ তা’য়ালা তার মনেরত বাসনা পূরণ করলেন। একদিন জোহরের নামাজ পড়ার সময় সেই নির্দেশ অন্তরে অনুভব করলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি জামাত সহ ঘুরে বাইতুল্লাহ শরীফের (মক্কা শরীফ) দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে নামাজ শেষ করলেন। এই মসজিদের দক্ষিণ দেয়ালে স্থাপিত হলো কিবলার চিহ্ন। সেই সময় থেকে নবীজীর প্রিয় কা’বা ঘর সারা পৃথিবীর কিবলায় পরিণত হয়। তারপর গেলাম ওহুদের ঐতিহাসিক যুদ্ধক্ষেত্রে। এখানে অবিশ্বাসীদের সঙ্গে যুদ্ধ করে বহু সাহাবী শহীদ হন। তাদের সকলের সমাধিক্ষেত্র এই ওহুদের প্রান্তরে গ্রিলের বেষ্টনী দ্বারা সুরক্ষিত আছে। এবার মসজিদে নব্বীর দিকে রওনা হই জোহরের নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে। এবার ভাগ্য ভাল মসজিদের অভ্যন্তরে যেতে সমর্থ হই। মসজিদে নব্বী এক বিরাট মসজিদ। এই মসজিদ তুর্কী নির্মাণ প্রকৌশলীদের কারুশিল্প এবং চারুশিল্পের সমন্বয়ে নির্মিত এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্য্যের নিদর্শন। যার এর সৌন্দর্য্য দর্শন করেছেন তারাই কেবল এর বর্ণণা বুঝতে সক্ষম। এর কারুকাজ মন্ডিত খিলান চারিদিকে বিস্তৃত। সবুজ এবং ক্রিম কালারের সমন্বয়ে এই ডিজাইন তৈরী। বিস্তীর্ণ ফ্লোর কারুকাজ খচিত মখমলে আবৃত। বিরাট পিলার সমূহ যার নীচের দিকটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত করে। শুনেছি এর উপর দিকে অনেক ডোম আকৃতির মত স্থান আছে। ভোরের দিকে সেগুলো সরে যায় তাতে ভোরের প্রথম্ম নরম আলো মসজিদে প্রবেশ করে। তখন এক অনুপম সৌন্দর্য্যের সৃষ্টি হয়। মুসল্লিদের অন্তরে এক স্বগীয় সুখের অনুভূতির সঞ্চার হয়। আল্লাহর অশেষ কৃপা লাভের আশায় ব্যাকুল হয়। কিছুক্ষণ পর সেই ছাতা আপনি আপনি বন্ধ হয়ে যায়। বাইরে তখন ঊষার কোলে রাঙ্গা রবি প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। আমরা মসজিদের ভিতরে নফল নামাজ পড়ে কোরান তেলাওয়াত করে সময় কাটালাম। জোহরের আজান হলো। ফরজ নামাজ জামাতের সাথে আদায় করলাম। প্রচন্ড ভীড় । দাঁড়ানোর স্থান নেই। নামাজ শেষ হলো। মসজিদে নব্বীর ভিতরে মেয়েরা একদিকে। কারুকাজ করা শক্ত কাঠের দরজার ওপারে পুরুষদের জন্য স্থান। নামাজ অন্তে সেখানকার পুরুষ মুসল্লিদের সরিয়ে দিয়ে একটি বিশাল লম্বা চাকাওয়ালা পার্টিশান টেনে দিয়ে মহিলাদের জন্য দরজা খুলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে মহিলারা এমন দৌড় প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হলেন যে সে এক বিস্ময়কর দৃষ্য বটে। আমার পায়ে ব্যথা। সেজন্য আমি এবং রওশন আরা ভাবী একপাশে একটু ধীরে চলতে লাগলাম। কারণ নবীজীর রুজা মোবারক গ্রিল দিয়ে ঘেরা। সেই কক্ষে প্রবেশ করে বুঝতে পারলাম কি ভয়ংকর চাপ। মনুষ্য স্রোতের চাপ। সেই চাপ সহ্য করে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি কোন মানুষের নেই। কয়েক নজর রওজা মোবারকের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নিজের প্রাণ রক্ষায় ব্যস্ত হলাম।

    ReplyDelete

উৎসর্গ

 আমার পিতাকে যাঁর জীবনের পাথেয় ছিল আপোষহীন নীতি আর শৃঙ্খলা।   আমার মাতাকে ছেলেমেয়েদের মেধা ও মননশীলতায় যিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। আমার স্বামী...