ভূমিকা
ইতিহাস আমার প্রিয় বিষয়। অতীতের অজস্র বিস্মৃতি রাশির বিশেষ বিশেষ ঘটনার রেকর্ড বিশেষই ইতিহাস নয়। what men have done said and thought is history. সুতরাং জীবন ও জগতের যাবতীয় কর্মকান্ডকে ধারণ এবং বহন করাই ইতিহাসের কাজ।
১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হই। লেখা পড়া, লাইব্রেরি ওয়ার্ক,আড্ডা দিয়ে আনন্দে দিন কাটাই। একদিন শুনতে পাই আমরা ঐতিহাসিক ট্যুরে যাবো!
কোথায় যাবো?
পশ্চিম পাকিস্তানে।
আমরা তিন বন্ধু –আয়েশা আক্তার, নুরুন নাহার, আর আমি –আনন্দে আত্মহারা।
আমরা তখনকার একমাত্র উইমেন্স হলের (রোকেয়া হলের) আবাসিক ছাত্রী। বাড়ি থেকে পারমিশান নিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে ফেললাম। তখনকার দিনে আভিভাবকগণ খুব সহজে মেয়েদেরকে কোথাও যেতে দিতেন না। আমাদের সঙ্গে ছিলেন একজন উর্দূভাষী স্যার। তাঁর নাম আজগর আলী। সংগে ছিলেন তাঁর স্ত্রী, যিনি ইডেন কলেজের জিওগ্রাফির প্রফেসর। আমাদের অন্য সংগীরা ছিলেন আমাদের ডিপার্টমেন্টের ছাত্ররা। বেশ বড় একটি দল। আমরা মেয়েরা তিনজন আর স্যারের স্ত্রী সবসময় একসঙ্গে থাকতাম।
আমাদের আনন্দের সীমা নেই যে, আমরা পশ্চিম পাকিস্তানের প্রসিদ্ধ স্থান সমূহ দর্শন করতে যাবো। যুগে যুগে সেখানকার উত্তর পশ্চিম প্রদেশের গিরিপথ দিয়ে ভিনদেশী মুগল, পাঠান, আর্য, অনার্য বহুজাতের মানুষ এই অবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করেছে। দখল করেছে, শাসন করেছে, লুন্ঠন করেছে, ধ্বংস করেছে। আবার গড়ে তুলেছে অনেক কীর্তি। বহু শতাব্দী পূর্বের এসব কীর্তি আজ দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। একদা যেসব স্থান রাজ রাজড়ার পদভারে প্রকম্পিত ছিল, মুখরিত ছিল,আজ সেসব অঞ্চল নীরবে নিভৃতে তার প্রভুর স্মৃতিচারণ করে চলছে।
নয়ন জুড়ানো বাগান, স্মৃতসৌধ, সমাধি, প্রাসাদ, দুর্গ, বৌদ্ধদের কীর্তি, আবিষ্কৃত প্রাচীন সভ্যতা, আরোও বহু নিদর্শন যেগুলো জাদুঘরে ঠাঁই করে নিয়েছে –প্রায় সব কিছুই আমাদের দেখা হলো। বইয়ের পাতা ছেড়ে জীবন্ত ইতিহাসের পাতার উপর দিয়ে বেড়িয়ে এলাম। সঙ্গে দেখে এলাম ভৌগলিক নিসর্গ। পাহাড় –পর্বত, চড়াই উৎরাই, বিশাল সাগর সৈকত, বিচিত্র মানুষের বিচিত্র জীবন যাত্রা, ভাষা, চরিত্র, অভ্যাস এবং আরো কত কি!
আনন্দ এবং বিস্ময় প্রকাশ করবার ভাষা আমার জানা নেই। তবুও এ ক্ষুদ্র প্রয়াস।
১৬ ই জানুয়ারি, ১৯৬৪ সাল।
বেলা ১১টায় ঢাকার মাটি ছেড়ে আমাদের বাহন উর্ধ্বাকাশে ছুটে চললো। নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সুজলা, সুফলা আর শস্য শ্যামলা পৃথিবীকে। ঢেউ খেলানো ধানের ক্ষেত আর সবুজ বনানী মিশে যেন তাকে মখমলের কার্পেটে আবৃত করে রেখেছে। তার মাঝে ছোট ছোট নদীগুলোকে যেন নীল সুতোর মতো দেখাচ্ছে। ছোট ছোট শহরগুলোকে খন্ড খন্ড ইটের স্তুপের মত মনে হচ্ছিল। বিশেষ ঘোষণায় হঠাৎ চমক ভাঙ্গলো। ভদ্র মহিলা এবং মহোদয়গণ, আমরা এখন দিল্লী নগরীর উপর দিয়ে যাচ্ছি। দিল্লীর উপর দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ চললাম। যা দেখলাম তাতে দিল্লী নগরীর আয়তনের কথা চিন্তা করে বিস্মিত হলাম। মনে পড়লো এই সেই দিল্লী নগরী যা যুগে যুগে কত শতাব্দী ধরে শত শত মানুষকে আকর্ষণ করেছে। কত শাসকের পদানত হয়েছে। কখনো বা মানুষকে বিজয়ের জয়টীকা পরিয়ে বরণ করে নিয়েছে আবার কখনো বা তাকে অবহেলা দিয়ে দূরে ঠেলে দিয়েছে।

আরো কিছুক্ষণ পরেই আমাদের বহনকারী রথ লাহোরের মাটির পরশ পেয়ে গতি হারিয়ে ফেললো। আমরা নেমে এলাম। হিমশীতল করস্পর্শে লাহোর নগরী আমাদেরকে অভ্যর্থনা জানালো। শৈত্যের প্রচন্ডতায় চিত্ত শংকিত হলো। কিন্তু মুখের ভাবখানা স্বাভাবিক রেখে খেয়াবান হোটেলে আশ্রয় নিলাম। প্রথম দর্শনে ইতিহাস প্রসিদ্ধ নগরীকে পছন্দ করতে পারলাম না। মনটাই খারাপ হয়ে গেল। কোথাও ঢাকা শহরের মতো রিক্সা নেই। কিন্তু আছে অসংখ্য টাঙ্গা –এক ঘোড়ার গাড়ি। তাতে যাত্রীরা কেউ সামনের দিকে মুখ করে। আবার কেউ পিছনের দিকে মুখ কর বসে আছে। বেচারা ঘোড়ার চোখে লাগানো আছে ঠুলি। কেবল সামনের পথ দেখার জন্য একটু ফাঁক আছে। রাত্রে শুয়ে যখন অশ্বের একটানা ক্ষুরধ্বনি কানে এলো তখন বাদশাহী আমলের কথা মনে পড়ে গেল। ঘোড়াগুলো যেন অতীতের জীবন্ত সাক্ষী। প্রতি পদক্ষেপে যার অতীত ইতিহাস প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
পরদিন প্রভাতে সম্যক পরিচয় হলো লাহোরের সাথে। পাঞ্জাব ভারসিটির সাথে যোগাযোগ করলাম আমরা। ওরা আমাদের আগমনে খুশী হয়ে আমাদেরকে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বাস পাঠিয়ে দিল। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের একটি দল। ওখানে ইতিহাস বিভাগের ছাত্র ছাত্রী দের সঙ্গে পরিচয় হলো। সে যুগে ছেলেমেয়েদের অবাধ মেলামেশা না থাকায় আমরা ডিপার্টমেন্টের মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশা করলাম। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাংগনে প্রবেশ করে কল্পনার সঙ্গে বাস্তবের একটু সংঘর্ষ হয়ে গেল। ইমারত সমূহ মনকে তুষ্ট করতে পারলো না। কিন্তু তার ভিতরের ঐশ্বর্য্যে মুগ্ধ না হয়ে পারিনি। দেশী বিদাশী ছাত্রদের মহাসমাবেশ। দেখলাম যে কয়েকজন মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হল, তারা দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি মিষ্ট ব্যবহার আর সামাজিক। দূর হতে তাদের উদ্ধতপনার কথাই শুনে এসেছি। কিন্তু আজ মনে হলো ওরা যেন আমাদের অনেক দিনের চেনা, অনেক কাছের মানুষ। সুখে দুঃখে, স্নেহ মমতায় আর সহানুভূতিতে ওদের অন্তর পূর্ণ। লাহোর বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো তার নিজের জাদুঘর। আয়তনে বিরাট। দ্রাবিড় সভ্যতা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ইতিহাসের পাতায় পাতায় যা লিপিবদ্ধ রয়েছে তার প্রতিটি সাক্ষর রয়েছে এই জাদুঘরে। কোন নামকরা জাদুঘরে এত জিনিস, এত নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যাবে না। পূরাকালে মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিস পোশাক অস্ত্র –শস্ত্র, মোঘলদের ঢাল তলোয়ার, রাজা রানীদের মূল্যবান পরিচ্ছদ সব জীবন্ত হয়ে আছে।
পাক ভারতের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্মের প্রতিটি স্বাক্ষর –ঈদের মাঠে, নামাজে, পূজায়-পার্বনে, গোরস্থানে, শ্মশানে, সুখে দুঃখে, ব্যায়ামে, খেলায় ধুলায় প্রতিটি মানুষের অনুভূতি মাটির তৈরী মূর্তিতে চমৎকার সুন্দরভাবে মূর্ত হয়েছে। ইতিহাস যেন এই রূদ্ধদ্বার যাদুঘরের কক্ষে কক্ষে আপনা – আপনি কথা কয়ে চলেছে। সুদূর অতীত থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি মানুষের চিন্তার প্রতিফলন দেখা যায় এই মিউজিয়ামে। পরের দিন গেলাম ইতিহাস প্রসিদ্ধ স্থানগুলো পরিদর্শন করতে। প্রথমে প্রবেশ করলাম শালামার গার্ডেনে। বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে এ বাগান। সম্রাট শাহজাহানের সৌন্দর্য্যানুরাগের বার্তা দর্শকদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। বিরাট চওড়া পাঁচিলে ঘেরা এ বাগানে বিভিন্ন প্রকারের ফুল ফলের সমাবেশ। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এর ঝর্ণাগুলো। প্রবেশ পথের দুধারে অসংখ্য ঝর্ণা। স্বচ্ছ জল সূর্যের কারণে এক মায়াময় উদ্যান হয়তো বা এরকমই হবে।
পরের গন্তব্যস্থল হলো শীষমহল, যার কথা অনেক শুনেছি। দুর্গের ভেতর আজ তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমরা। বাস্তবে শীষমহল আমার কল্পনার শীষমহলের চাইতে বহুগুণ সুন্দর। শীষমহল আয়নার কাঁচ দিয়ে নির্মিত। সম্রটের সৌন্দর্য্যানুভূতি আর শিল্পানুরাগকে শ্রদ্ধা জানালাম। পাথরের উপর খোদাই করা কাজ ফুল, লতা, পাতা, আরো নানাবিধ নকশা। বিভিন্ন রঙের সমাবেশ –সেগুলোকে আরো মনোরম এবং মোহনীয় করে তুলেছে। এদের বিশেষত্ব হলো যে প্রতিটি লতা – পাতা, ফুলের পাপড়ি একই পাথরের উপর অংকিত নয়। এদের প্রতিটি পাতা , পাপড়ি, লতার নিজস্ব বর্ণের পাথর আছে। সে পাথর আকার অনুযায়ী অতিশয় নৈপূন্যের সঙ্গে পাশা পাশি বসিয়ে একটি ফুল বা পাপড়ি ইত্যাদি তৈরী করা হয়েছে। এরা যে বিভিন্ন রঙের পাথরের সমাহার তা বোঝার কোন জো নেই। এত নিপুণ করে বসানো হয়েছে যে, তা সত্যি হলেও অবিশ্বাস্য। মনে হয় পেইন্ট করা কারুকাজ। নাচ ঘরটি আরোও সৌন্দর্য্যমন্ডিত। মণিমুক্তা আর ত্রিকোণ কাজ দিয়ে তৈরী। নাচে নৃত্যরত তরুনীদের নাচের দৃশ্য, মাথার উপরে গম্বুজ আকারের ছাদের গায়ে হাজার হাজার তরুণীর লীলায়িত নৃত্যের ছায়া, দর্শকদের চিত্তকে আত্মহারা করে!
এখানকার বিখ্যাত বাজার আনারকলি মার্কেট। এই মার্কেট কাছের এবং দূরের বহু মানুষকে আকর্ষণ করে। শুনেছি সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রেয়সী আনারকলির নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে। লোকে বলে প্রচন্ড পরাক্রমশালী সম্রাট আকবরের পুত্রের প্রেমিকা আনার কলিকে এখানেই কোথাও সমাধিস্থ করেছিলেন। তাকে শৃংখলিত অবস্থায় চারপাশে দেয়াল তুলে চিরকালের মতো বন্দী করা হয়।
একদিন বিকেলে লাহোর একাডেমীতে গেলাম তাদের আমন্ত্রণে। এটা সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিসের (CSS) শিক্ষাগ্রহণ কেন্দ্র। এদিককার লাহোর শহর বড়ই আধুনিক। এ নগরীতে দেখলাম পুরাতন অতীত আর নতুন বর্তমান –যার যার বিশেষত্ব বজায় রেখে পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে চলেছে। শেষের দিকে যেন লাহোরের প্রেমে পড়ে গেলাম। শহর ছেড়ে যেতে বড় কষ্ট হচ্ছিল এখানে কয়েকটি ছেলেমেয়েকে দেখে বাঙ্গালী মনে হলো। কাছে গিয়ে বাংলাতেই তাদের পরিচয় জানতে চাইলাম। ওরা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়লো। একান্ত আত্মীয়ের মতো আমাদের কাছে এলো। অল্প সময়ের মধ্যে ওদের সঙ্গে আমাদের অনেক কথার আদান প্রদান হলো। খাণিকক্ষণ পরেই ওদের কাছ থেকে আমাদেরকে বিদায় নিতে হলো। কেন জানিনা, বিদায়ের মুহূর্তে এক বিচিত্র মমত্ববোধে মনটা একটু মুচড়ে উঠলো। ওদেরকেও দেখলাম নির্বাক হয়ে আমাদের বাসের গমনের দিকে তাকিয়ে আছে। মনে পড়ে গেল,’আরো কিছুক্ষণ না হয় রহিতে কাছে।’
লাহোরের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শন শেষে আমরা হোটেলে ফিরে এলাম। পরের দিন যেতে হবে রাওয়াল পিন্ডি। সকালে ট্রেন যাত্রা। আবহাওয়া তেমন ভাল নেই। গুমরো মুখো দিন। আমরা তিনজন, আয়েশা আক্তার, নুরুন্ননাহার আর আমি। আজগর স্যার আর ওনার স্ত্রী। মোট পাঁচজন। অন্য ছাত্ররা অন্য কম্পার্টমেন্টে ঢুকে গেল। ঝিকঝিক শব্দে ট্রেন চলছে। ব্রডগেজের রেল লাইন। বিরাট বগি। আমরা তিন মেয়ে একটি বেঞ্চে উল্টাপাল্টা হয়ে একট কম্বলের নীচে শুয়েছি। স্যার আর ম্যাডাম দুই বেঞ্চে শয্যা গ্রহন করেছেন। বাইরে ঝিরঝির বৃষ্টি। নিঝুম কালো অন্ধকারে আবৃত চরাচর। রেলগাড়ী এসে থামলো এক স্টেশনে। বাইরে থেকে কামরার দরজা ধাক্কা দিচ্ছে কারা যেন। স্যার উঠলেন। প্রচন্ড ঠান্ডা। দরজার কাছে গিয়ে বললেন, ইয়ে কামরা রিজারাভ্ড্ হ্যায়। কিছুতেই তারা কথা শুনছে না। বলছে, খোলো, খোলো জলদি খোলো। স্যার বললেন, আরে ভাই, এ রিজারাভ্ড্ (Reserved) হ্যায়।
তারা আরো জোরে ধাক্কা দিচ্ছে। ভাগ্যিস বৃটিশ আমলের গাড়ি। নতুবা হয়তোবা ভেঙ্গে খুলে ফেলতো। আমরা ভয়ে কাঁপতে লাগলাম। ভাবলাম পৈত্রিক প্রাণ নিয়ে আর দেশে ফেরা হবে না। বাইরে দস্যুরা বলছে, প্রচন্ড ক্রুদ্ধস্বরে –খোলো। ইয়া তো, আন্দার আনেছে দেখায়ে দেঙ্গে ক্যায়সা রিজারাভ্ড্ হ্যায়। আমরা তিনজন বললাম, মরতে হলে এখানেই মরবো। তবুও এত ঠান্ডায় কিছুতেই উঠবো না। এইসময়ে ট্রেন চলতে শুরু করলো। এযাত্রা আমরা বেঁচে গেলাম। এখানে একটু বলে রাখি, আমাদের স্যার যেমন উচ্চতায় লম্বা, চওড়া, গৌরবর্ণের এক বিশালদেহী পুরুষ। যদিও ডাকাতরা তাকে দেখতে পায় নি।
পরদিন সকালে রাওয়ালপিন্ডি রেল স্টেশনে পৌঁছালাম। পিন্ডিতে আমার ভাই লে.কর্নেল. নাজির আহমেদ থাকেন। সেখানে মিলিটারি হাসপাতালে তার পোস্টিং। আমার আরেক ভাই লে.কর্নেল. হাফিজ আহমেদ এসেছেন তার বাসায়। তিনি আজাদ কাশ্মীর মেডিকেল কোরের অফিসার। তিনি এসেছেন আমার খোঁজে। কিন্তু সব কিছু এলোমেলো হয়ে যাওয়াতে তিনি আমাদেরকে খুঁজে পাচ্ছেন না।
কণা কণা বৃষ্টি, কনকনে বাতাস। এমন সময়ে তিনি দেখতে পেলেন ট্রেনের কামরায় একদল বাঙ্গালী ছেলে হৈচৈ করছে। তিনি ছুটে এলেন তাদের কাছে। পেয়ে গেলেন আমাদের সন্ধান। কয়েক রেললাইন ডিঙ্গিয়ে আমাদের কম্পার্টমেন্টে পৌঁছে গেলেন। আমার আনন্দ দেখে কে। আসলে হোটেল রিজার্ভ করবার জন্য আমাদের স্যার আর কয়েকজন ছাত্র শহরে গিয়েছিলেন। পরে আমরা আমার ভাই সহ হোটেলে গিয়ে উঠলাম। আমি আমার বড় ভাই নাজির আহমেদের বাসায় চলে এলাম। আয়েশা আর নাহার স্যারের স্ত্রীর সঙ্গে ‘খিয়াবান’ হোটেলে থাকলেন। পরের দিন শুরু হলো রাওয়াল পিন্ডি সফর। প্রতিদিন আমার ভাই কর্নেল হাফিজ আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতেন এবং সারাদিন আমাদের সঙ্গে থাকতেন। সব দর্শনীয় স্থান আমরা মনোযোগ দিয়ে আনন্দের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করেছি। আমার ভাইও ইতিহাস ভালবাসেন। তিনিও আনন্দ পেয়েছেন প্রচুর।
পিন্ডিতে একটি পানি – বিদ্যুৎ পরিকল্পনার জন্য বাঁধ বসানো হয়েছে। এটি রাওয়াল ড্যাম। উঁচু নীচু এবড়ো থেবড়ো পথ ধরে বাঁধের উপরে উঠে গেলাম। ঘুরে ফিরে তাদের নানারকম কলকব্জা দর্শন করলাম। এরপাশের পাহাড়ের উপরে সুন্দর বাগান রয়েছে। আমরা শ্রান্ত হয়ে পড়েছিলাম। পাথরের চূড়ায় বসে কিছু চিলকোজা (বাদামের মতো শুকনো ফল) খেয়ে নিলাম।

পিন্ডির সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান হলো তক্ষশীলার (Taxila)যাদুঘর আর বুদ্ধদেবের বিশ্বিদ্যালয়। তক্ষশীলায় পৌঁছে মনে পড়লো রাজা পুরু আর মহাবীর আলেকজান্ডারের কথা। পরাজিত রাজা পুরুকে বিজয়ী আলেকজান্ডার প্রশ্ন করেছিলেন, তিনি এখন কিরূপ ব্যবহার আশা করেন? পুরুর নির্ভীক ও বিরোচিত জবাব ছিল, একজন রাজার নিকট আরেকজন রাজা যেরকম ব্যবহার পায়। আজ তারা কেউ নেই। তবে তাদের বীরত্বের গল্প তক্ষশীলাকে জড়িয়ে ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। তক্ষশীলার যাদুঘরে বুদ্ধের মূর্তি দেখলাম। পাথরে খোদাই করা। ধ্যানী, মৌন ঋষি। শত শত বর্ষ পূর্বে যিনি মানুষকে অহিংসার বাণী শুনিয়েছিলেন। কোথাও তিনি ভিক্ষা দিচ্ছেন, কোথাও দিচ্ছেন দীক্ষা। তার জন্মোৎসবে নৃত্যরতা নর নারীর মূর্তিও উন্নততর ভাস্কর্য শিল্পের পরিচয় বহন করছে। ইতিহাসে পড়েছিলাম যে বৌদ্ধগণ গৌতম বুদ্ধের পদচিহ্নের পুজা করতেন। দেখলাম এক বিরাটাকায় পদচিহ্ন পাথরের বুকে স্পষ্ট হয়ে রয়েছে। এই যাদুঘরে রক্ষিত আছে মহেঞ্জদারো সভ্যতার নিদর্শন। তাদের ব্যবহৃত মাটির পাত্র বিশেষ উন্নত মানের। মেয়েদের ব্যবহৃত বহু গহনা দেখলাম। নারী অংগের খুব কম অংশই গহনা থেকে বঞ্চিত থাকতো। গয়নাগুলো খুব উৎকৃষ্ট শ্রেণীর – আধুনিক রুচি সম্মত। তারা টয়লেট ট্রে-র ব্যবহার জানতেন।
বিভিন্ন দেবতার মূর্তি রয়েছে সেখানে। নৃত্যরতা নটিনীর পাথরের মূর্তিও তাদের কৃষ্টির আর চারুশিল্পের সাক্ষ্য দিচ্ছে। সেখান থেকে গেলাম বুদ্ধের ‘জুলিয়ানী ইউনিভার্সিটি’ –র ধ্বংসাবশেষ দেখতে। পাহারের চূড়ায় অবস্থিত। অনেক ছোট ছোট কামরা। এসব রুমে নাকি বুদ্ধদেব তাঁর শিষ্যদের শিক্ষা দিতেন। বহু স্তুপ রয়েছে এখানে। অনেক রুমেই বুদ্ধের প্রতিকৃতি খোদাই করা পাথরের গায়ে অমর হয়ে রয়েছে। স্টুয়ার্ট অধ্যক্ষ যেখানে বসতেন সেগুলো আজও বিদ্যমান। সেখান থেকে গেলাম সিরকাপে। সেখানেও পাহাড়ের কোলে আবিষ্কৃত হয়েছে এক বিরাট নগর। উন্নত ধরণের দালান কোঠা, কূয়া ইত্যাদির চিহ্ন জ্বলন্ত হয়ে আছে আজও। একদিন এখানকার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জনাব এটিএম মুস্তফা এলেন আমাদের সাথে দেখা করতে। তাঁর ব্যবহারে আমরা মুগ্ধ হলাম।
এক সন্ধ্যায় আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছেলেমেয়েরা, স্যার ও ম্যাডাম তাঁর বাড়িতে ইফিতার পার্টিতে আমন্ত্রণ পেলাম। বহু প্রকার উৎকৃষ্ট ফল,মূল, দাড়িম্বের দানা দিয়ে তৈরি পাকোড়া ইত্যাদি দিয়ে আপ্যায়ন করলেন।
পরের দিন চলে গেলাম মতি মসজিদ দর্শনে। মসজিদটি সাদাসিদা – বিশেষ জাঁকজমক নেই। রাস্তার ওপারেই বিখ্যাত বাদশাহী মসজিদ। ডানপাশে রানা রনজিৎ সিংহের সমাধি । বাঁ দিকে পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা কবি ইকবালের সমাধি গৃহ। কবরের এক গুচ্ছ তাজা ফুল। কে যেন ভালবেসে প্রাণের অর্ঘ্য দিয়ে গেছে। ঢুকে পড়লাম শাহী মস্কের ভেতর। চারদিকেই মসজিদ। ভিতরে সামনেই তিন গম্বুজ বিশিষ্ট বিশেষ মসজিদ – ইমাম সাহেব এবং বিশিষ্ট আলেমগণের জন্য নির্ধারিত। ভেতরে বিশাল পাকা মাঠ। তাতে জায়নামাজের মত করে দাগ কাটা। প্রায় লক্ষ লোক এখানে জামায়াতে সামিল হতে পারেন। মাঠের মাঝখানে রয়েছে একটি স্বচ্ছ সলিলা হ্রদ। এর সবকিছু বৈজ্ঞানিক উপায়ে তৈরী। মসজিদের ভেতরে এরকম নয়নাভিরাম জলাধার চিত্তকে আলোকিত করে। অবাক লাগলো এই ভেবে যে শত শত বৎসর পূর্বেও মানুষ বৈজ্ঞানিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ ছিল। মসজিদটির পশ্চিমে দুই দিকে দুটি গগণ চুম্বী গম্বুজ। চুড়ায় উঠতে ২৪ টি সিড়ি অতিক্রম করতে হয়। সেখান থেকে সারা লাহোর নগরী অবলোকন করা যায়।
এরপর গেলাম সম্রাট জাহাংগীরের সমাধিতে। অনেক জায়গা দখল করে আছে। অনেক সুন্দর চলার পথ, ফুলের বাগান, হ্রদ পেরিয়ে এগিয়ে গেলাম। সামনেই বিরাট সুদীর্ঘ মস্ক। তার মাঝখানে অনেকগুলো সিঁড়ি পেরিয়ে মসজিদে প্রবেশ করলাম। এরই অভ্যন্তরে এক কক্ষে সম্রাটের কবর। মখমলের সামিয়ানার নীচে, পাথরে বাঁধানো। এর অনেক নীচে মাটিতে রয়েছে আসল সমাধি। আমরা এক মিনিট তাঁর আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা করি পরম করুণাময়ের দরবারে।
এসমাধি ভবনের কারুকার্য দেখার মত। এর ইটের গাঁথুনী মোগল যুগের স্থাপত্য শিল্পের বৈশিষ্ট্য বহন করে চলছে। এই লাহোর নগরীতে আছে সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের কবর। যত্ন করে রাখা যদিও –অতি অনাদৃতা সবুজ ঘাসে ঢাকা। অভিমান করে যেন সব বিলাসিতা বর্জন করেছেন। তাঁর কবরে নিজের রচনা কেবল লেখা আছে, ‘গরীব গোরে দীপ জ্বেলো না, ফুল দিও না কেউ ভুলে / শামা পোকার না পোড়ে পাখ, দাগা না পায় বুলবুলে।’ কবিতাটি ফার্সিতে লেখা, অনুবাদ করেছেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত।
আয়ূব ন্যাশনাল পার্ক বিশেষ দর্শণীয় স্থান। ছোট ছোট বনের ভেতর দিয়ে বয়ে চলছে ছোট্ট নদী। সৌখিন দর্শকদের কেলী করার জন্য রয়েছে ছোট ছোট ডিঙি নৌকা। মাঝে মাঝে সুন্দর সুন্দর বাগান, ঝর্ণা, দোলনা, একুরিয়াম । পাকিস্তান কোয়ার্টারস , আর্মি মিউজিয়াম, ওয়াহ, আয়ূব হল, স্যাটেলাইট টাউন ঘুরে সেদিনকার মত ক্ষান্ত হলাম। পরদিন চললাম মারিতে, প্রেসিডেন্টের গ্রীষ্মাবাস যেখানে এতদিনের দূরে দেখা বরফ এবার হাতের কাছে পেলাম। চারিদিকে সাদা বরফ পড়ে আছে। উঁচু নীচু পাহাড়ি পথ বেয়ে আমাদের বাস এগিয়ে চললো। ওপাশে পাহাড়ি বন। যত উপরে উঠলাম, ততই বরফের আধিক্য বাড়তে লাগলো। পথের দু’পাশে বরফের স্তুপ জমা হয়ে আছে। প্রতিরাতে ওসব পথ বরিফে ঢেকে যায়। সকালে রাস্তায় চলাচলের সুবিধার জন্য বরফ সরিয়ে দুপাশে রাখা হয়। বরফগলা জল জমে গিয়ে রাস্তা বড় পিচ্ছিল আর বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।সন্তর্পণে বাস এগিয়ে চললো। গাছের শাখায় পত্র পল্লবে বরফ পড়ে আছে।
আরও সামনে ঘোড়াগলি নামক স্থানে পৌঁছে আমরা আর পথ খুঁজে পেলাম না। পেছনে ফেলে আসা সরু রাস্তাটি বাদে সর্বত্র যতদূর দৃষ্টি যায়, কেবল বরফ আর বরফ। রৌদ্র ঝলমল উজ্জ্বল নীল আকাশের নীচে শুভ্র বসনা পৃথিবী অত্যন্ত সুন্দর মনে হলো। পাহাড়গুলো যেন বরফের মুকুট পরে ধ্যানে মগ্ন। বরফ হাতে তুলে নিলাম। ঝরঝরে শক্ত লবণের মত। কিন্তু একটু ঠেসে ধরলে শক্ত হয়ে যায়। বরফ ঠেসে আমরা এবং আমাদের ক্লাসের ছেলেরা মানুষের মূর্তি তৈরী করলাম। বরফের উপর যথেষ্ট ছোটাছুটি ও করলাম। বেশী সাহস হলো না বলে আরোও সামনে গেলাম না। কারণ অনেক স্থানে গভীরতা এত বেশী যে হয়তবা চোরাবালির ন্যায় অনেক নীচে চলে যাব। মারী আর যাওয়া হলো না। ঘোড়াগলি থেকে ফিরেই পেশওয়ার যাত্রা করলাম। পথের দুধারে ক্ষুদ্র বৃহৎ অসংখ্য পাহাড় রেখে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে পেশওয়ার পৌঁছে গেলাম। পেশওয়ার তিনটি শহরের সমষ্টি। ক্যান্টনমেন্ট টাউন, পেশওয়ার সিটি আর ইউনিভার্সিটি টাউন। ইউনিভার্সিটি টাউনটি সম্পূর্ণ আলাদা। বিশ্ববিদ্যালয় তার সমগ্র বিভাগ সহ, মেডিকেল কলেজ, হোম ইকোনমিক্স কলেজ, টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, আরোও অন্যান্য কলেজ এ অঞ্চলে অবস্থিত। এদের প্রত্যকটি আবাসিক। উর্দ্ধতন থেকে অধঃস্তন – সকল শ্রেণীর কর্মচারী – যারা এখানকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাজে নিয়োজিত তাদের প্রত্যেকের কোয়ার্টারস নিয়েই এ শহর নির্মিত। এখানে সাধারণ লোকের চলাচল নেই। সাধারণ জীবন যাত্রা থেকে বিচ্ছিন্ন এ অঞ্চল লেখাপড়ার জন্য সুন্দর ও সুস্থ আর উপযুক্ত পরিবেশ বটে। আমরা সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের হস্টেলে আতিথ্য গ্রহন করলাম। এখানকার বাঙ্গালী ছেলেরা এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাদের যথেষ্ট আপ্যায়ন করলেন। খুব ভাল লাগল এদের সবাইকে। মনে হলো যেখানেই বসবাস করুক না কেন মানুষেরা মানুষের আপনজন।

একদিন যেতে হলো খাইবার গিরিদ্বারে। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে মানুষের আবির্ভাব ঘটেছিল পাক ভারতের এই গিরি পথ ধরে। অর্থাৎ মুসলিম, পাঠান, মুগল সবাই এই খাইবার পাস (খাইবার গিরিপথ) দিয়েই এই অঞ্চলে প্রবেশ করেছিল। এখানে উল্লেখযোগ্য যে এই পেশোয়ারই ছিল রাজা কনিষ্কের রাজধানী, পুরুষপুর।পেশোয়ার থেকে লান্ডিকোটাল যাওয়ার দুটি রাস্তা। একটি বাস পথ, আরেকটি কাফেলার পথ – কাঁকড় ছড়ানো। লান্ডিকোটাল, সীমান্তের একটি উপজাতীয় এলাকা। এখানে একটি বড় মার্কেট আছে। নিউ মার্কেটের মতই। রাস্তার পাশেই অপেক্ষাকৃত ঢালু জায়গায় এ বাজারটি অবস্থিত। বাস থেকে এর স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারিনি। এখানে অনেক জিনিস –পত্র বিশেষ করে মেয়েদের সাজগোজের অনেক কিছুই পাওয়া যায়। দামও অপেক্ষাকৃত কম। রেডিও, বন্দুক – অন্যান্য পণ্যের মত বিনা লাইসেন্সে সস্তায় বিক্রি হয়। ঘড়ি অল্প পয়সায় পাওয়া যায়, যদিও এদের কোন গ্যারান্টি নাই। কিন্তু আসল কথা হলো এখানে অবাধে জিনিসপত্র ক্রয় করবার অধিকার পাকিস্তানীদের নেই। কারণ পাকিস্তান সরকার এদের কাছ থেকে কোন প্রকার কর গ্রহন করে না। এ অঞ্চলের উপর পাকিস্তানের সার্বভৌম ক্ষমতা নেই। কিন্তু দেশ রক্ষা ও যোগাযোগের ব্যাপারে এরা পাকিস্তানের অধীন।
তারপর আরও সামনে অগ্রসর হয়ে চলে গেলাম পাক আফগান সীমান্তে। দুই পর্বতের মধ্যবর্তী পিচঢালা কালো পথ সোজা পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তানে চলে গেছে। মাঝখানে কেবল সীমানা নির্দেশক মোটা লোহার শিকল পড়ে আছে। এ জায়গাটির নাম তুরখাম। এপাশে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকার নীচে সীমান্ত রক্ষীদের ঘাটি। ওরা আছে বেশ। কোন বিবাদ নেই। দু’পাশে দন্ডায়ান দু’টি বাস দেখলাম। পণ্য বিনিময় করছে। পাহাড়ের উপরে দেখলাম সাদা ‘ডুরান্ড লাইন’ সীমানা নির্দেশ করছে। সেদিনকার মত সেখান থেকে বিদায় নিয়ে পেশাওয়ার ফিরে এলাম। পরদিন গেলাম ওয়ারসাক পানি বিদ্যুৎ পরিকল্পনা দেখতে। কাবুল নদীর উপরে পাথুরে পাহাড়ের গা কেটে এ পরিকল্পনা প্রজেক্ট তৈরী করা হয়েছে। এখানে ৮০ হাজার কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। ৬৫ হাজার একর জমিতে জল সেচনের জন্য এই পরিকল্পনা রচিত হয়েছে। রাস্তা গিয়ে মিশেছে পরিকল্পনা কেন্দ্রে। তার একপাশে খরস্রোতা কাবুল নদী। কল কারখানার চাপের যন্ত্রণায় কাতর হয়ে যেন বারবার পাক খেয়ে ছোট্ট তটিনী প্রচন্ড তান্ডবে ছুটে চলছে সমুখপানে। ক্ষুদ্র বৃহৎ অনেক পাথর তার গতিপথের অন্তরায় হতে চায়। কিন্তু ক্ষিপ্ত স্রোতস্বিণীর যেন সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। নদীতটে উঁচু লোহার রেলিং। চেয়ে চেয়ে দেখলাম চঞ্চলা নটিনীর ছন্দায়িত কলোচ্ছ্বাস।
বাঁ পাশে বাঁধ বসানো হয়েছে, নিরেট পাথরের পাহাড়ের গা কেটে। শুধু এই নয়। পাথের কেটে আরোও নীচে এক তলা বিল্ডিং নির্মাণ করা হয়েছে। সবুজ রঙের দেয়াল অপূর্ব শোভা বর্ধন করেছে। বিল্ডিং এর মাথার উপর এখনও পাহাড় বিদ্যমান। নীচে পাশে সর্বত্রই পাহাড়। এর অভ্যন্তরে যে সমস্ত কল কারখানা দেখলাম, তাতে বিস্ময়ে হতবাক না হয়ে পারলাম না। এসবই মানুষের কীর্তি! সৃষ্টিকর্তা মানুষকে এত শক্তি দিয়েছেন, ভাবলে অভিভূত হতে হয়। সিটি টাউন (city town) ঘুরে দেখলাম।
ফলের রাজ্য পশ্চিম পাকিস্তান। অসংখ্য ফল পাওয়া যায়। রাস্তায় দেখলাম উট আর গাধাই বেশী। এ অঞ্চলে পাঠানের বাস। দীর্ঘকায়া, গৌরবর্ণ, বিরাট দেহী পাঠান। সালোয়ার, সার্ট আর পাগড়ী এদের পোশাক। পেশওয়ারে শেষ দর্শণীয় স্থান ছিল সোয়াত। সকালে রওনা হলাম সোয়াতের পথে। এখানে বলে রাখা ভাল যে ড. দানী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন দীর্ঘদিন। তিনি প্রত্নতত্ত্ব বিশেষ পন্ডিত। তিনি এখন পেশওয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে আছেন। তাঁর সংগে দেখা করতে গেলাম। তিনি ও তাঁর স্ত্রী বিশেষ প্রীত হলেন আমাদেরকে দেখে। বাংলা শিখেছিলেন ঢাকায়। আপ্যায়ন করলেন বাংলাতেই। তারাও খুশী হলেন, আমরাও খুশী মনে বিদায় নিলাম সোয়াতের পথে। যেতে যেতে পৌঁছে গেলাম এক স্থানে – নাম তার ‘শায়াখান্দ ঢেরী।’ ছোট্ট একটি নদী পেরিয়ে গেলাম সেখানে। এটা দানীর ভূগর্ভ খননের (excavation) জায়গা। তিনি এখান থেকে মাটি খুঁড়ে একটি প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেছেন। প্রায় দুই একর জায়গায় খননকার্য শেষ হয়েছে। তাতে ইটের বাড়িঘর, ছোট ছোট কামরা, কূয়া, গরুর ঘাস খাওয়ার চারি দেখতে পেলাম। মনে হয় বহু শতাব্দী পূর্বে এক সভ্য জাতি এখানে বসবাস করতেন। ড. দানী এ লুপ্ত সভ্যতা নিয়ে এখনও গবেষণা করছেন।
পথ চলতে চলতে আরও দেখলাম অসংখ্য আঁখ ক্ষেত। আর ট্রাক বোঝাই হয়ে সেগুলো ছুটে চলছে চরসদ্দা চিনিকলের কারখানায়। আরও এগুতে লাগলাম। দেখলাম রাস্তার দু’ধারে যতদূর চক্ষু যায় – দিগন্ত পর্যন্ত – কেবল কবর আর কবর। এটাই নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কবরস্থান। কবরগুলো আমাদের দেশের মতো কিছুদিন পর মাটিতে মিশে যায় না। এগুলো পাথরের ছোট ছোট টুকরা দিয়ে তৈরী। শিয়রের কাছে কেবল একটি করে লম্বা পাথরের ফলক দাঁড়িয়ে আছে। অনেক কবর সাদা কালো পাথর দিয়ে নানারকম নক্সা করাও দেখা যায়। অনেক কবর ভেঙ্গে চুড়ে সমান হয়ে গিয়েছে। সেখানে মানুষ তাদের বাসস্থান তৈরী করেছে। সেখানে ছোট খাটো হাটও গড়ে উঠেছে। মানুষের ঘরের সামনের উঠানে, ঘরের পাশে ভাঙা কবরের চিহ্ন এখনও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কবরের উপর বসে লোকেরা মাল্টা, আপেল ইত্যাদি বিক্রি করছে। পথের দু’পাশে লক্ষ লক্ষ কবর অনেকদূরে কুয়াশায় মিশে গেছে। মনে হলো, জীবিতের চাইতে মৃতেরাই সংখ্যায় গরিষ্ঠ। এছাড়া, পাকিস্তানের পাহাড়ের গায়ে সমভূমিতে, বনে জঙ্গলে যত্র তত্র বহুপাথরের গোরস্থান দেখেছি।

এরপর শুরু হলো আমাদের পাহাড়ি পথে বন্ধুর ও বিপজ্জনক যাত্রা। যাচ্ছি সোয়াত। এটি একটি উপত্যকা। অর্থাৎ পাহাড় পর্বতে ঘেরা একটি দেশীয় রাজ্য। সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি এই সোয়াত। ক্রমেই উপরে উঠতে লাগলাম। পাহাড়ের গা কেটে রাস্তা বসানো হয়েছে। দুটি বাস যাওয়া আসার মতো চওড়া রাস্তা। একপাশে নিরেট পাহাড়, অপর পাশে সুগভীর খাত। ভয়ংকর। বড় বড় পাথরের খন্ড দিয়ে রেলিং এর মতো করে বিপদের সীমানা নির্দেশ করা আছে। পথ খুবই আঁকা বাঁকা। প্রত্যেক মোড়ে লেখা আছে Danger, Dead Slow, Blind Corner, Blow Horn ইত্যাদি সংকেত। গাড়ির চালককে খুব সতর্ক থাকতে হয়। কখনো গতি বাড়িয়ে আবার গতি কমিয়ে দিতে হয়। গাড়ির ভেতরে আমরা যারা ছিলাম, তাদের দফা রফা। নিশ্চিন্তে বসে থাকার উপায় নেই। সামনের সিটে দু’হাত ধরে রেখেও সমতা রক্ষা করা যায় না। কোন কোন স্থানে দেখেছি পাহাড়ের ভেতর দিয়ে পথ চলে গেছে। জানিনে এসব পথ তৈরি করতে কত মানুষের কত শ্রম, কত সময় খরচ হয়েছে। একসময়ে বাসের জানালা দিয়ে নীচের দিকে তাকালাম। দেখলাম নীচের সবুজ পাহাড়গুলো কেমন ঘুমন্ত শান্ত ছেলের মতো চুপটি করে আছে। আমাদের ফেলে আসা পথগুলো দেখাই যাচ্ছে না। কেবল বাসগুলো ছোট ছোট বাক্সের মতো ছুটে আসছে। নীচের সমতলের দিকে দৃষ্টি পড়তেই ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। এত উঁচুতে উঠে পড়েছি। অজ্ঞাতেই সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করলাম।
আমাদের সাথে পেশোওয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র পথ প্রদর্শক হিসাবে। তিনি মাঝে মাঝে গাড়ি থামিয়ে অনেক কিছু দেখালেন। বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন রাজাদের বিজয় চিহ্ন পর্বত্র গাত্রে উতকীর্ণ করা আছে। চলতে চলতে আমাদের গাড়িটা একটি ঝাঁকুনি খেল। মোড় ঘুরতে গিয়ে গাড়ির পেছেনের চাকার ধাক্কা লেগে একটি বিরাট পাথর খন্ড শতমাইল নীচে গড়িয়ে গেছে। পাথরের গন্তব্য স্থল দেখে আতংকে চোখ বুঁজে রইলাম। তারপর শেষ হলো আমাদের উপরে উঠার পালা। পাহাড়ের চারপাশ ঘিরে গোলাকার হয়ে রাস্তা উপরে উঠে এসেছে। উপর থেকে নীচের পৃথিবীকে অবলকোন করলাম। বিস্তীর্ণ পাহাড়ি অঞ্চল। এত উঁচু থেকে বড়ই ক্ষুদ্র মনে হলো। মনে হলো উপরে উঠা বা থাকা মানুষের ভিতরে অহংকারের অনুভূতির জন্ম দেয়। যতদূর দৃষ্টি যায় অবারিত পাহাড়ি অঞ্চল বৃক্ষ, লতা–গুল্মে আবৃত। দিগন্ত জুড়ে কেবল পাহাড় আর পাহাড়। এক বিরাট শিল্পীর কর্মকান্ড।
এবার আমাদের ফিরে আসার পালা। গতি নিম্নমুখী। এবার আরোও বিপদ। গতি কম রেখে অতি সন্তর্পণে গাড়ী এগিয়ে চললো। মাঝপথে একবার থামতে হলো। কারণ পর্বতগুহায় বুদ্ধদেবের এক বিরাট ধ্যানস্থ মূর্তি খোদাই করা আছে। ভাস্কর্য শিল্পের নৈপুণ্যে মুগ্ধ হলাম। মনে হলো যেন ভূগোলের উপর দিয়ে ইতিহাসের হাত ধরে চলেছি। এই দুয়ের মিলনেই যেন এ সৌন্দর্য্য মাধুর্য্য ও পূর্ণতা লাভ করেছে। সব সংকট কাটিয়ে এবার পৌঁছে গেলাম সোয়াতে। বরফে ঢাকা সোয়াত নগরী। ‘রাতের রজনীগন্ধা, বনের বিধবা মেয়ে’ নাকি ‘মানিনী ঝেঁপেছে মুখ সাদা ওড়নায়।’ কি বলবো কিছুই খুঁজে পেলাম না। কেবল মনে হলো সুন্দর সুন্দর অপূর্ব অনির্বচনীয় সুন্দর।
এই উপত্যকায় তিন লক্ষাধিক লোকের বাস। অধিপতির উপাধি ওয়ালি। কৃষিকাজ ও পশুপালন এদের উপজীবিকা। পর্বতের উপত্যকায় ধান, ভুট্টা ও নানাবিধ ফল জন্মে। পাহাড়ের গায়ে খড়ের গাদা চোখে পড়লো। উৎকৃষ্ট কম্বল এখাওনকার বিশেষত্ব। মধুও বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে। সাইদু শরীফ শীতকালিন রাজধানী। আমরা সাইদু শরীফেই গেলাম। এখানে একটি আবাসিক কলেজ আছে। প্রচন্ড শীতের জন্য এখনকার ছাত্ররা দীর্ঘ শীতকালিন ছুটি উপভোগ করে থাকে। সেই সুযোগে ওদের পরিত্যাক্ত হস্টেলে আমরা আশ্রয় নিলাম। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আমাদের জন্য লাইট, খাবার পানি আর আগুন সহ জ্বালানী এলো।
হস্টেলের অবস্থানটা একটু উল্লেখযোগ্য। ভেতরে বাইরের মাঠ দেড় ফুট পুরু ধবধবে সাদা বরফে ঢাকা। বরফের উপর দিয়ে হস্টেলে ঢুকলাম। বাড়িটি দ্বিতল। ছাদের উপরে গেলাম। নীচের মত এখানেও বরফ পুরু হয়ে পড়ে আছে। সে রাত ছিল পূর্ণিমার রাত।আকাশ অত্যন্ত পরিষ্কার। কোথাও কুয়াশা ছিল না। চারিদিক চেয়ে চেয়ে দেখলাম। সাদা আর সাদা চরাচর। আগেই বলেছি এটি সোয়াত উপত্যকা। চারপাশ পাহাড় পর্বতে ঘেয়া। সবগুলো পর্বত বরফের নীচে আত্মগোপন করে আছে। অতিশয় উজ্জ্বল চাদনী ঝলমল রাতে শুভ্র বসনা মৌনা ধ্যানস্থা সোয়াতকে এক তাপসী রমণীর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সাদা বরফ যে এত সৌন্দর্য্য সৃষ্টি করতে পারে , তা না দেখলে উপলব্ধি করা যায় না। কেবল মনে হতে লাগলো, ‘বিশ্বরূপের খেলাঘরে কতই গেলাম খেলে/ অপরূপকে দেখে গেলাম দু’টি নয়ন মেলে।’
ঠান্ডার জন্য বাহিরে তিষ্ঠানো দায়। অনুভূতি যেন লোপ পেতে থাকলো। আগুনের কাছে চলে এলাম। অতিরিক্ত ঠান্ডায় হিমাংকের নীচে তাপমাত্রা, কলের পানিও জমে গিয়েছে। পরদিন ভোরে সেখানকার অঞ্চল ঘুরে ঘুরে দেখলাম। বাদশাহ ঔরোংজেবের বাড়িও দেখলাম। পরে গেলাম ওখানকার যাদুঘরে। প্রাচীন সভ্যতার অনেক নিদর্শন রয়েছে তাতে। এই যাদুঘরের প্রতি মানুষেরা ঋণী। কারণ এতসব অতীতের নিদর্শন সংরক্ষিত না থাকলে মানুষেরা প্রাচীন কালের সভ্যতার কিছুই জানতে পারতো না। কোথায় ছিলাম, কোথায় এলাম, কিভাবে এলাম, এসব কিছুই জানার উপায় ছিল না।
সোয়াতের রাস্তাঘাট তখন বরফগলা জলে বড্ড পিচ্ছিল। সেদিনই ওখান থেকে ফেরার পথ ধরলাম। আবার সেই উঁচুনীচু পথ। এক বিপজ্জনক মোড়ে এসে গতকাল এক দুর্ঘটনায় একটি বাস চুরমার হয়ে নীচে পড়ে আছে। জনমানবহীন এই দুর্গম পথে এতবড় দুর্ঘটনার কোন তথ্যই সংগ্রহ করতে পারলাম না। সন্ধ্যা নাগাদ আমরা পৌঁছে গেলাম পেশোওয়ারে ।
পরদিন যেতে হলো এক অত্যাধুনিক গ্রাম দেখতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল সাথে। পূর্ব বাংলার মত এত ঘন বসতি অঞ্চল নেই এখানে। অনেক দূরে দূরে লোকালয়। কয়েকটি বাড়ি নিয়ে একটি গ্রাম। মাটির প্রাচীরে ঘেরা মাটির ঘর। বরফগলা জলে পিচ্ছিল কর্দমাক্ত বাড়িঘর। বাড়ির পাশে পাশে বরফগলা জলে বরফের নালা। জীবন যাত্রা বড় দুরূহ মনে হলো। মানুষ এখানে কিভাবে বেঁচে আছে, ভাবতেও অবাক লাগে। মনে মনে ভাবলাম এই যদি আধুনিক গ্রামের শ্রী হয়, তবে বে –আধুনিক গ্রামের অবস্থা কিরকম হবে? নিজের দেশের কথা মনে পড়লো। তুলনামূলক ভাবে আমাদের ছায়া ঘেরা শস্য শ্যামলা গ্রাম ও গ্রামের মানুষ অনেক ভাল আছে। এখানে মানুষগুলো বড়ই কঠিন জীবন যাপন করছে। তবুও এটাই তাদের প্রিয় জন্মস্থান মাতৃভূমি। এবারকার মতো পেশাওয়ার সফর শেষ হলো।
বিকেলে রওনা হলাম করাচীর উদ্দেশ্যে। পেশাওয়ার রেল স্টেশন বিরাট বড়। রেলপথ ব্রড গেজ। রেল স্টেশন বিরাট বড়। কম্পার্টমেন্টে অনেক জায়গা। সব কয়লা চালিত ইঞ্জিন। আমাদের পূর্ব পাকিস্তানের মত ডিজেল চালিত নয়। ‘তেজগাম’ মেইলে রওনা হলাম করাচী। লান্ডিকোটালের প্রান্তিক স্টেশন। আরেক প্রান্তে করাচী –আরব সাগরের তীরে। পর্বতের কোল ঘেঁষে, কখনো বা পর্বতের সুড়ংগের ভিতর দিয়ে, কখনো বা সমভূমি, কখনো বা মরুভূমি পেরিয়ে এ পথ করাচীতে এসে থেমেছে। চল্লিশ ঘন্টা একটানা রেল ভ্রমন। দীর্ঘ একটানা ট্রেন যাত্রা যে এত ভাল লাগতে পারে তা আগে কোনদিন ভাবতে পারিনি। কেবলই মনে পড়ছিল সেই ভুলে যাওয়া গানের প্রথম কলি, ‘এ পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হতো তুমি বলতো।’
রেলপথের দু’ধারে জনমানবহীন বিস্তীর্ণ অঞ্চল। বেশির ভাগই বৃক্ষ লতাহীণ প্রান্তর দিগন্ত জোড়া, আবার কখনো ছোট ছোট গ্রাম, কিছু গমের ক্ষেত, মানুষের সংখ্য নগন্য। শ্যামল বাংলার সঙ্গে কোন তুলনা চলে না। তবুও ক্লান্তিহীন চোখে এই গৈরিক বসনা সৌন্দর্য্য দেখে দীর্ঘ চল্লিশটি ঘন্টা পার করে দিলাম। এক সোনালী ঊষায় করাচী এসে পৌঁছালাম। সেন্ট্রাল হোটেলে করাচীর ডি.সি.–র আতিথ্য গ্রহণ করলাম। করাচী কসমোপোলিটান সিটি। পৃথিবীর সব জাতের মানুষের দেখা মেলে এখানে। অতি প্রাচীন আর অত্যাধুনিক সভ্যতা এখানে পাশাপাশি চলছে। রাস্তায় ভীষণ ভিড়। বিচিত্র নরনারী বিভিন্ন পোশাকে এখানে চলছে। কোথাও রিকশা নেই। তবে আছে অটো রিকশা। রাস্তায় ট্রাম চলে। স্টেট বাস চলে অগণিত। ৮৮A পর্যন্ত বাসের নাম্বার দেখেছি। ভাড়ায় চলে ট্যাক্সি অসংখ্য। টাঙ্গা, উটের গাড়ি আর গাধার গাড়িও যথেষ্ট।
করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ও দেখতে গেলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ভিসি ড. এম. হোসাইন, ওখানকার ইতিহাসের অধ্যক্ষ। তিনি আমদেরকে ইফতার পার্টিতে দাওয়াত করলেন। এখানে ঢাকার ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরের সঙ্গে সাক্ষাত হলো। তিনি একটি সেমিনারে যোগদান করতে সেখানে গিয়েছিলেন। ড. এম হোসাইন তাঁর নিজের একটি কলেজ, ‘জামিয়ে মিল্লি কলেজ’ ঘুরে দেখালেন। ওখানে একটি মডেল স্কুল আছে। ছোট চোট বাচ্চারা সুন্দর সুন্দর চেয়ার টেবিলের উপর ম্যাপ তৈরী করছে। ওদের আর্ট ও বিশেষ উচ্চাংগের এবং উন্নত চিন্তাধারা প্রসূত। ওরা নিজেরা একটি ছোট ব্যাংক এবং কো –অপারেটিভ শপ পরিচালনা করে। এখানকার ইতিহাস বিভাগের মেয়েদের সঙ্গে আমাদের খুব ভাব হয়। তাদের বন্ধুত্ব আর আতিথেয়তার কথা আমাদের চিরকাল স্মরণ থাকবে। ওদের লাইব্রেরিতে অনেক বাংলা বই দেখলাম।
বিশ্ববিদ্যালয়টি করাচী শহর থেকে অনেক দূরে। বিরাট এর পরিধি। প্রত্যাকটি বিভাগ স্বয়ং সম্পূর্ণ। ছাত্রীরা সংখ্যা গুরু। অনেক ডিপার্টমেন্টে মেয়েরাই সংখ্যায় বেশী। এখানকার ছাত্ররা ইউনিফর্ম পরে। বাংলাদেশে এ পর্যায়ে তেমন দেখিনি। পরদিন গেলাম হক্স্ বে (Hoks Bay)–তে।এই হকস্ বে –তে একদিকে দিগন্ত বিস্তৃত লোনা জলরাশি আরেক পাশে উঁচু পাহাড়। এখানে দেশী বিদেশী নর নারীগণ প্রতি রোববারে জলকেলি করে থাকেন। সেখান থেকে যেতে হলো ক্লিফটন বীচে । অনেক বালুকাময় প্রান্তর পেরিয়ে সেখানে পৌঁছালাম বাঁধানো রেলিং দেওয়া সুন্দর পথ –সিড়ির পর সিড়ি পেরিয়ে চলে এলাম অনেক দূরে। তারপর বালুকাময় সাগর সৈকত। তার উপর দিয়ে হেঁটে চলে এলাম সাগরের তীরে। মনে পড়লো সেই গল্প। এই সেই আরব সাগর যেখানে শাদদাদের বেহেশত ডুবে গিয়েছিল। উত্তাল তরঙ্গ আর গম্ভীর গর্জন – অনির্বচণীয় আনন্দে চিত্ত সিক্ত হলো। কান পেতে শুনলাম আর দেখলাম সাগরের শোভা। ঢেউয়ের তালে পানি চলে আসে অনেক উপরে। যাবার বেলায় রেখে যায় নানাপ্রকার কারুকার্য খঁচিত শামুক, ঝিনুক। ঝিনুক আর শামুক প্রচুর কুড়ালাম। বান্ধবী গেয়ে উঠলো, ‘এই সাগর বেলায় ঝিনুক খোঁজার ছলে, গান গেয়ে পরিচয়/ওগো মোর গীতিময়...।’
পরের দর্শণীয় স্থান ছিল মংগোপীর। করাচী থেকে বেশ দূরে। এটি একটি বিশাল প্রাচীন গোরস্থান। এখানকার কবরগুলো পাথরের তৈরী নয়। ইটের গাঁথুনীর চিহ্ন বিরাজমান। অনেক কবরের উপর দিয়ে রাস্তা চলে গিয়েছে। অনেক কবরের উপর দিয়ে আমরা হেঁটে গেলাম। এখানকার প্রধান আকর্ষণ হলো বাবা –এ – শেখ ফরিদ ও বোয়ালিয়া কলন্দরের মাজার শরিফ। এখানকার মৃতদের আত্মার জন্য শান্তি প্রার্থনা করলাম। এই মাজার শরিফের কাছেই রয়েছে একটি জলাশয়। এর মধ্যে আছে ডজন খানেক কুমির। কথিত আছে যে, এগুলি দরবেশ শেখ ফরিদের মাথার উকুন। ওখানে গিয়ে ওরা কুমিরের রূপ ধারণ করেছে। প্রকৃতপক্ষে এগুলো কবে, কখন, কোথা হতে এখানে এসেছে তার কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।
এর একটু দূরেই আছে একটি উষ্ণ প্রস্রবণ। এরকম ঊষর মরু অঞ্চলে কেমন করে এরকম সম্ভব বুঝতে পারলাম না। একটু অগভীর কুপ। পানি গরম। খুব বেশী পানি নেই। সারাদিন পানি তোলা হচ্ছে। তা সত্ত্বেও এ অল্প একটু পানি তার পরিমাণ ঠিক রেখে চলেছে। খুব অবাক লাগলো। প্রচলিত বিশ্বাস, এই জলে স্নান করলে ব্যাধিগ্রস্ত লোকেরা আরোগ্য হয়। সেজন্য ওখানে একটি কুষ্ঠাশ্রম গড়ে উঠেছে।
করাচীর গান্ধী গার্ডেন বিশেষ খ্যাত। এটা একটা চিড়িয়াখানার মত zoological garden. পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন পশু এখানে আছে। পশুরাজ সিংহরাজ আর তার প্রধান উজির বাঘকে খাঁচায় দেখে খুব দুঃখ লাগলো। ইচ্ছা হলো সহানুভূতি জানাই। কিন্তু ভাষা বা কায়দা কোনটাই জানা নেই বলে তা আর হলো না। জিরাফ তার লম্বা গলা দিয়ে গাছের মগডালে পাতা খুঁজছে। বেচার উট পাখি – যে নাকি একজন মানুষ নিয়ে উড়তে পারে – সে ও আমাদেরকে দেখছে।
তারপর বাগ – এ জিন্নাহ্। জিন্নাহ্ গার্ডেন ঘুরে গেলাম জাতির পিতার সমাধি ভবনে। তখনো নির্মাণ কার্য শেষ হয়নি। অনেক সিড়ি ভেঙ্গে সমাধি গৃহে প্রবেশ করলাম। তারপর আবার একতালা নীচে নামতে হলো। সেখানেই জাতির পিতা কায়েদে আজম মাটির নীচে চির নিদ্রার কোলে আশ্রয় পেয়েছেন। সে ঘরটি পাকা নয়। কেবল কবরটুকু পাথরে বাঁধানো। তার দু’পাশে লেখা রয়েছে সুরা নাস্র। সমাধি ভবন খুব জাঁকজমক পূর্ণ নয়। তবুও তার বিশেষ সৌন্দর্য্য আছে। এর দেয়াল খুব ভারী অর্থাৎ চওড়া। দেয়ালের মাঝখান দিয়ে বড় বড় ছিদ্র আছে। তার ভেতর দিয়ে তাকালে দেয়ালের অপর প্রান্ত পর্যন্ত দৃষ্টি পৌঁছায় না। কায়েদ –এ –আজমের কবরের পেছনে রয়েছে কায়েদ –এ –মিল্লাত লিয়াকত আলী খানের কবর। তার উপর কোন গৃহ তখনো নির্মিত হয়নি। শামিয়ানার নীচে বাঁধানো কবর। তারপাশে রয়েছে মোশতাক আহমেদ গুরমানীর কবর।
করাচী সিন্ধু প্রদেশের বৃহৎ শহর। সিন্ধু নদ ঐ প্রদেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আরব সাগরে পতিত হয়েছে। সিন্ধু নদের উপকূলে আবিষ্কৃত হয়েছে লুপ্ত নগরী মহেঞ্জোদারো। হাজার হাজার বছর আগে যে অঞ্চলে সুসভ্য জাতি বাস করতো তার প্রমাণ পাওয়া যায়। এ নগরীর বাড়ি ঘর, স্নানাগার, নর্দমা বিশেষ উন্নত ধরণের । এখনকার খনন করা প্রাপ্ত সব অ্যান্টিক-ই তক্ষশীলা বা ট্যাক্সিলার যাদুঘরে রক্ষিত আছে। এই সিন্ধুতে অমরকোট নামক স্থানে সম্রাট আকবর জন্ম গ্রহণ করেছিলেন।
আরেকটি ইতিহাস বিখ্যাত স্থান দেখার বাকী ছিল। তাই একদিন গেলাম থাট্টা শহরে। এখানকার শহর দেখলাম। কোন চমক নেই। বাজার দেখলাম। অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। তারপর গেলাম এন একটি স্থানে যেটি শত শত বৎসর পূর্বের আমির ও ওমরাও –দের কবরস্থান। কবরস্থান তো নয় যেন ঘুমন্ত রাজপুরী – রূপ সৌন্দর্য্য, ঐশ্বর্য্যরাশির অন্তরালে ঘুমিয়ে আছে। নীরব শুনশান। কেবল প্রাচীন কবর গৃহে পূর্ণ – যতদূর দৃষ্ট যায়। পছদশ শতাব্দীরও বহু কবর দেখলাম। প্রতিটি কবর গৃহ বিশেষ কারুকার্য খঁচিত। এসব কারুকাজ পাথরে খোদিত। রঙ বেরঙের নানাবিধ নকশাও করা হয়েছে শুনেছি যে পাথরগুলি রঙ দিয়ে নকশা কাটা হয়নি। প্রতিটি পাথর যেমন পাতা, ফুলের পাপড়ি কিম্বা নকশা, আলাদা আলদা রঙ্গিন পাথর কেটে বসানো। কিন্তু পার্থক্য খুঁজে পাওয়া কারো পক্ষে সম্ভব নয়। অনেকগুলো কবর ধ্বংস হয়ে গেছে। দেখলাম কতগুলি কারিগর নতুন পাথরের ফলক নিয়ে তাতে নতুন করে সেই ধ্বসে যাওয়া নকশা তৈরী করছে। ভাঙ্গা কবর মেরামত করা হবে। এরা ইতিহাসকে যেন পুনর্জীবন দান করছে। বিস্ময়ে হতবাক হলাম। কারণ পাথরকে ফলকে পরিণত করা – তার ওপর খোদাই করা – কত যে কষ্ট সাধ্য কাজ! এদের ধৈর্য্য সাধনা এবং সর্বোপরি নৈপুণ্য উচ্চ প্রশংসার যোগ্যতা রাখে। একটু দূরেই সম্রাট শাহজাহানের নির্মিত এক বিরাট মসজিদ আছে। এটির নাম হলো শাহজাহান মস্ক। এই মসজিদের কারুকাজও বিশেষ নিপুণ।
সেদিনই ফিরে এলাম থাট্টা থেকে। করাচীর নূর মার্কেট বিশেষ আকর্ষণিয় স্থান। নূর মার্কেটে ঘোরাফেরা করে সেদিনকার মত আমাদের অস্থায়ী নীড়ে ফিরে এলাম। পরদিন ক্যলেন্ডারের পাতায় চোখ রাখলাম। ফেব্রুয়ারির ৮ তারিখ। করাচী দেখা শেষ। এবার বিদায়ের পালা। এতদিন পর ঢাকায় ফিরবো। মন থেকে কোন সাড়া মিললো না। বাংলার সবুজ শ্যামল সমতল প্রান্তরকে ভুলে যেন ঐ পাথুরে অসমতল পাহাড় পর্বত আর বালুকাময় ঊষর মাটিকে ভালবেসে ফেললাম। বন্ধুরা দেখলাম, ঘরে ফেরার জন্য তল্পিতল্পা নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আমি তখন ইতিহাসের জীবন্ত পাতাগুলি উল্টে পাল্টে দেখছিলাম। মনে হলো এ দেশটি যেন ইতিহাসের জননী। সভ্যতার প্রতিটি অধ্যায় নবতর রূপে জন্মলাভ করেছে এরই কোলে। কবে কোন বিস্মৃত কালের গৌরবময় শতাব্দীতে উন্নততর সভ্যতা গড়ে উঠেছিল সিন্ধু নদের উপকূলে মহেঞ্জোদারোতে, হরপ্পায়, শায়খান ঢেড়ি ও সিরকাপে – ইতিহাস তার নাম জানে না। কিন্তু এদেশের মাটি তাদেরকে বিস্মৃতির কুঝঝ্বটিকা দিয়ে আড়াল করে রাখেনি। অতি মমতা ভরে বক্ষ পিঞ্জরের নীচে লুকিয়ে রেখেছে। তাই আজ আমরা অভিমানী, মৌনা অতীতের নিরব ভাষা ঐসব ধ্বংসাবশেষ থেকে শুনতে পাচ্ছি।
সেদিন বিকেলে আমরা করাচী বিমান বন্দরে পি আই এ –র একটি বিমানে আরোহন করলাম। মগ্ন ছিলাম একটি ঐতিহাসিক ভ্রমন পরিক্রমার ভাবনায়। সম্বিত ফিরে পেলাম মিষ্টি মধুর ঘোষণায়, যে আমরা একটু পরেই ঢাকা বিমান বন্দরে অবতরণ করতে যাচ্ছি। চারিদিকে সবুজ শ্যামল বাংলার চোখ জুড়ানো দৃশ্য দেখে হৃদয় নেচে উঠলো। আমাদের বহনকারী উড়োজাহাজ ঢাকার মাটি স্পর্শ করলো। হাত ঘড়িতে একঘন্টা সময় বাড়িয়ে দিয়ে প্লেন থেকে নেমে এলাম।
***
১৯৬৪ সাল
No comments:
Post a Comment